Mythology

পিণ্ডদানের মাহাত্ম্য

সামান্য একটু তন্দ্রা এসেছে, দেখলেন পিতা জোড় হাত করে বলছেন, ‘বাপু আমাকে একটি পিণ্ড দিলে না?’

রামায়নী যুগের কথা। অযোধ্যানাথ শ্রীরামচন্দ্র এলেন গয়াতে। পিতা দশরথের পিণ্ডদানের সময় রাজা নিজ হাত সম্প্রসারণ করেছিলেন। রামচন্দ্র তাঁর হাতে না দিয়ে পিণ্ডদান করলেন শিলায়। রাজা দশরথ বললেন সুপুত্র রামকে, ‘তুমি আমার হাতে পিণ্ড না দিয়ে রুদ্রপদে প্রদান করেছ। কারণ হাতে পিণ্ড গ্রহণ করলে উদ্ধার হতে পারতাম না। আশির্বাদ করি, এখন তুমি বহুকাল পর্যন্ত রাজ্য ভোগ করে সকলের সঙ্গে গমন কর স্বর্গে।’ রাজা পিণ্ড গ্রহণের পর গমন করেন রুদ্রলোকে।

পিতৃগণের উদ্দেশ্যে গয়াতে পিণ্ডদান করেন মুনি ভরদ্বাজ। তাঁর জন্মদাতা এবং পালকপিতা উভয়েই ঊর্ধ্বগতি লাভ করেন পুত্র ভরদ্বাজের পিণ্ড গ্রহণ করে।

মহাভারতীয় যুগে মহামতি গঙ্গাপুত্র চিরকুমার ভীষ্ম এলেন গয়াতে। পিতা শান্তনুর উদ্দ্যেশ্যে গয়াশিরে পিণ্ডদান কালে শান্তনুর দুটি হাত এল পিণ্ডগ্রহণ করতে। পিতামহ পিণ্ড হাতে না দিয়ে তা রাখলেন শিলায়। আনন্দিত হলেন শান্তনু। ইচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন। একই সঙ্গে মৃত্যুর পর বৈকুণ্ঠ অর্থাৎ মোক্ষলাভের আশির্বাদ করলেন পিতামহ ভীষ্মকে।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির দুর্লভ আশির্বাদলাভে বঞ্চিত হননি। তিনিও এসেছিলেন গয়াতে। পিণ্ডদান কালে পিতা পাণ্ডুর দুটি হাত আসে পিণ্ড গ্রহণের উদ্দ্যেশ্যে। তখন যুধিষ্ঠির পিণ্ড হাতে না দিয়ে শিলার উপরে দিলে পাণ্ডুর আত্মা পরম তৃপ্তি ও মোক্ষলাভ করে। সেই সময় পুত্রকে সশরীরে স্বর্গ গমনের আশির্বাদ করেছিলেন প্রীত পিতা পাণ্ডু।

আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগের কোনও একটি দিন। রাজকুমার সিদ্ধার্থ যখন গৃহত্যাগ করলেন তখন তাঁর বয়স প্রায় উনত্রিশ। কপিলাবস্তু থেকে মহাভারতীয় যুগের গিরিব্রজ তথা আজকের রাজগীর হয়ে গেলেন গয়ের নগরী বা গয়া। এখানে তিনি কঠিন তপস্যায় মগ্ন হলেন। নিরঞ্জনা (ফল্গু) নদীতীরে। প্রায় ছ’বছর কঠোর তপস্যার পর বোধিলাভ করলেন তিনি। তারপর গেলেন পুণ্যধাম বিশ্বনাথক্ষেত্র বারাণসীতে।

আনুমানিক পাঁচশো বছর আগের কথা। তখন বাংলায় নবাব হুসেন শাহর রাজত্বকাল। শচীমাতার উদ্যোগে বিবাহ হল দ্বিতীয়বার। মায়ের আদেশকে স্বীকার করলেন গৌরসুন্দর। এরপর তাঁর গয়াতে গমন। জয়ানন্দ বলেছেন, ‘পিতা জগন্নাথ মিত্র তাঁর পিণ্ডদানের কথা বলে গেছিলেন মৃত্যুর পূর্বে’।

‘গয়াতে আমার বাপু দিহ পিণ্ডদান।’ (চৈমঃ, পৃষ্ঠা – ৪৫)

এবার বৃন্দাবন দাসের কথায়-

‘জননীর আঞ্জা লই মহাহর্ষ মনে।

চলিলেন মহাপ্রভু গয়া দরশনে।।’

গয়াতে পিতার পিতৃপিণ্ড দান করলেন গৌরহরি। তারপর বিষ্ণুর পাদপদ্যে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানিয়ে করলেন আত্ম পিণ্ডদান। ঈশ্বরপুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল গয়াতে। কৃষ্ণপ্রেম ভিক্ষা চাইলেন তিনি। ‘গোপীনাথ’ মহামন্ত্র দিলেন ঈশ্বরপুরী। গৌরসুন্দর গয়াতেই খুঁজে পেলেন অন্য পথ, অন্য লোকের দিশারি।

স্বামী প্রণবানন্দজির গুরুজি যোগিরাজ গম্ভীরনাথ এই গয়াধামে পাহাড়ের পাদদেশে কপিলধারায় স্থাপন করেছিলেন আপন সিদ্ধ সাধন আসন।

ভারতের বরেণ্যসাধক মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী জীবনের কোনও একসময় গুরুলাভের ব্যাকুলতায় ঘুরতে ঘুরতে এসেছিলেন গয়াধামে। দিনের পর দিন কাটতে লাগল অনাহারে, অনিদ্রায়। ভগবানের করুণালাভ হল। ব্রহ্মানন্দ পরমহংস নামে এক উচ্চকোটি মহাপুরুষের কৃপালাভ করলেন তিনি গয়ারই আকাশগঙ্গা পাহাড়ে।

পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণের তখন জন্ম হয়নি। পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন গয়াধামে। শ্রী বিষ্ণুর চরণপদ্মে পিণ্ডদান করেছিলেন পিতৃপুরুষের উদ্দ্যেশ্যে। পরবর্তীকালে তাঁদের আশির্বাদে ঠাকুর গদাধর লাভ করেছিলেন ভগবান গদাধরের পরম করুণা।

এমন অসংখ্য ঋষি মনীষী ও মহাপুরুষের পদধূলিপূত পুণ্যতীর্থ গয়াধাম। হাওড়া থেকে দূরত্ব ৪৫৮ কিমি। ভাড়া ৩টাকা ৪ আনা ১৫ পাই। না, এ ভাড়া এখনকার নয়, ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের, যে বার ভারত গর্বিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের নোবেল-এ।

১৮৯১ সালের কথা (বাংলা ১২৯৮ সন)। ভারতবরেণ্য মহাপুরুষ প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী অবস্থান তখন করছেন ঢাকায় গেন্ডারিয়া আশ্রমে। একদিন প্রসঙ্গক্রমে তাঁর একান্ত আপনজন ব্রহ্মচারী কুলদানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন প্রভুপাদকে-

‘আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “অপঘাত মৃত্যু প্রভৃতিতে যাহাদের পরলোকে অসদগতি ঘটে, বংশধরদের কিরূপ কার্য্য দ্বারা তাহাদের সদগতি লাভ হয়?”

ঠাকুর বলিলেন, “শাস্ত্রে আছে, গয়াতে যথামত পিণ্ডদান করলেই তাদের সদগতি হয়ে থাকে।”

আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘গয়াতে পিণ্ড দিলে সত্যই কি প্রেত তাহা গ্রহণ করে?”

ঠাকুর বলিলেন, “হাঁ, ব্যবস্থামত দিলে পরলোকগত আত্মা তা গ্রহণ করে। আমি যখন গয়ায় ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করতে গিয়েছিলাম, তখন আকাশগঙ্গা পাহাড়ে অনেক সময় থাকতাম। ঐ সময়ে একবার একটি আশ্চর্য্য ঘটনা ঘটেছিল। আমার একটি ব্রাহ্মবন্ধু, একদিন স্বপ্নে বললেন, ‘বাপু, যদি গয়ায় এসেছ, আমাকে একটি পিণ্ড দাও। আমি বড়ই কষ্ট পাচ্ছি।’ তিনি ব্রাহ্ম, ওসব কিছুই বিশ্বাস করেন না, তাই উড়িয়ে দিলেন।

পরদিন রাত্রিতে আবার স্বপ্নে দেখলেন, পিতা অত্যন্ত কাতরভাবে বলছেন, “বাবা তোমার কল্যাণ হবে, আমাকে একটি পিণ্ড দিয়ে যাও।” দু’বার স্বপ্ন দেখেও তিনি তা গ্রাহ্য করলেন না। আমাকে এ বিষয়ে এসে বললেন। আমি তাঁকে বললাম, “পুনঃ পুনঃ যখন এরূপ দেখছেন, তখন পিণ্ড দেওয়াই উচিত।” তিনি আমার উপর বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনি ব্রাহ্মধর্ম-প্রচারক হয়ে এরূপ কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন?’ আমি তাঁকে বললাম, ‘আপনি ও আর আপনার বিশ্বাসমত দিবেন না, আপনার পিতার বিশ্বাসমত দিবেন, তাতে বাধা কি? তিনি তাতেও সম্মত হলেন না।

পরে আর একদিন শুয়ে আছেন, সামান্য একটু তন্দ্রা এসেছে, দেখলেন পিতা জোড় হাত করে বলছেন, ‘বাপু আমাকে একটি পিণ্ড দিলে না?’ বন্ধুটি তখন আমাকে এসে বললেন, ‘মশায় আজ আবার পিতাকে স্বপ্নে দেখলাম, তিনি করজোড়ে কাতর হয়ে বলছেন, ‘বাপু, আমাকে একটি পিণ্ড দিলে না? আমি বড়ই কষ্ট পাচ্ছি।’

শুনে আমার কান্না এল। আমি তখন বললাম, ‘আপনি নিজে না দেন, প্রতিনিধি দ্বারাও তো দেওয়াতেই পারেন।’ তিনি চুপ করে রইলেন। আমি দুটি টাকা নিয়ে, একটি পাণ্ডাকে ওঁর প্রতিনিধি হয়ে পিণ্ড দিতে ব্যবস্থা করে দিলাম। এই পিণ্ডদানের দিন বন্ধুটিকে নিয়ে বেড়াতে বেড়াতে বিষ্ণু-পাদপদ্মে উপস্থিত হলাম। প্রতিনিধি পাণ্ডা যখন পিণ্ডদান করলেন, তখন দেখলাম বন্ধুটির চোখ দিয়ে দরদর ধারে জল পড়ছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে পড়লেন, পরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করায় বললেন, মশায় যখন পিণ্ড দেওয়া হয়, তখন আমি পরিষ্কার দেখলাম, আমার পিতা খুব আগ্রহের সহিত দুই হাত পেতে পিণ্ড গ্রহণ করলেন এবং হাত তুলে আমাকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘বাপু, আমার যথার্থ উপকার করলে, তুমি সুখে থাক, ঠাকুর তোমার কল্যাণ করুন।’ আহা আগে যদি আমি জানতাম পিতা এভাবে এসে পিণ্ড গ্রহণ করবেন, তা হলে আমি নিজেই খুব যত্ন করে পিণ্ড দিতাম।’ এ সকল ব্যাপার কি যুক্তি-তর্কে বুঝান যায়?”

কর্মজীবনে নানা মানুষের সান্নিধ্যে আসতে হয়। শুনতে হয় হাজারও সমস্যার কথা। একদিন এক ভদ্রলোক এলেন সঙ্গে তার স্ত্রী। দেখলাম, একটা ভয় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার ছাপ তাদের সারা চোখে মুখে ছেয়ে রয়েছে। ভদ্রলোক প্রথমেই বললেন,

— দাদা, আপনি ভুত প্রেত আছে এসব বিশ্বাস করেন ?

সঙ্গে সঙ্গেই উত্তরে বললাম,

— বিশ্বাস করি মানে আমি নিজেই দু দু-বার ভৌতিক অত্যাচারের কবলে পড়েছিলাম। পরে ভগবানের দয়াতেই মুক্তি পেয়েছি।

এবার ভদ্রমহিলা বললেন,

— দাদা, এবার বলি আমাদের কথা। একথা কাউকে বললে বিশ্বাস করবে না বলে কাউকেই বলিনি। ভৌতিক অত্যাচারে আমরা নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম। ইষ্টার্ণ বাইপাসে একটা জমি কিনে আমরা বাড়ি করে সেখানে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে অত্যাচার। সংসারে আমি, আমার ছোট ছেলে আর স্বামী ছাড়া ওই বাড়িতে কেউই থাকি না। গৃহপ্রবেশের রাত থেকেই শুরু হয়েছে তাণ্ডব। রাতের ছাদের উপরে সমানে চলছে দাপাদাপি। প্রকাশ্যে দিনের বেলায় স্নান করে ভিজে কাপড় ঘরে এনে রেখেছি পরে নেড়ে দেব বলে। ওমা, দেখছি চোখের সামনে কাড়টা চোঁ করে বেরিয়ে গেল বাইরে। খেতে বসেছি, ভাতের মধ্যে দেখছি একগাদা চুল আর নখ। কখনও একমুঠো ছাঁই এসে পড়ছে ভাতের থালায়। জলভরা গ্লাস রেখেছি থালার পাশে হঠাৎ ছিঁটকে গিয়ে পড়ল হাত তিনেক দূরে। রাতে দই পেতে রেখেছি ফ্রিজে। সকালে উঠে দেখছি অর্ধেক দই নেই। মাছ রান্না করছি, কড়াই থেকে ছিঁটকে গিয়ে পড়ছে দু-হাত দূরে। ঠাকুরের দোলা এইমাত্র সাজিয়ে থালায় মিষ্টি গ্লাসে জল দিয়ে এলাম, দু-মিনিট পরে গিয়েই দেখলাম, ঠাকুরের বাসনপত্র সব সারা ঘরে রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। রাতে শুয়ে আছি খাটে। কে যেন এসে খাটটা বেশ জোর করে ঝাঁকিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাথরুমে জলের মগটা সামনে রেখেছি, চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি মগটা সরসর করে পিছনে চলে গেল। এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে চোখের সামনে দিনে রাতে। এযুগে এসব কথা কেউ বিশ্বাসই করবে না ভুক্তভুগী না হলে। অবিশ্বাস করবে বলে কাউকে বলতেও পারছি না অথচ এইভাবে ওই বাড়িতে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ধারদেনা কষ্ট করে বাড়িটা করলাম। ওখানে কি আমরা বাস করতে পারব না? এই ভৌতিক অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ কি আপনার জানা আছে? কি করলে এর হাত থেকে মুক্তি পাব? দয়া করে বাঁচার পথটা বলুন নইলে আমরা সকলেই হয়ত মারা পড়ে যাব।

এমন বহু পরিবারের মুখ থেকে বিচিত্র ধরণের নানান ভৌতিক অত্যাচার ও পীড়নের কথা আমার শোনা ও জানা আছে। আমি তাদের সকলকেই গয়ায় পিণ্ডদানের পরামর্শ দিয়েছি। কথা শুনেছে। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে। যাদের পরিবারে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তারা গয়াতে গিয়ে পিণ্ডদান করে আসলে সারাজীবনের জন্য নানান অশান্তি ও বিড়ম্বনার হাত থেকে চিরতরে মুক্ত হবেন, এতে আমার একবিন্দুও সন্দেহের অবকাশ নেই।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button