Mythology

চারপাশে ঘন জঙ্গল, বাংলার এক অজানা গ্রামে কাশীর মা অন্নপূর্ণা প্রতিষ্ঠিত কালীরূপে

দেবী অন্নপূর্ণা কালীরূপে বসে গেলেন একটি নিমগাছের তলায়। অন্য কোথাও আর গেলেন না। দেবীর নিত্য সেবায় রয়ে গেলেন ভরদ্বাজ মুনি।

পুরাণের কাল। পরম্পরাগত কথা। একবার অষ্টাবক্র মুনি মা অন্নপূর্ণাকে সঙ্গে নিয়ে কাশী থেকে আসছেন বক্রেশ্বরে। উদ্দেশ্য মাকে প্রতিষ্ঠা করবেন সতীপীঠ বক্রেশ্বরে। কিন্তু বক্রেশ্বরে দেবীর যাওয়া হল না। আজকের পুরন্দরপুরের বেহিরা গ্রামে দেবীর নৌকা জলের অভাবে আটকে গেল বক্রেশ্বর নদীতে। সেই সময় এই গ্রামে তপস্যারত ছিলেন ভরদ্বাজ মুনি। তাঁর আহ্বানে দেবী অন্নপূর্ণা কালীরূপে বসে গেলেন একটি নিমগাছের তলায়। অন্য কোথাও আর গেলেন না। দেবীর নিত্য সেবায় রয়ে গেলেন ভরদ্বাজ মুনি। অষ্টাবক্র মুনি সাধনারত হলেন অজ্ঞাত কোনও কাল থেকে সতীপীঠ বক্রেশ্বরে। সতীর ভ্রু-মধ্য পড়েছিল এখানে। আগে এই অঞ্চলের নাম ছিল ডোমপাড়া। কালের নিয়মে পরিবর্তন হয়েছে নামের। বোলপুর থেকে সিউড়িগামী বাসপথে পুরন্দরপুর পঞ্চায়েতের অধীনে বেহিরা গ্রাম। এই গ্রামেই কাশীর মা অন্নপূর্ণা প্রতিষ্ঠিত হলেন ‘বেহিরা নিম্ববাসিনী কালী’ নামে।

মহাভারতীয় যুগে প্রাচীন মুনি-ঋষিরা ভারতের বিভিন্ন স্থানে আশ্রম করে সেখানে তপস্যারত হতেন। প্রেমিক কবি তুলসীদাস গোস্বামী তাঁর রামচরিত মানসে এক জায়গায় লিখেছেন, ‘ভরদ্বাজ মুনি বসতি প্রয়াগা’। প্রয়াগের গঙ্গা ও যমুনা সঙ্গমে মুনির তপোবন আমি দেখিনি তবে বেহিরা গ্রামে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এ যেন ভরদ্বাজের সেই তপস্যা ক্ষেত্র। চারপাশে গভীর ঘন জঙ্গল। নানান জানা-অজানা গাছে ভরা। এতটুকু কোলাহল নেই। একেবারেই নির্জন। শান্ত মনোরম নয়নাভিরাম পরিবেশ। অদূরেই জঙ্গলকে চুমু খেয়ে বয়ে চলেছে ক্ষীণ-স্রোতা বক্রেশ্বর নদী। দেখলে বোঝা যায় এককালে রূপ ছিল, ভরা উদ্বেল যৌবন ছিল, ছিল সুন্দরী নারীসুলভ আকর্ষণ। কালের চাবুকে তা সবই হারিয়েছে। এখন মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গোনা।

বিশাল বিশাল ছায়া ছড়ানো গাছের তলা দিয়ে মন্দির অঙ্গনে প্রবেশ করতেই ডানপাশে পড়ল বিশাল একটি বাঁধানো যজ্ঞ মণ্ডপ। অতীতে অসংখ্য তপস্বী এখানে তপস্যা করেছেন, এখনও আসেন তপস্যা ও হোমযজ্ঞের উদ্দেশ্যে। ঠিক এর বিপরীতে প্রথমে ভরদ্বাজ মুনির মাঝারি আকারের মন্দির, পাশের মন্দিরটিতে অষ্টাবক্র মহাদেব। উভয় মন্দিরে স্থাপিত বিগ্রহ শিবলিঙ্গ। এখানে বলিপ্রথা প্রচলিত আছে। এই মন্দিরের সামনে পোঁতা আছে হাড়িকাঠ। এই মন্দির দুটির পিছনের অংশে বড় বড় গাছের ছায়াতলে অতীতে এক সময় এখানে যাঁরা থেকেছেন, সাধনা করেছেন তাঁদের অনেকের রয়েছে ছোট ছোট সমাধিমন্দির। মন্দির সংলগ্ন একটি ছোট ঘর, এর পিছনে আছে পুকুর, না বলে ডোবা বলাই ভালো।

এবার দেবী মন্দিরের কথা। বিস্তৃত মন্দির অঙ্গনে এক চূড়া বিশিষ্ট মাঝারি আকারের মন্দির। মেঝে পাথর বাঁধানো। সমস্ত মন্দিরে দেখা যায় দেবী বিগ্রহ দেওয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। এখানে কিন্তু তা নয়। দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা আছে মন্দিরের এক কোণে। অনেকটা জায়গা জুড়ে। উচ্চতায় প্রায় চার ফুট। মৃন্ময়ী মূর্তি। পরনে বেনারসি। নাকে টানা দেওয়া নথ। ফালা ফালা আকর্ণ চোখ। অদ্ভুত আকর্ষণীয় প্রশান্ত কমনীয় মুখমণ্ডল। চোখ জুড়িয়ে যায়। কাশীতে বাবা বিশ্বনাথকে রেখে একা এসেছিলেন বলে এখানে মহাদেব নেই। একা বাবু হয়ে বসে আছেন পরমানন্দে। পাশে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। অনাড়ম্বর পরিচ্ছন্ন মন্দির। নিখুঁত পরিপাটি বিগ্রহ। উপরের বাম হাতে খাঁড়া, নিচের বাম হাতে অসুর মুণ্ড।

মন্দির লাগোয়া একটি প্রাচীন নিম গাছ। বেশ মোটা, কালের আঘাতে ভেঙে পড়েছে। কত কালের প্রাচীন তা বোঝার সাধ্য নেই। মন্দিরক্ষেত্র অনেকটা জায়গা জুড়ে। আশপাশে কোনও লোকালয় নেই। নির্জন বনময় পরিবেশ। মন্দিরের পিছনেই ভোগ রান্নাঘর।

এখানে মায়ের নিত্যভোগ হয়। ডাল, ভাত, ভাজা, শাকসবজি এবং মাছ। কেউ পাঁঠা বলি দিলে ক্ষেত্রবিশেষে মায়ের মহাপ্রসাদ মেলে। সকাল দশটার মধ্যে মায়ের নিত্য সেবককে জানালে প্রসাদ পাওয়ায় কোনও অসুবিধে হয় না। প্রতিবছর দুর্গা ত্রয়োদশী তিথিতে এখানে দেবীর বিরাট উৎসব হয়। লোক সমাগম প্রচুর। দেবীর প্রচার নেই বলে অন্যান্য দিন নিকটবর্তী গ্রামবাসীরা আসে। হাঁটাপথ তাই লোক সমাগম কম।

দেবীর বিস্ময়কর সৌন্দর্যমণ্ডিত মৃন্ময় মূর্তিটি নির্মাণ করেছেন স্থানীয় গ্রামের শিল্পী পীযূষ মণ্ডল। দেবীর অঙ্গরাগ তথা রং করেছেন কলকাতার শিল্পীরা। মা নিম্ববাসিনী কালীর মাথার বিশাল কারুকার্যখচিত রুপোর মনোহর মুকুটটি নির্মাণ করেছেন বাঁকুড়ার শিল্পীরা। এই মন্দিরের নিত্য সেবক দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত সদানন্দ ব্রহ্মচারীজি। বীরভূমের ইলামবাজার নিবাসী শ্রদ্ধেয় শ্রী পার্থ মুখোপাধ্যায়ের পরিবার বংশানুক্রমে দেবী নিম্ববাসিনী কালীর সেবাইত। তাঁদের কুলদেবতাও বটে। প্রতিদিন নিষ্ঠাভরে দেবীর সেবাপুজো করেন প্রণম্য পুরোহিত শ্রী ত্রিপুরাচরণ চট্টোপাধ্যায়।

Nimbobasini Kalitala Behira

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কালী পরিক্রমা করে দুই শতাধিক বিভিন্ন নাম রং ও রূপের কালী দর্শন করেছি, তবে এমন বিরল রূপের কালীদর্শন এই প্রথম।

Show More

Sibsankar Bharati

স্বাধীন পেশায় লেখক জ্যোতিষী। ১৯৫১ সালে কলকাতায় জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। একুশ বছর বয়েস থেকে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে জ্যোতিষের প্রশ্নোত্তর বিভাগ, ছোট গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের ফিচার। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, আনন্দলোক, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, সকালবেলা সাপ্তাহিকী, নবকল্লোল, শুকতারা, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার নিবেদন 'আমার সময়' সহ অসংখ্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে অজস্র ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাধর্মী মনোজ্ঞ রচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button