Food

গরমে কী খাবেন আর কী করবেন

ঋতু ছ’টি। কিন্তু প্রকৃতির হাল এমনই যে শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষা বাদে অন্যান্য ঋতুগুলি আমাদের মালুমই পড়ে না। গরম পড়েছে। গ্রীষ্মকালে নানান ধরনের অসুখ-বিসুখের সমস্যা দেখা দেয়। তার ভিতর রয়েছে অজীর্ণতা, ঘামাচি, দুর্বলতা, বেশি ঘাম হওয়া, চুলকানি, জন্ডিস কিংবা পেটের সমস্যার মতো উপসর্গগুলি। গরমকালে কী কী ধরনের খাওয়া-দাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে হিতকর সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে আমরা হাজির হয়েছিলাম বিশিষ্ট আয়ুর্বেদ চিকিৎসক সুবল মাইতির কাছে।

সুবলবাবু জানালেন, যাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন গরমের দিনে তাঁরা কষ্ট পেতে পারেন। হার্টের রোগীরাও অনেক সময়ে তীব্র গরমের জেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মহিলাদের মেনোপজ শুরুর আগে পরে অবসাদ আসে। হরমোনের কমবেশি তারতম্য জনিত কারণেই এটা হয়ে থাকে।

সুবলবাবুর পরামর্শ গরমের দিনে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হলে স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাগুলি এড়ানো যেতে পারে। যেমন, সকাল ছ’টার ভিতর ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস করতে হবে। দিনে দু’বার স্নান করলে ভাল। সকালে একবার আর সন্ধ্যার আগে আর একবার স্নানের অভ্যাস তৈরি করে নিলে ভালো হয়। গরম থেকে ঘরে ফিরে অনেকেই ফুলস্পিডে ফ্যান চালান। সেটা কিন্তু ঠিক নয়। পাখার স্পিড বাড়িয়ে হাওয়া খাওয়াটা উচিত হবে না। গরমে কাহিল হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে পান্তাভাত ভিজানো জল ৫ গ্রাম মত নুন দিয়ে খেলে তা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুব ভাল। এছাড়া, পরিণত বয়স্ক যে কোনও মানুষ দিনে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লিটার জল অবশ্যই খাবেন। কতটা জল খাবেন তা অবশ্য নির্ভর করে দেহের ওজনের ওপর। হাল্কা পোশাক পরাটাই বাঞ্ছনীয়। সুতির পোশাক পরা ভালো। বিছানার চাদর বা ঘরের পর্দা হাল্কা আকাশি বা হাল্কা সবুজ রংয়ের হলে মনও শান্ত থাকবে।

গরমে খাবেন না ঝাল খাবার কিংবা গুরুপাক খাবার। বাসি বা ঠান্ডা খাবারও চলবে না। তবে পরিমিত পরিমাণে তৈলাক্ত মাছ, মাংস বা ডিম থেতে পারেন। সুবলবাবুর সতর্কতা, খিদে না থাকলে জোর করে খাওয়া উচিত হবে না।

লিভার ভালো রাখতে গরমে গিমা শাক খেতে পারেন। পদে আলু বেগুনের চচ্চড়ি রাখলে তা লিভারের পক্ষে ভাল। সুগারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে খেতে পারেন নিমপাতা দিয়ে বেগুনের তরকারি। গরমে অনেকেরই অগ্নিমান্দ্য হয়। এক্ষেত্রে সুবলবাবুর পরামর্শ বাজার থেকে গিমা শাক এনে তা ভেজে চচ্চড়ি করে খাবেন। খেতে পারেন কাঁচা আম বা পাকা আমও। কাঁচা আম পুড়িয়ে বা চাটনি করে খেতে পারেন। যে কোনও ধরনের আমেই প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। ছোলার ছাতু খেলে বিশেষ উপকার পাবেন।

গরম যাতে গায়ে না বসে যায় সেজন্য ৫০ গ্রাম মতো কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া স্বাস্থ্যকর। এছাড়া, ১০০ গ্রাম টক দ‌ইতে ২০০ গ্রাম জল মিশিয়ে লস্যি করে খেতে পারেন। এতে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স থাকে। বিশিষ্ট চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়ের একটি বক্তব্য তুলে ধরে সুবলবাবু জানালেন, একবাটি মিষ্টি দই মানে একবাটি বিষের সমতুল। গরমে নিয়মিতভাবে ছানার জল খাওয়াও স্বাস্থ্যকর। ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে সফেদা, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ বা আনারসের রস বানিয়ে খেতে পারেন। অনেকেই গরমে প্রচুর পরিমাণে পাকা বেলের সরবত খান। সুবলবাবুর মতে, এটি অতি অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক। বেলের সরবত বেশি পান করলে পাকস্থলী ফুটো হয়ে যেতে পারে। তবে পাকা আম যথেষ্ট পরিমাণে খেতে পারেন। পাকা আম মায়েদের বুকের দুধ বাড়াতে সহায়তা করে। কোষ্ঠ পরিস্কার রাখতে খেতে পারেন পাকা পেঁপে। পাকা পেঁপেতে আছে ভিটামিন এ, বি, সি, ডি। তরমুজের সরবত চিনি দিয়ে খেলে ক্লান্তি দূর হবে।

গরমে অনেকেই পেটের নানারকম সমস্যার ভোগেন। বিশেষত, হজমের গোলমালে পাতলা পায়খানা হয়ে থাকে। এই সমস্যা রুখতে নুন, লেবু, চিনির জল খেলে উপকার পাবেন। বেশি ঘাম হলে কাঁচা আম পুড়িয়ে খাবেন। হাই প্রেশার এড়াতে গরমের দিনে বারেবারে ঘাড়ে, মুখেচোখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দেবেন। বদহজম এড়াতে দুপুরে ভাত খাওয়ার আগে চিবিয়ে খাবেন আধইঞ্চি আদা। এছাড়া, নুন-লেবুর রসে জোয়ান হাল্কা করে ভেজে খাওয়ার পরে তা মুখশুদ্ধি হিসাবে খেতে পারেন।

ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাদা চন্দন ঘষে তা জলে গুলে খেতে পারেন। এতে বিশেষ উপকার পাবেন। টনসিলের সমস্যা থাকলে ভোরে ঘুম থেকে উঠে ২ থেকে ৩ কোয়া রসুন চিবিয়ে খেয়ে নেবেন। এছাড়া, হাঁপানির সমস্যা হলে ৩ থেকে ৪টি খেজুর বীজ ফেলে দিয়ে সিদ্ধ করে খাবেন। দুপুরে ঘুমবেন তাঁরাই যাঁদের বয়স ১২ বছরের নীচে কিংবা ৬০ বছরের ওপরে। অথবা যাঁরা রোগী কিংবা সদ্য রোগশয্যা থেকে উঠেছেন।

গরমে স্নানের পর গায়ে ভাল করে পাউডার মাখার অভ্যাস অনেকের আছে। সুবলবাবুর মতে, এই অভ্যাস স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। পাউডারের বিকল্প হিসাবে সুবলবাবুর প্রেসক্রিপশন হল, ৮ থেকে ১০ গ্রাম হলুদ ২ থেকে ৩ গ্রাম দারুচিনি মিশিয়ে একসঙ্গে বেঁটে স্নানের আগে গায়ে লাগান। এতে গায়ের ময়লা পরিস্কার হয়।

About Arnab Dutta

স্কুলের গণ্ডি পার করেই ফ্রিলান্সার হিসাবে লেখালেখি শুরু আনন্দমেলা, জনমন জনমত, সানন্দা পত্রিকা, আকাশবাণীতে। ১৯৯৩ সালে প্রথম চাকরি মিত্র প্রকাশনীতে। স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে দৈনিক কাগজের চাকরিতে হাতেখড়ি ওভারল্যান্ডে। এরপর আনন্দবাজার, আজকাল, সকালবেলা-সহ কয়েকটি বাংলা কাগজের নিউজ ডেস্কে চাকরি। কলকাতার কয়েকটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলেও কাজ করার অভিজ্ঞতা। প্রথম লেখা ছোটগল্পটি ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় আনন্দমেলায়। ইতিমধ্যে প্রায় তিন ডজন বাংলা ছোটগল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আপাতত লেখাকেই পেশা করেছেন লেখক-সাংবাদিক অর্ণব দত্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *