Mythology

আরতি কেন করা হয়, করলে তার ফলই বা কি, বুড়িমাকে জানালেন স্বয়ং গোপাল

সেদিন বুড়িমার সঙ্গ করার সময়, ‘আজ সকালে গোপালরে আরতি করার সময় গোপাল কইছে’ বলে এক অদ্ভুত কথা শোনালেন।'

সেদিন বুড়িমার সঙ্গ করার সময়, ‘আজ সকালে গোপালরে আরতি করার সময় গোপাল কইছে’ বলে এক অদ্ভুত কথা শোনালেন, যে কোনও মঠমন্দির মিশন কিংবা নিজের বাড়িতে স্থাপিত বিগ্রহ, দেবদেবীর ফটোতে পুজোর পর আরতি করা হয় কেন, করলে তার ফলই বা কি?

আরতি করলে, যে করে তার যেমন কল্যাণ হয় তেমনই কল্যাণ হয় আরতি দর্শনকারীর। আরতির সময় ফটো বা বিগ্রহের মধ্যে নিজ মূর্তির প্রকাশ করেন শ্রীভগবান। যিনি আরতি করেন এবং দর্শনকারী, উভয়ের উপরে তাঁর কৃপা ও করুণাদৃষ্টি পড়ে। এতে অশেষ কল্যাণ হয় দেহমনের। যারা প্রতিদিন পুজোর পর গুরু বা ইষ্টের আরতি করে, তারা অলক্ষ্যে নিজেরই কল্যাণ করে।

যেমন, ধূপ দীপ জলশঙ্খ চামর বস্ত্র ফুল ইত্যাদি দিয়ে আরতি করা হয়। এগুলি দিয়ে কেন করা হয়, কারণটাই বা কি? এর অন্তর্নিহিত সত্যটা গোপাল বলেছিল বুড়িমাকে, এইরকম –

ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করলে নিজের মনের অন্ধকার নাশ হয়। সত্ত্বগুণের আলোকে আলোকিত হয় মন। আরতিকারী ভক্তের মন ফুলের মতো সুন্দর হয় সুগন্ধি ফুল দিয়ে আরতি করলে। ফুলসৌরভের মতো প্রিয় হয়ে ওঠে সংসারে সকলের কাছে।

সুগন্ধি ধূপ দিয়ে আরতি করলে তার গন্ধ বাতাসে মিশে যেমন বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তেমনই ভক্তের যশরূপ সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে দূরান্তরে। মঙ্গলের প্রতীক শঙ্খ। শঙ্খের আরতিতে রোগমুক্ত হয় দেহমনের। ইন্দ্রিয়ের বেগ কমে যায় ধীরে ধীরে। আলতা পরালে মন ঈশ্বরপ্রেম রঙে রাঙায়িত হয়। কাজল পরালে জ্ঞাননেত্র উন্মোচিত হয়।

নতুন বস্ত্র পরলে মন যেমন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, তেমনই নতুন বস্ত্র দিয়ে আরতি করলে আরতিকারীর মন সদাসর্বদা প্রফুল্ল ও চিত্ত থাকে প্রসন্ন। এই হল বিভিন্ন জিনিস দিয়ে আরতি করার অন্তর্নিহিত ফল ও রহস্যের কথা। বাহ্যত আমরা মনে করি এসব করি মানে ভগবানের সেবা করি, আসলে তা করি না। নিজের দেহমন চিত্তের কল্যাণসাধন পরোক্ষে নিজেরাই করে থাকি। অধ্যাত্মজ্ঞান লাভ হয়েছে, দিব্যদৃষ্টি খুলেছে যাদের, তারাই এসব দেখতে পায় সুন্দরভাবে।

পড়ুন : মাকালী নিজে স্বর্গলোক ঘুরিয়ে দেখালেন দৃষ্টিহীন বৃদ্ধাকে

বুড়িমা প্রায়ই বিভিন্ন দেবদেবী, প্রাচীন ভারতের মুনি ঋষি ও মহাপুরুষদের দিব্যদেহ দর্শন করতেন। একদিনেই দর্শন হত, তা নয় কিন্তু। কখনও আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করতে করতে দর্শন হত। তখনই বর্ণনা দিতেন, কি দেখলেন। কখনও তাঁর বাড়িতে, কখনও বা পুজোয় বসে। বাড়িতে থাকাকালীন দর্শন হলে তিনি পরের দিন এসে বলতেন। যাঁদের দর্শন করতেন, তাঁদের সঙ্গে কোনও কথা হত না। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘না বাবা, আমার সঙ্গে কোনও কথা হয় নাই।’

এমন অসংখ্য দেবদেবী, মুনি ঋষিদের কথা বলতেন, যাঁদের কথা বিভিন্ন পুরাণে আছে অথচ আমার জানার বাইরে। বুড়িমা শাস্ত্র ও পুরাণ চর্চা করেননি কিন্তু তাঁদের নাম বলতেন কিভাবে তা ভেবে তখন যেমন, এখনও অবাক হই। তিনি যে ঠিক বলেছেন তা মাস্টারমশাই-এর সম্মতিতেই বোঝা যেত।

রামায়ণ ও মহাভারতের অনেক মুনি ঋষি ও বিশিষ্ট চরিত্রদের দিব্যদেহ দর্শনের কথা শুনে এই মহাকাব্য দুটির বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্রগুলির উপর বিশ্বাস তো ছিলই, তা পরে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে। এখানে অসংখ্যর মধ্যে থেকে সামান্য কয়েকজন দেবদেবী ও মুনি ঋষিদের দিব্যদেহের বর্ণনা তুলে ধরছি, যা বুড়িমা দেখেছিলেন দিব্যদৃষ্টিতে।

দেবী সরস্বতী – এই দেবীর একমাত্র ঐশ্বর্য হল জ্ঞান। দেবী সরস্বতীর সর্বাঙ্গ দুধের মতো ধবধবে সাদা তবে চোখের মণি, মাথার চুল ও ভ্রু-দুটি ছাড়া। এগুলি কালো। গলায় মুক্তোর মালা, অন্যান্য সমস্ত অলঙ্কারই দেবীর সাদা। প্রসন্ন দিব্য বিগ্রহের বাঁহাতে বীণা। শুদ্ধসত্ত্ব দেবীর পরিহিত বস্ত্রাদিও শ্বেতবর্ণের। ডানহাতে শ্বেতপদ্ম। বাহন হাঁসটিও শ্বেতপদ্মের মতো সাদা।

দেবী লক্ষ্মী – লক্ষ্মীদেবী রজোগুণসম্পন্না ও নানান ঐশ্বর্যমণ্ডিত। হলুদরঙের দেহ জ্যোতির্ময়। দেবীর বসন রক্তবর্ণ। বাহন পেঁচার গায়ের রঙ সাদার উপর হাল্কা খয়েরীভাব।

মহাকাল ভৈরব – বসন বাঘের ছাল। চতুর্ভুজ রুদ্রমূর্তি। ঊর্ধ্বমুখী বিশাল জটা মাথায়। মাথায় জটা বেড় দিয়ে বিশাল ফণাধর সাপ, গলায়ও। একই সঙ্গে গলায় হাড় ও নরমুণ্ডমালা।

যোগিনী মূর্তি – মাকালীর দু-পাশে সবসময় থাকেন দু’জন যোগিনী। এঁদের বসন বাঘের ছাল। তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা ও রক্তাভ। মুখের দুপাশে ঠোঁটের কোণ দিয়ে সবসময় রক্ত ঝরছে। দেহের উপরের অংশ বস্ত্রহীন, দোদুল্যমান স্তনযুগল। পুরুষদের মতো উঁচুলম্বা, হাতে রক্তমাখা খড়্গ। সিঁথেয় সিঁদুর, এলোচুল। দুচোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।

মা ভবতারিণী – প্রসন্ন উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় মূর্তি। এলোকেশী। চতুর্ভুজা দেবীর ত্রিনয়ন। করুণাভরা মুখমণ্ডল। গায়ের রং উজ্জ্বল কালো। সবসনা।

সাতটি নদী – গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, গোদাবরী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী। এই নদীগুলির জ্যোতির্ময় দেবী মূর্তিও আছে। গঙ্গা মকরবাহিনী, মাথায় সর্বদা শিবের অবস্থান। গঙ্গাদেবীর সঙ্গে অবস্থান করেন ব্রহ্মা ও রাজা ভগীরথ। দেবীর দুহাত, শ্বেতবর্ণ, দুনয়ন। শ্বেতবসনা দেবী এলোকেশী।

জহু মুনি – গায়ের রং ধবধবে সাদা, মাথায় চুল ঝুটি করে বাঁধা, জটা নয়। খালি গায়ে থাকেন। আজানুলম্বিত ডানহাতে কাঠের কমণ্ডলু। শিশুসুলভ চোখের চাউনি। হলুদ রঙের কাপড় কোঁচা মেরে পরা। বাম বগলে কুশাসন।

ষষ্ঠীদেবী – দেবীর গায়ের রং দুধে আলতা বলা যায়, হালকা গোলাপি। সোনালি কাপড়, নানা অলঙ্কারে সজ্জিত দেহ। দেবীর বালিকা জ্যোতির্ময় মূর্তি এলোকেশী। বাহন বিড়াল থাকে সঙ্গে। প্রসন্ন ও সুশোভন মুখমণ্ডল। দেবী স্থির যৌবনা।

দেবী হৈমবতী – দেবীর পরনে সাদা শাড়ি, এলোচুল। জ্যোৎস্নার মতো স্নিগ্ধ জ্যোতিঃ সর্বদা বিচ্ছুরিত হচ্ছে দেহ থেকে। চোখের দৃষ্টি স্নিগ্ধ তন্দ্রাচ্ছন্ন। মাখনের মতো দেহ।

বেতাল – বেতালের দু-কানে সোনার মোটা মাকড়ি। ঘন সবুজ রঙের দেহ। নিম্নাঙ্গে অতি স্বল্প বস্ত্র। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল। পিটানো চেহারা। উঁচু লম্বা।

মহিষাসুর – শিবের অংশ থেকেই জন্ম মহিষাসুরের। কঠোর পরিশ্রমী সাঁওতালদের মতো দেহের গঠন। কোমরে লালকাপড় জড়ানো হাঁটুর খানিক উপর পর্যন্ত। গায়ের রং অত্যন্ত কালো। দাড়ি নেই তবে মোটা গোঁফ আছে। মহিষাসুর শিবভক্ত তাই কপালে অর্ধচন্দ্রাকারে শৈবতিলক।

ধর্মরাজ যম – জ্যোতির্ময় চেহারা। গায়ের রং ফরসা। ফালা ফালা চোখ। মাথায় আকর্ষণীয় মুকুট। কানে কুণ্ডল। ডান কাঁধে সোনার ধর্মদণ্ড। বেশ বড় গোঁফ। সোনার জরি বসানো ঝলমলে পোশাক।

সূর্যদেবের পত্নী দেবী সংজ্ঞা – স্নিগ্ধ জ্যোতিঃভরা দেহ। মাঝারি চেহারা, সামান্য স্থূল, বেশ উচ্চতা, লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরা, বয়স্ক। সারা দেহে একটা অলংকার নেই। গলায় চন্দনকাঠের মালা পরা।

সূর্যদেবের আর এক পত্নী সবর্ণা বা ছায়ার গায়ের রং একদম পাকা সোনা যেন। মাথা ভরা এলোচুল। উজ্জ্বল গায়ের রং, ওই রঙে রাঙায়িত হয়েছে দেবীর শাড়ি। সংজ্ঞার সহোদরা ছায়া, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার কন্যা।

দেবগুরু বৃহস্পতি – ঋষি অঙ্গিরার পুত্র বৃহস্পতি। দীর্ঘকায় চেহারা। সামান্য স্থূল। গায়ের রং উজ্জ্বল হলুদ। পাগড়ির মতো করে জড়ানো জটা। গলায় রুদ্রাক্ষ। গালভর্তি দাড়ি বুক পর্যন্ত। জ্যোতির্ময় চেহারা।

বিশ্বামিত্র মুনি – মাথায় চুল কোঁকড়ানো। গায়ের রং বেশ কালো। দীর্ঘ দেহ, আকর্ণবিস্তৃত চোখদুটির তারা সব সময় ঘুরছে। কবজি গায়ে ও বাহুতে নানান অলংকারের সঙ্গে মাথায় মণিমুক্তাখচিত দিব্যমুকুট। রাজবেশে বিশ্বামিত্রের কোমরে কোষবন্ধ তলোয়ার এবং পিঠে তীরধনুক।

মহর্ষি বাল্মীকি – মাঝারি চেহারায় অত্যন্ত প্রশস্ত কপাল। মাথায় সামান্য টাক ও ভ্রুদুটির চুল সাদা ধবধবে। পাকা দাড়ি নেমে এসেছে পেট পর্যন্ত। চোখের চাউনি অত্যন্ত স্নিগ্ধ। টিকালো ও তীক্ষ্ণ নাক। মাথায় জটা রুক্ষ ও খয়েরী। দীপ্তিময় ফরসা চেহারা, খালি গা।

দেবী অপরাজিতা – দুধে আলতা গায়ের রং, এক কথায় গোলাপি। পদ্মের মতো মুখমণ্ডলে ডাগর চোখ। পরনে দেবীর অপরাজিতা ফুলের রঙের শাড়ি। দেবী চতুর্ভুজা। সৌন্দর্যে অপরূপা।

দেবসেনাপতি কার্তিক – গায়ের রং শুভ্র। চেহারায় বালক। মাথায় চুল কোঁকড়ানো। মুকুটহীন ও খালি গা। সাদা ধুতিপরা কোঁচা দিয়ে। দুহাতে সোনার বালা পরা। বাম হাতে তীরধনুক, গলায় সোনার হার। পায়ে চটি বা জুতো নেই, খালি পা।

দেবী চণ্ডিকা – দেবী দুর্গার নামান্তরই চণ্ডিকা। রাজরাজেশ্বরী বিগ্রহে সোনালিরঙের শাড়িপরা, দেহের রং সোনালি, মাথায় সোনার মুকুট। দেবী দশভুজা নয়, দু-হাত ও ত্রিনয়ন। আলুলায়িত কেশদাম কোমর ছাড়িয়ে, উজ্জ্বল কালো।

রাধারানির সহচরী ললিতা সখী – দেবীমূর্তি দিব্যদেহী। ছোট কপাল তবে টানা চোখদুটি মাঝারি আকারের। ব্রজবাসী মেয়েরা যেমন পরে তেমনই পরেন ঘাগরা। সুন্দর মুখশ্রী, বেণীবাঁধা চুল নেমে এসেছে পিঠ বেয়ে। লাল ব্লাউজ ও আকাশি রঙের ওড়না, টিকালো নাকে গোপীচন্দনের তিলক। ললিতা সখীর জোড়া ভ্রু, গৌরবর্ণা।

চামুণ্ডা দেবী – দেবীর চেহারা বিশাল। চার হাত, পেটটা বেশ বড়। ত্রিনয়নার গায়ের রং শ্যামবর্ণ। গলায় মুণ্ডমালা, সবসনা। উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় তবে ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি। অপরূপা চণ্ডিকা তথা দুর্গার রুদ্রমূর্তিই দেবী চামুণ্ডা।

দেবী রুদ্রা চামুণ্ডা আবার করাল বদনা, এলোচুল। চামুণ্ডার মতো চার হাত নয়, দেবী দ্বিভুজা, লোলজিহ্বা। দেবীর বসন রক্তবস্ত্র।

দধীচি মুনি – অত্যন্ত শীর্ণকায় চেহারা ও অসম্ভব লম্বা। মাথায় জটা দুধের মতো সাদা। টানা টানা ফালাফালা চোখদুটো কান পর্যন্ত বিস্তৃত। বিদ্যুৎবরণ চেহারায় আজানুলম্বিত বাহু।

সাংখ্যদর্শন প্রণেতা কপিলমুনি – পরনে হলুদরঙের কাপড়। মাথায় জটা পাকানো অবস্থায়, সাদা দুধের মতো। অসম্ভব লম্বা চেহারায় আকর্ণ ফালাফালা চোখ। ধবধবে সাদা দাড়ি নেমে এসেছে পেট পর্যন্ত। মাথায় জটা হাতখানেক উঁচু। কপিলমুনির গলায় ও বাহুতে রুদ্রাক্ষের মালা। হাতে জপের মালাটিও রুদ্রাক্ষের। মুনির বুকের পাটা অত্যন্ত চওড়া, প্রায় হাত দুয়েক। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও টিকালো নাক। তপোক্লিষ্ট মুখমণ্ডল ভারী সুন্দর।

শ্রীরামচন্দ্র ও শবরী – দেহের রঙ শ্যামল। বনবাসের বেশ। মাথার মাঝখানে ঝুঁটি বাঁধা। কাঁধে ধনু, পিঠে বাঁধা তূণ। সুদর্শন মুখমণ্ডল।

শবরী অপরূপা। গায়ের রং উজ্জ্বল, ফালাফালা চোখে দেবীচাউনি। মাথার বিশাল জটা নেমে এসেছে একেবারে পা পর্যন্ত।

সঞ্জয় – মহাভারতীয় যুগের প্রজ্ঞাচক্ষু সঞ্জয়, যিনি ধৃতরাষ্ট্রকে জ্ঞাননেত্রে দেখে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছিলেন। উচ্চতায় সঞ্জয় বিশাল। গায়ের রং ফরসা ও অসম্ভব উজ্জ্বল। বেশ বড় বড় চোখ। মাথাভর্তি ছোট ছোট চুল। পরনে সাদা কাপড়। গায়ে রাজকীয় কোনও পোশাক নেই, সাদা উত্তরীয়। মুখশ্রী সুন্দর।

বারুণী – বরুণদেবের পত্নী বারুণী। এই দেবীর উদ্দেশ্যে চৈত্রমাসে বারুণীস্নান হয়। দেবী অসাধারণ সুন্দরী। পরনে সাদা শাড়িতে লাল পাড় ও লাল আঁচল। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রং। করুণাভরা চোখ। এলোকেশীর মাথায় ঝলমলে সোনার মুকুট।

বশিষ্ঠ মুনি – শক্ত সমর্থ সুউচ্চ চেহারা। মাথার কেশ সাদা তবে বেশ রুক্ষ। দাড়ি ও গোঁফ আছে। কপাল ও প্রশস্ত বুকে শ্বেত ও রক্তচন্দনের রেখা লম্বা করে টানা। গলায় ও বাহুতে রুদ্রাক্ষের মালা। সুদর্শন মুনির টিকালো নাক, আকর্ণ চক্ষুযুগল।

লঙ্কেশ্বর রাবণ – বিশাল চেহারার পুরুষ। গায়ের রং নীলাভ। দশটি মুখের মধ্যে মাঝখানের মুখে বেশ বড় গোঁফ। অতি মূল্যবান চাদরে মোড়া দেহ। প্রশস্ত বক্ষ।

মন্দোদরী – সুন্দরী, কোমল হৃদয়। শ্রীরামপত্নী সীতার চেয়েও অনেক বেশি লাবণ্যময়ী। মাথার চুল হাঁটু পর্যন্ত। পরনে মন্দোদরীর উজ্জ্বল লালরঙের শাড়ি। সোনার বড় বড় সুন্দর ফুলে ভরা গোটা শাড়ির জমি। এতে বসানো হীরা পান্না মুক্তা প্রভৃতি নানা রত্ন। বিভিন্ন দেবীদের চেয়েও অনেক অ-নে-ক বেশি সুন্দরী লঙ্কেশ্বরপত্নী দেবী মন্দোদরী।

শিবের চেহারার বর্ণনা শুনেছিলাম অন্যভাবে। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমল। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতী ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম মাস্টারমশাই স্বর্গীয় জ্ঞানদাপ্রসাদ চৌধুরী। একুশেই শিলং ইন্টারন্যাশনাল মিশনে ইংরাজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। ধুতি শার্ট পরে মিশনে শিক্ষকতা করতেন।

মিশনেই আর একজন বাঙালি ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন তপাদার। মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে একই মেসে একঘরে থাকতেন। মাস্টারমশাই-এর চেয়ে বয়েসে দু-চার বছরের বড়। বাড়ি যশোরে। মাস্টারমশাই পাবনার জমিদার বংশের। দুজনের সখ্যতা ছিল দারুণ। শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী সারদা মায়ের সরাসরি মন্ত্রশিষ্য ছিলেন দক্ষিণাবাবু।

কোনও একদিন কথাপ্রসঙ্গে মাস্টারমশাই কৌতূহলী হয়ে দক্ষিণাবাবুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘শিবের কি দাড়ি গোঁফ আছে?’

কথাটা শুনে দক্ষিণাবাবু যশুরে ভাষায় বলেন, ‘মায়ের ইচ্ছে থাকলে জানতি পারবেন।’

কথা এই পর্যন্ত। সেদিন গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় (দক্ষিণাবাবুর ইচ্ছাতে) মাস্টারমশাই-এর। মুখোমুখি খাট। নাইট ল্যাম্প জ্বলছে। মাস্টারমশাই দেখলেন, দক্ষিণাবাবু সম্পূর্ণ উলঙ্গ। পদ্মাসনে চোখ বুজে বিছানা থেকে হাত দুয়েক উপরে শূন্যে ভাসমান অবস্থায়। এবার শিবের বর্ণনায় দক্ষিণাবাবু যেন সামনে দণ্ডায়মান শিবকে দেখে বলছেন,

– ‘শিবের মাথায় জটা ঝুঁটি করে বাঁধা। জ্যোতির্ময় দেহ। গায়ের রঙ শ্বেতপদ্মের মতো। টানাটানা ফালাফালা আয়ত ত্রিলোচন। কানে কুন্তল। গলায় জীবন্ত ফণাধর সাপ। জটাধারে উজ্জ্বল চন্দ্রের অবস্থান অর্ধচন্দ্রাকারে। সামান্য ভুঁড়ি। শিবের দাড়ি গোঁফ দুই-ই আছে। মাথায় জটা থেকে দাড়ি গোঁফ সবই সোনালিরঙের। দাড়ি লম্বায় ভুঁড়ির একটু উপরে।’

শিবের বর্ণনা শেষ হতেই দক্ষিণাবাবুর শূন্যে ভাসমান দেহ ধীরে ধীরে নেমে এল বিছানায়। বিস্মিত ও হতবাক মাস্টারমশাইকে দক্ষিণাবাবু সেদিন বলেছিলেন, ‘জ্ঞানদাবাবু, আজ যা দ্যাখলেন, দয়া করে কাউকে বলবেন না।’

সারা ভারত ও নেপালের অসংখ্য মঠ মন্দির মিশন আশ্রম আমি ঘুরেছি কিন্তু কোথাও, কোনও মন্দিরে শিবের দাড়ি গোঁফওয়ালা ছবি বা মূর্তি আমার নজরে পড়েনি। একমাত্র তন্ত্রশাস্ত্রের প্রথমে শিবের বক্ষোপরি কালীর ছবিতে শিবের এবং দাড়ি গোঁফওয়ালা মূর্তি খোদাই করা আছে কামাখ্যা মন্দিরের দেয়ালে।

Show More

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button