Mythology

রমণীদের দেখে কি আকর্ষণ বোধ করেন, অতিবৃদ্ধ সাধুবাবার প্রতিক্রিয়া

সাধুরা চলার পথে সুন্দরী রমণীর দেখা পান অসংখ্য। তাদের দেখে মনে কি প্রতিক্রিয়া হয় সাধুদের, কোনও ইচ্ছা জাগে কি, উত্তর দিলেন অতিবৃদ্ধ সাধুবাবা।

১৯৭০ সাল থেকেই লেখক ও পরিব্রাজক শিবশংকর ভারতীর ভ্রমণ ও সাধুসঙ্গের জীবন শুরু, যা আজও জারি আছে। আসমুদ্র হিমাচলের প্রায় সব জায়গায় ঘুরেছেন। প্রায় পাঁচ হাজার পথচলতি (রমতা সাধু) বিভিন্ন বয়স ও সম্প্রদায়ের সাধুসন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে।

সাধুসন্ন্যাসীরা কেন ঘর ছেড়েছেন, কিসের আশায়, কিভাবে চলছে তাঁদের, কেমন করে কাটে জীবন, এমন অসংখ্য কৌতূহলী প্রশ্নই লেখককে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে ভারতের অসংখ্য তীর্থে, পথে প্রান্তরে। এসব প্রশ্নের উত্তরই আছে এ লেখায়। একইসঙ্গে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের দেখা ‘ঈশ্বর’ সম্পর্কে অনুভূত ও উপলব্ধ মতামত।

তাঁদের জ্ঞানের পরিধির বিশালতা উপলব্ধি করে বারবার মুগ্ধ হয়েছেন লেখক। ‌যাঁকে প্রথমে নিতান্তই ভিখারি ভেবেছেন, পরে কথা বলে পেয়েছেন অগাধ জ্ঞানের পরিচয়। অশিক্ষিত অক্ষরজ্ঞানহীন সাধুদের এমন সব তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ কথা, যা অনেক পণ্ডিতমনাদের ধারণায় আসবে না। তাঁদের কাছে পর্যায়ক্রমে কথোপকথন, বিভিন্ন তত্ত্বের বিশ্লেষণ, যা অধ্যাত্ম্যজীবন, ভারতীয় দর্শন ও জীবনধারার পরিবাহক।

এ লেখায় কোনও মঠ, মন্দির, আশ্রমের সাধুসন্ন্যাসীদের কথা লেখা হয়নি। কারণ অধিকাংশই তাঁরা গৃহীজীবনের সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে জড়িত। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের উপর নির্ভরশীল। এখানে সেইসব পথচলতি সাধুদের কথা আছে, ‌যাঁদের জীবন জীবিকা চিন্তাভাবনা ইত্যাদি সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণই অজ্ঞাত। ‌যাঁরা সংসারের গণ্ডী ভেঙে বেরিয়েছেন এক অজানা অনিশ্চিত জীবনের উদ্দেশ্যে। ‌যাঁদের কৌতূহলী অন্বেষণ নেই। চাওয়া পাওয়ার বাসনায় ‌যাঁরা নির্বিকার অথচ আত্মতৃপ্ত। এ লেখায় তাঁদের কথাই লিখেছেন পরিব্রাজক শিবশংকর ভারতী।


গুরুজির কথায় জানতে চাইলাম,

– বাবা সংসারজীবনে গৃহীদের আধ্যাত্মিক কল্যাণের জন্য কেমন গুরু করা উচিত বলে মনে করেন আপনি?

মুখের ভাবটা দেখে মনে হল খুব খুশি হলেন এ প্রশ্নে। আন্তরিকতার সুরে সাধুবাবা বললেন,

– বেটা সাধু বল আর সংসারীই বল, তাঁদের গুরু এমন হওয়া দরকার, যিনি শিষ্যের কোনও কিছুই গ্রহণ করেন না। আবার শিষ্যও এমন হওয়া চাই, যে সব কিছুই সমর্পণ করবে তার গুরুর কাছে নির্বিকার চিত্তে।

এবার হিন্দিতে একটা শ্লোক বলে তার মানে করে বললেন,

– বেটা গৃহী শিষ্যের সংসারী গুরু হলে শিষ্যের কোনও উপকারে আসে না। যেমন কাদা দিয়ে কাদার দাগ তোলা যায় না। গুরু অন্ধ, শিষ্যও অন্ধ। হাত ধরাধরি করে একে অপরকে টেনে নিয়ে চলে। তারপর দুজনে একসঙ্গে মরে গর্তে পড়ে।

এ কথায় খটকা লাগল মনে। জিজ্ঞাসা করলাম,

– সংসারী গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিলে শিষ্যের কোনও কল্যাণ হয় না কেন? গৃহীগুরুর অপরাধটা কোথায়?

কথার কোনও উত্তর দিলেন না। উঠে দাঁড়ালেন। ইশারায় কয়েকটা সিঁড়ি দেখালেন। আমিও উঠলাম। দেখানো সিঁড়ির কাছে গিয়ে নিজে বসলেন। আমাকেও বললেন বসতে। বসলাম। এবার বললেন,

– বেশ রোদ্দুর আছে এখানে। ওখানে ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছিল তাই সরে এলাম। আজ বেশ ঠান্ডা পড়েছে তাই না?

সম্মতি জানালাম ঘাড় নেড়ে। সাধুবাবা বললেন,

– গৃহীগুরুর কোনও অপরাধের কথা বলছি না আমি। শুধু এইটুকুই বলছি, কামুক পুরুষ যেমন নারী ভালবাসে, ধন ও অর্থ ভালবাসে যেমন লোভী, ভক্ত যেমন ভালবাসে ভগবানকে, তেমনই গৃহীগুরু ভালবাসে তার নিজের স্ত্রী সন্তানকে। এরা নিজের স্ত্রী সন্তানের মঙ্গল কামনা করবে, না শিষ্যের বোঝা কাঁধে নিয়ে‌ তার কল্যাণ কামনা করবে? ওই জন্যেই তো বললাম, কাদা দিয়ে কাদার দাগ তুলতে গেলে যে অবস্থা দাঁড়ায়, গৃহীগুরুর অবস্থাটাও তেমন।

একটা কথা বলতে যাচ্ছিলাম, বাধা দিয়ে বললেন,

– বেটা, জটিয়াবাবার মতো, স্বামী সন্তদাসের মতো কটা সাধুকে খুঁজে পাবি বিয়ের পরও সাধনার উচ্চস্তরে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। এমন সাধুমহাত্মার কাছ থেকে দীক্ষা তো দূরের কথা, এঁদের একটা লাথ খেলেও ইহকাল পরকাল ধন্য, সার্থক হয়ে যায়। এঁদের মতো সাধু লাখে একটা পাবি কিনা সন্দেহ।

সাধুবাবা একটু মুচকি হাসি হাসলেন। সরোবরের জলে চোখ রেখে বললেন আবেগভরা কণ্ঠে,

– বেটা, সংসারে শিষ্যই হল প্রথম দাতা, যে গুরুতে অর্পণ করে নিজের দেহ মন আত্মাকে। আর একমাত্র গুরুই হলেন প্রথম দাতা, যিনি শিষ্যের পার্থিব বন্ধনমুক্তির জন্যে দান করেন নামগুরু পরমধন, যার কোনও বিনিময়মূল্য হয় না। বেটা গুরু সকলকেই চান নিজের করে নিতে কিন্তু গুরুকে কেউ চায় না। কেন জানিস? যতদিন শিষ্যের আশা আছে, ততদিন গুরুকে সর্বস্ব অর্পণ করে নিঃস্ব হয়ে পারে না গুরুর সর্বস্ব গ্রহণ করতে।

বসেছিলাম পাশাপাশি। কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে তাই একধাপ নিচে বসে তাকালাম মুখের দিকে। বললাম,

– গুরুর সর্বস্ব বলতে কি বাবা আপনি গুরুশক্তির কথা বলতে চাইছেন?

কথাটা শেষ হতেই আনন্দে ডগমগ হয়ে বললেন,

– হাঁ হাঁ বেটা, আমি তাই-ই বলতে চাইছি। গুরুর শক্তি ছাড়া তাঁর আছেটা কি? ও শক্তিই তো কাটাবে সংসারমায়া আর জীবনের বন্ধন। যখনই শিষ্য তার সমস্ত কিছু অর্পণ করল- ব্যস, একেবারে নিশ্চিত জানবি, শিষ্য নিঃস্ব হন না, শূন্য হন না, পরিপূর্ণ হন গুরুশক্তিতে। কিন্তু এমন শিষ্য কোথায়, কটা পাবি এ সংসারে?

এমন আন্তরিকভাবে কথা বলছেন দেখে আমি আবেগের বশেই বলে ফেললাম,

– বাবা, সাধুরা সাধারণত কথা বলতে চান না। এড়িয়ে যান। এ আমি দেখেছি বহুবার, বহুক্ষেত্রে। এমন প্রসন্নভাবে কথা বলবেন আপনি ভাবতে পারিনি। মনে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে আমার।

হাসিতে ভরে উঠল সাধুবাবার মুখখানা। নিঃশব্দ হাসি। বললেন,

– বেটা সাধারণ মানুষ সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে কেউ আসে ভাব নিয়ে, কেউ অভাব নিয়ে। আমার মনে হয় মানুষের ভাব অভাবের বিচার না করে, যারা আসে তাদের সকলের সঙ্গেই কথা বলা উচিত।

প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞাসা করলাম,

– সেই সাত বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেছেন। তাতে তো বুঝতেই পারছি ইস্কুলের মুখ দেখেননি। গুরুজির কাছে থেকে কি কিছু পড়াশুনা করেছেন?

এবার হাসিতে একেবারে ফেটে পড়লেন। হাসির আওয়াজ শুনে স্নানরত কিছু তীর্থযাত্রী একঝলক তাকালেন আমাদের দিকে। সাধুবাবা ভ্রূক্ষেপ করলেন না। হাসতে হাসতে বললেন,

– না না বেটা, পড়াশুনা তো দূরের কথা একটা অক্ষরও চিনি না আমি।

জানতে চাইলাম,

– তাহলে এমন সুন্দর সুন্দর শ্লোক আর জ্ঞানগর্ভ কথা বলছেন কি করে?

দেরি না করেই বললেন,

– বেটা, রেডিওতে তোরা যেমন গান শুনে শুনে শিখে ফেলিস, শিখে ফেলিস তার কথা সুর, তেমনই গুরুজির মুখ থেকে এসব কথা আমি শুনেশুনেই শিখে ফেলেছি। এতক্ষণ যেসব কথা বললাম, জানবি আমার গুরুজির কথাই তোকে বললাম। আমার দয়াল গুরু শাস্ত্রের কথা ভিন্ন অন্য কোনও কথা বলতেন না।

এই কথাটুকু বলে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। মিনিটপাঁচেক কাটল এইভাবে। ভাবের ব্যাঘাত ঘটালাম না। কি ভাবছিলেন তা তিনিই জানেন। এবার তাকালেন আমার দিকে। আমি উন্মুখ হয়ে ছিলাম। তাকানোমাত্র জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা তীর্থে তীর্থে বেড়ান। চলার পথে সুন্দরী রমণীর দেখাও পান অসংখ্য। তাদের দেখে মনে কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না আপনার? নারীভোগ তো করেননি, ভোগের ইচ্ছা জাগেনি কখনও? বয়সে কামইন্দ্রিয় শিথিল হয়ে যায় তাই এখনকার কথা বলছি না। বলছি যখন আপনার যৌবন ছিল, বলছি সব মানুষের মনে যখন একটা সম্ভোগচাহিদা থাকে তখনকার কথা।

হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন করায় সাধুবাবা একটু হতভম্ব হয়ে গেলেন। মুখের ভাব দেখে মনে হল, কি উত্তর দেবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। তাকিয়ে রইলেন মুখের দিকে। আমি মুহুর্ত দেরি না করেই হাতজোড় করে বললাম,

– বাবা, আমার এ প্রশ্ন যদি আপনাকে কোনওরকমে বিচলিত করে থাকে, মনে যদি বিন্দুমাত্র অস্বস্তির সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন।

ক্ষমা প্রার্থনা করায় সাধুবাবা অভয় দিলেন হাতের ইশারায়। চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। এমনভাবে কাটল মিনিটদশে‌ক। বসে রইলাম উত্তরের আশায়। শুরু করলেন,

– বেটা, সংসারে সেই পুরুষ একেবারেই দুর্লভ, বিরল যে কখনও নারীর রূপযৌবন, স্তনযুগল আর অর্থে প্রলুব্ধ হয় না। সুতরাং সাধুরা যখন পুরুষ তখন তারাও পারে না এর বাইরে যেতে। তবে বেটা সংসারীদের সঙ্গে সাধুদের প্রলুব্ধ হওয়ার মধ্যে কমবেশি মাত্রাভেদ আছে। এই ভেদটুকু সংযম আর সাধুসন্ন্যাসীদের ব্যক্তিগত তপস্যার উপরে নির্ভর করছে। কারও কম, কারও বেশি, তবে থাকবেই। যৌবনে এসবকে উপেক্ষা করা মনের দিক থেকে সাধনজীবনে প্রথম অবস্থায় বেশ কঠিন বলে মনে হয়েছে। পরে দেখেছি কেমন করে যেন সব উতরেও গেছি গুরুর কৃপায়।

কথাগুলো শুনছি মন দিয়ে। অন্য কোনওদিকে মন নেই আমার, মন নেই সাধুবাবারও। একটু থেমে বললেন,

– বেটা তুই জোয়ান বয়েসের কথা জানতে চাইছিস, এই আশি বছরের বুড়োর কথা শোন। তীর্থে তীর্থে ঘুরি। কখনও একা বসে থাকি পথের ধারে। অজস্র নারীর মুখ দেখি আমি। পাশ দিয়ে যায় অনেকে। প্রণাম করে কেউ কেউ এসে। কথাও বা দুচারটে। অনেকে জানায় তাদের দুঃখের কথা। এইভাবে কেটে গেল দীর্ঘজীবনে এতগুলো বছর। তুই শুনলে অবাক হবি, এই বয়সেও কোনও রমণীকে দেখে মনে এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করি। ভীষণ ভাল লাগে। আনন্দের বন্যা বয় দেহমন ও প্রাণে।

একটু থামলেন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে। ভাবছেন হয়ত আমি কি ভাবছি। ভাবছি, বলেন কি সাধুবাবা। এই বয়সে কামেন্দ্রিয় হয়ত শিথিল হয়ে গেছে অথচ মানসিক দিক থেকে নারীর প্রতি আকর্ষণ অনুভব? আবার সাধনভজন জীবনটাও তো কম হল না। তাহলে ব্যাপারটা কি হল? এই মুহুর্তে মাথায় কিছু ঢুকল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম মুখের দিকে। সাধুবাবা বোধহয় বুঝে ফেলেছেন মনের কথা। মুচকি হেসে বললেন,

– হ্যাঁরে বেটা, সত্যি কথাই বলেছি আমি। এখনও মনে দারুণ আকর্ষণ অনুভব করি নারীর রূপযৌবন দেখে। আনন্দ হয় বেটা তবে কামের কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না মনে।

এ কথায় এতটুকু দেরি না করে বললাম,

– বাবা, কথাটা যেন ঠিক হল না। পৃথিবীতে জড় অজড় সমস্ত বস্তুরই একটা কমবেশি আকর্ষণ আছে। দেখলে কেউ কম, কেউ বেশি আকর্ষণ অনুভব করে। সেখানে সুন্দর অসুন্দরের বালাই নেই। বিষয় বা বস্তুর স্বকীয় গুণেই সেই আকর্ষণ। সবক্ষেত্রে কামের আকর্ষণ অনুভূত হয় না, এটা আমার ধারণা। কিন্তু নারী বিষয়ক যা কিছু চিন্তাভাবনা আকর্ষণ ও ভোগ, তা তো মূলত কাম থেকেই সৃষ্টি। এটাই সত্য। তাহলে কামই যখন প্রত্যক্ষভাবে ক্রিয়া করে মনের উপরে তখন কামের প্রতিক্রিয়া কেন হয় না মনে? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা?

কথাটা শুনে হেসে ফেললেন সাধুবাবা। বললেন হাসিমুখে,

– বেটা সংযমে থাকলে তুই আমার কথাটা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করতে পারতিস। অসংযমী জীবন যাদের, তারা এ কথার গুরুত্ব বুঝবে না, আসবে না উপলব্ধিতে। তুই ঠিকই বলেছিস, কাম থেকেই তো রমণীর প্রতি আকর্ষণ, তাছাড়া আর কি থেকে হবে? এ আকর্ষণ পুরুষের দেড়শো বছর বয়েসেও হতে পারে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে বেটা এখানে একটা কথা আছে। এ আকর্ষণ গৃহীদের দেহমনোগত, সংযমী সাধুদের ধর্মমনোগত। পার্থক্য এখানেই।

চারদিকে একবার বুলিয়ে নিলেন চোখদুটোকে। পরে আমার চোখের ওপর চোখ রেখে বললেন,

– বেটা, অসংযমী গৃহীদের কোনও নারীকে দেখামাত্র মনে যে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তা মন থেকে কামেন্দ্রিয় ছড়িয়ে দেয় সারা দেহে। বাহ্যত প্রকাশ না পেলেও পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া হয় দেহমনে, কম বা বেশি। এটা হয় কামভোগের বাসনা থেকে। এর নিবৃত্তি হয় কারও অসংযমে শুক্রক্ষয়ে, কারও নারীসঙ্গের মাধ্যমে। তৎক্ষণাৎ হয়, এমন নয়। কখনও না কখনও, কোনও না কোনও সময়ে। এই আকর্ষণের এইভাবে নিবৃত্তি, এটাই চলতে থাকে গৃহীজীবনে নারীপুরুষের। এই নিবৃত্তি তাৎক্ষণিকভাবে দেহমনে এক অদ্ভুত আনন্দের সৃষ্টি করে যেটা কামধর্ম এবং সম্পূর্ণ দেহগত, কারণ গৃহীদের মন থাকে ইন্দ্রিয়ের বশে। সংযমী সাধুদের তা হয় না। দীর্ঘদিনের জপতপের ফলে মন সরে আসে ভোগবাসনা থেকে। তবে পার্থিবজীবনে নারীদর্শন ও ভাবনাজনিত সমস্ত ক্রিয়া চলে মনের ওপরে। প্রতিটা মানুষের মন থাকে ইন্দ্রিয়ের বশে। সেই বশীভূত মনের বশে রয়েছে বুদ্ধি। সংযমী সাধুদের সাধনবলে মন ইন্দ্রিয় থেকে, বুদ্ধি মন থেকে মুক্ত হয়। ফলে নারীদর্শনজনিত ক্রিয়ারূপ আকর্ষণ মনে অনুভূত হলেও ইন্দ্রিয় সেটা মুক্তমন ও বুদ্ধির উপরে ক্রিয়া করতে পারে না। ফলে কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না দেহে। তবে নারীর রূপ যৌবনদর্শনের ফলে একটা কাম তো হবেই, নইলে প্রকৃতির নিয়ম যে মিথ্যে হয়ে যায়। কামইন্দ্রিয় মনের ওপর কোনওভাবে কাজ করে না বলেই মনে দর্শনে আকর্ষণজনিত একটা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় মাত্র, যা রূপ নেয় এক অপার্থিব আনন্দে‌র, যা বয়ে যায় প্রাণে মনে। সেইজন্যেই তো বিশ্ববিধাতার সৃষ্টি অজস্র নারীর রূপযৌবন দেখতে ভাললাগে। মন ভরে যায় আনন্দে। এখানে সংযমী সাধুদের মুক্তমনে কামইন্দ্রিয় রূপ নেয় এক অপার্থিব আনন্দের, অসংযমী গৃহীদের নেয় ভোগানন্দের। তাই সংযমী সাধুসন্ন্যাসীদের নারীদর্শনের ফলে যে আকর্ষণ ও আনন্দ তা ধর্মমনোগত।

রোদের তাপ একটু বেড়েছে তাই ঠান্ডাটাও একটু কম লাগছে। কনকনে ভাবটা এখন আর নেই। তীর্থযাত্রীদের আনাগোনা বেড়েছে অনেক, স্নানার্থীদেরও। সাধুবাবার ঝোলাকম্বল রয়েছে ঘাটেরই একপাশে। তিনি জানেন ওটা কেউ নেবে না। আর তো কিছু নেই তাই। মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

– এখানে আছিস কদিন?

ভাবতে হল না। বললাম,

– আজ ভোরে এসেছি, চলে যাব আজই। আগেও এসেছি পুষ্করে।

কোনও বাঁধা ধরা প্রশ্ন নিয়ে বসি না সাধুদের কাছে। যখন যে প্রশ্ন মনে আসে তখন সেটাই করি। প্রশ্ন করি প্রসঙ্গক্রমে। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, সংসারজীবনে থেকে কমবেশি ঈশ্বরকে ভাবছে প্রায় সকলেই। দীক্ষিত বা অদীক্ষিত সকলের কথাই বলছি। আমার প্রশ্ন সংসারীদের মধ্যে এমন কোনও শ্রেণি কি আছে, যাদের কখনও ঈশ্বরদর্শন হবে না বা মুক্তিলাভ করতে পারবে না?

প্রশ্নটা শোনামাত্র তাকালেন মুখের দিকে। এবার তাকানোর মধ্যে রয়েছে বেশ গভীরতা। হয়ত ভাবলেন কিছু। বিরক্ত হলেন না। একটা হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল চোখেমুখে। বললেন সহজভাবে স্বাভাবিক সুরে,

– গৃহীদের মধ্যে যারা অদীক্ষিত তারা যতই ভগবানকে ডাকুক, মাথাখুটে মরে গেলেও তাঁর স্বরূপ দর্শন তো হবেই না, মুক্তিলাভও হবে না। সংসারে এরা এসেছে নরক ঘাঁটতে, বিষয় বাড়াতে আর কামইন্দ্রিয়ের সুখভোগ করতে। ঈশ্বরের নামগানে তাদের কল্যাণ তো কিছু হবে কারণ তিনি যে সকলকে করুণা করার জন্যে বসে আছেন। তবে তাঁর রাজত্বে পৌঁছনোর দরজা বন্ধই থাকে। অদীক্ষিত গৃহীরা তাঁর নামগান করল মানে মনের জমি চাষ করল। গুরুর দেওয়া বীজ না পড়লে ফসল হবে কি করে? আবার গুরু বীজ নিলেই যে ফসল হবে, এমন ভাবাটাও ঠিক ভাবা নয়। শিষ্যের যত্নপালন আর জলসিঞ্চনের অর্থাৎ ভক্তি বিশ্বাস শরণাগতির উপরে ফসল বা তাঁর দর্শন করাবে, সাধনা চাই।

এই পর্যন্ত বলে খুব হাসতে লাগলেন। অবাক হয়ে গেলাম হাসি দেখে। হাসির কোনও কারণ খুঁজে পেলাম না বলে কারণ জানতে চাইলাম। সাধুবাবা বললেন,

– বেটা হাসছি কেন জানিস? গুরুকরণটা একশ্রেণির গৃহীদের কাছে বর্তমানে একটা আভিজাত্য প্রকাশের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন জানিস, যেমন নিজে ব্যভিচারে লিপ্ত কিংবা যোগ্যতার লেশটুকুও নেই অথচ বংশে কোনও গৌরব থাকলে তার নাম ভাঙিয়ে নিজে গৌরববোধ করে। ঠিক সেইরকম নামকরা গুরুসম্প্রদায়ে বা নামী গুরুর কাছে দীক্ষা নেয়। কোনওরকমে নিয়মরক্ষা করে একটু জপ করে, না করলে নয় বলে। অনেকে তো করেই না অথচ কথাপ্রসঙ্গে বলে, আমি অমুক গুরুর শিষ্য বা শিষ্যা। তমুক জায়গা থেকে দীক্ষিত। ভাবটা এমন বিরাট কিছু একটা করে ফেলেছি। এই জাতীয় গৃহীদের দীক্ষা হলেও তাদের দর্শনলাভ হয় না। আর মনের শান্তি যা দীক্ষায় হয়, তা তো হয়ই না। এদের দশা অদীক্ষিত গৃহীদের থেকে কম নয়, দীক্ষা নিয়েও। ভগবানের রাজত্বে ঢোকার অনুমতি পায় কিন্তু ঢোকার ইচ্ছা হয় না, ঢোকেও না। পাসপোর্ট হল তবে ভোগবাসনা আর সাধনবিমুখতায় এরা ভিসা পায় না। ঘুরে আসতে হয় নরক ঘাঁটতে। এদের মুক্তি হয়, এক জন্মে নয়।

মিনিটখানেক চুপ করে থেকে আবার বলতে শুরু করলেন,

– সংসারী নারীপুরুষের মধ্যে যারা কামাতুর বিষয়ী লোভী ও ক্রোধী, তারা দীক্ষিত হলেও তাদের ঈশ্বরদর্শন তো হবেই না, বিন্দুমাত্র ভক্তিলাভও হয় না। বিষয়ী ও লোভীর ভগবানকে ডাকা ধনবৃদ্ধি এবং তা রক্ষার্থে ঝামেলামুক্ত হতে। সংসারী সকলের ঈশ্বরদর্শন ও মুক্তিলাভ হতে পারে, তা নির্ভর করবে ব্যক্তিগত সাধনা ও গুরুকৃপার উপরে। বেটা, সাধনা করলে তাঁর কৃপা লাভ হবে। ওটা লাভ করলে সব লাভ হয়। ফাঁকি মেরে কৃপাদর্শমুক্তি এর কোনওটাই লাভ করা যায় না অধ্যাত্মজীবনে। মোক্ষ সংসারীদের কয়েক কোটিতে একটা হলেও হতে পারে সরাসরি। না হওয়ার সম্ভাবনাই পূর্ণমাত্রায়। তবে মুক্তি অজস্র সংসারীদের হয়, তবে যারা তাঁকে ধরে আছে নিষ্ঠার সঙ্গে।‌

কোনও কথা বললাম না। এক মনেই তিনি বলে চললেন,

– বেটা, মোক্ষ আর মুক্তির তফাৎ কিছু বুঝিস?

হ্যাঁ বা না কিছু বললাম না। সাধুবাবা বললেন,

– বলি শোন, জীবনে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার লীন হয়ে যাওয়ার নামই মোক্ষ। মুক্তি হল সাধনবলে মুক্ত আত্মা সংসারবন্ধন ছিন্ন করে গেল পরলোকে। সেখানেও চলতে লাগল তার সাধনভজন। আর জন্ম হল না। সাধনবলে বিভিন্ন শহর অতিক্রম করে একসময় আত্মা লীন হয় পরমাত্মায়। সেটা কার কতকালে হবে তা বলার সাধ্য নেই কারও। সংক্ষেপে এটুকুই জেনে রাখ।

এবার আমার চোখ থেকে সরালেন চোখদুটোকে। রাখলেন পুষ্করের জলে।

উদাসীন কণ্ঠে সুর করে বললেন,

নিত নহনেসে হরি মিলিতে তো জলজন্তু হোই।

ফলমূল থাকে হরি মিলিতে তো বাদুড় বাঁদরাই।।

তিরণ ভখনকে হরি মিলিতে তো বহুত মৃগ অজা।

স্ত্রী মোড়কে হরি মিলিতে তো বহুত রহে খোজা।

দুধ পিকে মরি মিলিতে তো বহুত রহে বত্স বালা।

মীরা কহে, বিনা প্রেম সে না মিলে নন্দলালা।

মীরার দোঁহা বলে সাধুবাবা আবেগভরা কণ্ঠে বললেন,

– বেটা, মীরার কথা যে সত্য তা এই জীবনে না এলে আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না।

একটু থামলেন। জিজ্ঞাসা করলাম,

– সাধুজীবনে আসার পর কেটে গেল প্রায় সত্তরটা বছর। এত বছরের এই জীবনে আপনার অন্তরে এমন কোনও ক্ষোভদুঃখ বা বেদনা কি কিছু যা কষ্ট দেয় মনটাকে?

দেরি না করে বললেন,

– এ জীবনেও যদি গৃহীদের মতো ক্ষোভ দুঃখ বেদনা পীড়িত করে, তাহলে আর সাধুজীবনের মূল্য কি রইল, সাধু রইলাম কোথায়? ওসব কিছু হয়নি হয়ও না। বেটা, একজন রূপসী রমণীও যেমন অতি বড় কুৎসিত যদি সে ঈশ্বরে মনোনিবেশ না করে, তেমনই কুৎসিত অধম সেই সাধু যার বিন্দুমাত্র ক্ষোভ দুঃখ বেদনা আছে সাধুজীবনে।

আরও অনেক অনেক কথা বলা হল সাধুবাবার সঙ্গে। অনেক কথা শুনে অনেক কথার শেষে জিজ্ঞাসা করলাম শেষ কথাটা,

– আচ্ছা বাবা, সত্যিই কি তাঁর দর্শন পাওয়া যায়?

কথাটা শেষ হতে না হতেই টেবিল চাপড়ে কথা বলার মতো বাঁ-হাতের তালুতে ডানহাতের চাপড় মেরে বললেন উদ্দীপ্ত কণ্ঠে দৃঢ়তার সঙ্গে,

– আলবৎ পাওয়া যায়। কেমন করে পাওয়া যায় জানিস, দেহটাকে প্রদীপ, জীবনটাকে সলতে আর দেহের প্রতিটা রক্তবিন্দুকে তেল করে জ্বাললে, তবেই।

পুষ্করতীর্থের রামগতপ্রাণ অতিবৃদ্ধ নির্বিকার নির্লিপ্ত সাধুবাবাকে বললাম,

– বাবা, আপনি কি তাঁর দর্শন পেয়েছেন?

মুহুর্তমাত্র দেরি না করে উদাত্তকণ্ঠে বললেন,

– বেটা, রামজির সমান রামজি শুধু নিজেই। তাঁকে ডাকলে সবকিছুই পাওয়া যায় অনায়াসে। দর্শন ভি।

Show Full Article

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button