SciTech

ছোট্ট পাখির গানে মানুষের ভাষার নিয়ম, বিজ্ঞানীরা পেলেন অদ্ভুত মিল

মানবশিশু যেভাবে চারপাশের কথা শুনে ভাষা শিখতে শুরু করে, একটি পাখির গানেও কাজ করছে তেমনই নিয়ম। তিমির গানেও মিলেছে সেই আশ্চর্য ছাপ।

একটি ছোট্ট পাখি বসে একটানা গান গাইছে। আমাদের কানে সেই গান হয়তো শুধুই নানা সুরের ওঠানামা। কোথাও ছোট্ট ডাক, কোথাও দ্রুত কয়েকটি স্বর, আবার কোথাও একটু দীর্ঘ সুর। কিন্তু সেই গানকে যদি শব্দের মতো ভেঙে কম্পিউটারের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হয়? সেখানেই বিজ্ঞানীদের সামনে এসেছে এক অদ্ভুত ছবি।

বেঙ্গলিজ ফিঞ্চ নামে পরিচিত ছোট্ট পাখির শেখা গানের মধ্যে গবেষকেরা এমন কিছু গাণিতিক এবং পরিসংখ্যানগত বিন্যাস খুঁজে পেয়েছেন, যা মানুষের ভাষার মধ্যেও দেখা যায়। শুধু তাই নয়, এর আগে কুঁজো তিমির গানেও একই ধরনের কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে সেই প্রশ্ন যে পাখিরা কি তবে মানুষের মতো কোনও ভাষার নিয়ম মেনে গান শেখে? উত্তরটি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ নয়। মানুষের ভাষা এখনও তার জটিলতা ও অর্থ প্রকাশের ক্ষমতার দিক থেকে আলাদা। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, ভাষাকে শেখা এবং এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিছু মৌলিক পরিসংখ্যানগত নীতি হয়তো শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জাপানে সংগৃহীত বেঙ্গলিজ ফিঞ্চের গানের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এই পাখিগুলি জন্ম থেকেই সম্পূর্ণ গান জানেনা। ছোট পাখি বড়দের গান শোনে, সেই শব্দ অনুকরণ করে এবং ধীরে ধীরে নিজের গানের কাঠামো তৈরি করে। অর্থাৎ তাদের গান একটি শিক্ষার মাধ্যমে তৈরি হওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থা।

গবেষকেরা এমন একটি পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, যার ধারনা এসেছে মানুষের শিশু কীভাবে কথার প্রবাহের মধ্যে আলাদা শব্দ চিনতে শেখে, সেই গবেষণা থেকে। কারণ মানুষ যখন কথা বলে, প্রতিটি শব্দের মাঝে সবসময় স্পষ্ট বিরতি থাকেনা। অথচ শিশু ধীরে ধীরে বুঝে ফেলে কোন ধ্বনিগুলি বারবার একসঙ্গে আসছে এবং কোথায় একটি শব্দ শেষ হয়ে অন্যটি শুরু হচ্ছে।

বেঙ্গলিজ ফিঞ্চের গানেও গবেষকেরা একইভাবে খুঁজেছেন কোন কোন ধ্বনি বা শব্দাংশ বারবার একসঙ্গে আসছে। সেখানেই দেখা যায়, পাখির গানেও তৈরি হচ্ছে পরিসংখ্যানগত ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্রম। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু স্বরের অংশ এমনভাবে বারবার একসঙ্গে আসছে, যেগুলিকে তুলনার সুবিধার জন্য পাখির গানের ‘শব্দ’-র মতো ভাবা যেতে পারে।

তিমিরাও তাদের গান অন্যদের কাছ থেকে শেখে। আবার সময়ের সঙ্গে সেই গান বদলে যায় এবং কোনও একটি প্রজাতির মধ্যে নতুন ধরনের গান ছড়িয়েও পড়তে পারে। একেবারে ভিন্ন ধরনের প্রাণি বেঙ্গলিজ ফিঞ্চের মধ্যেও একই ধরনের পরিসংখ্যানগত বিন্যাস পাওয়া যাওয়ায় গবেষকেরা ভাবছেন এর পিছনে হয়তো একটি আরও সাধারণ বিবর্তনের নীতি কাজ করছে।

ফলে মানুষের ভাষা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছিল, সেই বহু পুরনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও এই ছোট্ট পাখির গান গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে। যে গান এতদিন মানুষের কানে ছিল শুধুই সুন্দর কয়েকটি সুর, তার ভিতরেই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে যোগাযোগের বিবর্তনের কয়েক কোটি বছরের গল্প।

Show Full Article
nilkantho.in App