Tuesday , March 19 2019
Dwarkadhish Temple
দ্বারকাধীশ মন্দির

মানসিক শান্তি পাওয়ার পথ জানালেন সাধুবাবা, দ্বারকার শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে বসে

দ্বারকায় কৃষ্ণমন্দিরের পিছনে রয়েছে ছাপ্পান্নটা সিঁড়ি। সোজা নেমে এলাম। সিঁড়ির পরে গোমতী ঘাট। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গোমতী। এতে কোথাও হাঁটু, কোথাও বা কোমর জল। জোয়ারে জল বাড়ে। এখানে ভাটা তাই তিরতির করে জল বয়ে চলেছে সমুদ্রের দিকে। বইতে যেন কষ্ট হচ্ছে। এখানে গোমতী বড় রুগ্না। দেখলে বেশ বোঝা যায় এককালে যৌবন ছিল, রূপও ছিল। বয়েস বেড়েছে। রূপও গেছে – গেছে যৌবনও। এখন গোমতী রুগ্না বৃদ্ধা। চলার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। নারী আর যৌবন মানুষ যেমন অল্পকালই ভোগ করতে পারে, তেমন অবস্থা গোমতীর। এখন কোনও আকর্ষণই নেই। স্তনহীনা নারী যেন। গোমতী, এককালের জমিদারগিন্নি। কালে রূপ পড়ে গেছে, তবু গৌরব তো একটা আছেই। তাই মানুষ শ্রদ্ধা করে, ভক্তিও। স্নান করে মুক্তির আশায়।

গোমতী ঘাটের পাশে ছোট্ট একটা শিবমন্দির। এরই ছোট্ট বাঁধানো চাতালে বসে আছেন এক সাধুবাবা। গায়ে গেরুয়া রঙের ফতুয়া। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত একটা কাপড় পরা একপাটা করে। কাছা দেয়া নয়, বাউল কায়দায়। বেশ ফরসা গায়ের রঙ। ঝাঁকড়া চুল নেমে এসেছে কাঁধ পর্যন্ত। পাশে ছোট্ট একটা ঝোলা। ইহলোকের সম্বল। আপনভাবে বসে আছেন কম্বল পেতে। সঙ্গে আর কিছু দেখলাম না। নাক চোখ মুখ খুব সুন্দর। বয়েসে বৃদ্ধ। বেশ বয়েস।

কালটা শীতের, তবে এখানে শীতটা এখন কম সমুদ্রের ধার বলে। তবুও হালকা শীতের আমেজ একটা আছেই। পাশ দিয়ে অনেকে চলেছেন স্নানে, ফিরছেন অনেকে স্নান সেরে। আরও কয়েকজন সাধুবাবা বসে আছেন একটু দূরে। এগোলাম না বসলাম সাধুবাবার চাতালে। ইশারায় বসতে বললেন কম্বলের উপরে। মুখেও বললেন,

– বেটা, আমার কম্বলের উপরেই বোস।

একটু ইতস্তত করে বললাম,

– আপনার আসনে বসব, আমি তো গৃহী!

 

কম্বলের একপাশে একটু সরে বসে বললেন,

– বোস বোস, তাতে কিছু যায় আসে না।

উঠে গিয়ে বসলাম। প্রণাম করেই বসলাম। প্রণামে বাধা দিলেন না। শুধু কপালে হাতদুটো ঠেকালেন নমস্কারের মতো করে। বললাম,

– বাবা কি দ্বারকাতেই থাকেন, না অন্য কোথাও?

মুখের ভাবটা প্রসন্ন তবে হাসি নেই মুখে। সাধারণভাবে বললেন,

– এখানে এসেছি আজ দিনদশেক হল। থাকব আরও কয়েকটা দিন। বাড়ি ছিল আমার টেহেরি গাড়োয়ালে।

মুখোমুখি বসে কথা বলছি। এখন স্নানের সময়। স্নানযাত্রীরা পাশ দিয়ে চলেছেন দলে দলে ক্যাঁচর ম্যাচর করতে করতে। কেউ অন্যের কাছে কোনও কাজ বা স্বার্থসিদ্ধির জন্যে গেলে প্রথমেই নিজের প্রয়োজনের কথা বলে না। এতে উদ্দেশ্য সিদ্ধির ব্যাঘাত ঘটবে মনে করে। যেমন, ভাল আছেন স্যার? বাড়ির সবাই ভাল তো? জিনিসের কি দাম, ছোঁয়া যাচ্ছে না, আগুন! কোনও বাড়িতে গেলে কাছে বাচ্চা পেলে তাকে, কি সোনা ভাল আছ তো? কোন কেলাসে পড়ছো? তোমাদের স্কুলের নাম কি? বাচ্চার মায়ের প্রবেশ, মাসিমা ভাল আছেন? একদম সময় পাই না। মাঝে ছিলাম না, পাটনায় গেছিলাম।

যত রাজ্যের অবাঞ্ছিত কথা। পরে আসে আসল কথায়, যে উদ্দেশ্য নিয়ে যাওয়া। এই ব্যাপারটা সবক্ষেত্রে, সব পরিবারে স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজন যেখানে। আসল কথাটা জানার জন্যে সাধুবাবার ক্ষেত্রে মাসিমা, তোতন সোনাটা করতেই হয়। করলাম,

– বাবার কি সব তীর্থদর্শন হয়ে গেছে?

 

মুখের ভাবের কোনও পরিবর্তন হয়নি, একইভাবে বললেন,

– হাঁ বেটা, ভারতের প্রায় সব তীর্থদর্শনই হয়েছে ভগবানের কৃপায়।

Dwarkadhish Temple
দ্বারকাধীশ মন্দির

– এখান থেকে কোথায় যাবেন?

একটু ভেবে সাধুবাবা বললেন,

– শীতটা একটু কমলে চলে যাব পাহাড়ে। সমতলের চেয়ে পাহাড়ই ভাল। সাধনভজনের উপযুক্ত স্থানই হল পাহাড়। কেউ বিরক্ত করে না। সমতলে কোথাও একটু শান্তিতে বসার উপায় নেই। বসলেই লোকে বিরক্ত করে। কারও রোগ, কারও সংসারে অশান্তি, কারও না কারও কিছু না কিছু লেগেই আছে। সব ঠিক করে দাও বাবা। এইভাবে বিরক্ত করে লোকে, তাই পাহাড়ে চলে যাব।

কথাটা শোনা মাত্র বললাম,

– বাবা, আপনি তো মানুষ। সাধুরাই তো বলেন মানুষের মধ্যে ভগবান তাই যদি হয়, তাহলে আপনি মানুষ হয়ে ভগবানরূপী মানুষকে উপেক্ষা করতে চাইছেন কেন?

 

একটু প্রতিবাদের সুরে বললেন,

– বেটা, আমি সাধু। আমি ডাক্তার নাকি যে কেউ এলে আমি তার রোগ ভাল করে দিতে পারব! রোগের জন্যে তো ডাক্তার রয়েছে। এবার ধর কারও স্বামী স্ত্রীতে বনিবনা হচ্ছে না। নিত্য অশান্তি লেগেই আছে। আমি তাদের কি করতে পারি? আমি বললে যদি মানুষ রোগ থেকে মুক্তি পেত, স্বামী স্ত্রীতে মিল হয়ে যেত, তাহলে তো আমার জন্যে হাসপাতাল ডাক্তার সব উঠে যাবে। শান্তি এসে যাবে ঘরে ঘরে। তুই বল এগুলো কি কোনও সাধুর পক্ষে করা সম্ভব। যারা করছে শুনবি, জানবি তারা ভাঁওতা দিচ্ছে, গৃহীদের ঠকাচ্ছে। এখন সাধুদের কাছে সব ব্যাপার নিয়ে যদি কেউ আসে, তার সমস্যা সাধুদের শান্তি নষ্ট করে কিনা একবার ভেবে দেখতো! যেটা করা সম্ভব না সেটা নিয়ে অন্য কারও শান্তি নষ্ট করাটা ঠিক নয়। এটাকে যদি ভগবানের উপেক্ষা করা বলিস তাহলে আমার কিছু করার নেই, বলারও নেই।

আমাদের দুজনকে দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে স্নানযাত্রীরা। কথার ফাঁকে ফাঁকে তাদের দিকেও চোখ আমার, সাধুবাবারও। কেউ কিছু অবশ্য বলছে না। আমি বললাম,

– মানসিক শান্তি পাওয়ার পথটা কি আপনার জানা আছে?

 

এ কথার উত্তরে বেশ জোর দিয়ে বললেন,

– বেটা, ‘জিসকা পাস ভজন হ্যায়’ এবং যার মধ্যে সততা আছে, তার শান্তি করায়ত্ত। এ দুটোর মধ্যে দুটোই থাকতে হবে। একটা থাকবে আর একটা থাকবে না তাহলে কিন্তু শান্তিও থাকবে না। যেমন ধর একজন সমানে ভগবানকে ডাকছে খোল করতাল পিটিয়ে, দানও করছে অঢেল। বাড়িতে বারো মাসে তেরো পার্বণও লেগে আছে অথচ অন্তরে ও কর্মে সততার এতটুকুও নেই, এদেরও কিন্তু শান্তি নেই। এবার ধর কেউ প্রকৃত অন্তরে সৎ অথচ সাধনভজন নেই, তারও শান্তি নেই।

জানতে চাইলাম,

– এ রকম হবে কেন এবং হয়ই বা কেন? ভগবানকে ডেকেও শান্তি নেই আবার তাকে না ডেকে সততার সঙ্গে জীবন যাপন করেও শান্তি নেই – কেন এমন হবে?

 

এতক্ষণ পর হাসিমুখে বললেন,

– বেটা, যে সর্বদা ভগবানকে ডাকছে অথচ সততা নেই, তার ভগবানকে ডাকা প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যে তাই তার শান্তি নেই। ভগবানের দয়ায়, তাঁর নামের গুণে উদ্দেশ্য ও প্রবৃত্তি চরিতার্থ হবে, শান্তি হবে না। অন্তর যার অসততায় ভরা, তার অসততা থেকে অলক্ষ্যে উৎপন্ন হয় অহঙ্কার তাই তার শান্তি হয় না। সততার সঙ্গে ভজন থাকলে ভজনশক্তি তখন অহংকারে নয়, সততাবৃত্তি চরিতার্থ করে। ফলে শান্তি আসে মনে। সুতরাং ভজন করলে শান্তি অথবা শুধু সততার মাধ্যমেই শান্তি, তা বেটা আসবে না। একসঙ্গে দুটোকে আঁকড়ে ধরলে তার শান্তি অনিবার্য। ওই দুটো যার নেই, তার চোখে ঘুমও নেই। রুগী নাহলেও তাকে ট্যাবলেট খেয়েই ঘুমতে হবে।

জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, আপনার সাধুজীবনে এমন কোনও তিক্ত বা আনন্দদায়ক ঘটনার কথা কি মনে আছে যা কখনও ভুলবেন না। মনে দাগ কেটে রাখার মতো।

সাধুবাবা এতক্ষণ বসেছিলেন একভাবে। এখন একটু নড়ে বসলেন। এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে নিলেন একবার। বললেন,

– হাঁ বেটা, দুটো ঘটনার কথা আজও আমার মনে আছে যা কোনদিনও ভুলব না আমি।

Dwarkadhish Temple
দ্বারকাধীশ মন্দির

বলে বেশ বড় একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। পরে শুরু করলেন,

– বেটা, সারা ভারতবর্ষই ঘুরেছি আমি। বাংলা, ইউপি, দিল্লি, পাঞ্জাব, মাদ্রাজ, দেখেছি, এখানকার পুলিশ আর চেকাররা বেশ ভাল। সাধুদের এরা হয়রান করে না। কিন্তু বিহারে চেকার পুলিশরা মোটেই ভাল নয়। কিছু ভাল থাকলেও থাকতে পারে তবে আমার নজরে পড়েনি এখনও। এরা সাধুদের যে কি হয়রান করে তা তুই চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবি না।‌

 

কথাটা বলে সাধুবাবা একটু গুম হয়ে বসে রইলেন। কোনও কথা বলেছেন না দেখে জিজ্ঞাসা করলাম,

– কেন বাবা, ওরা কি অপরাধ করল?

মুখখানা একটু অন্ধকার করে বললেন,

– একবার শীতের সময় ফিরছি তোদের গঙ্গাসাগর মেলা থেকে। হাওড়া থেকে উঠেছি। বসে আছি ট্রেনে। আমার জন্যে যাত্রীদের কোনও অসুবিধে হবে ভেবে বসে আছি বাথরুমের কাছে। ট্রেন চলছে তখন বিহারের মধ্যে দিয়ে। পরে কোনও একটা স্টেশন থেকে উঠল একজন চেকার, সঙ্গে দুজন পুলিশ। ওরা সব সময় জানে টিকিট থাকে না সাধুদের। তবুও ট্রেনে উঠে টিকিট চাইল আমার কাছে। বললাম টিকিট নেই। টাকা চাইল। বললাম টাকাও নেই। এবার ওরা আমার গায়ে জড়ানো কম্বলের ভিতরে কাঁধ থেকে টেনে বেড় করে নিল ঝুলিটা। দুজনে হাতড়ে দেখল কিছু নেই। বেটা, দুঃখের কথা তোকে আর কি বলব? এবার পুলিশ দুটো আমার গা থেকে জোর করে কেড়ে নিল কম্বলটা। অনেক অনুরোধ করলাম। কোনও কথাই শুনল না। সোজা নিয়ে চলে গেল। নেমে গেল পরের একটা স্টেশনে। গরমের সময় হলে কষ্ট হত না। গায়ে ছিল পাতলা একটা জামা। শীতের রাত। ঠাণ্ডায় দেহটা আমার জমে এল। কাঁপতে লাগলাম ঠকঠক করে। এইভাবে দুটো রাত ট্রেনে কাটিয়ে এলাম দিল্লিতে। তুই তো জানিস, শীতকালে ওদিকটায় কেমন ঠাণ্ডা পড়ে। দিল্লিতে এক ভক্ত একটা কম্বল কিনে দিয়েছিল পরে।

একটু থেমে বললেন মলিন মুখে,

– ঝুলিতে দু-চার টাকা থাকলে তাও অনেক পুলিশ, ট্রেনের চেকার কেড়ে নেয়। কিছু বলতে পারি না। টিকিট থাকে না বলে এসব অত্যাচারী অর্থপিশাচদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে পারি না। দুঃখের কথা কি বলব বেটা, অনেক সময় বিহারে কিছু পুলিশ আর চেকার আছে, যারা ভাবে সাধুরা বোধ হয় নেংটির মধ্যে টাকা লুকিয়ে রাখে। তোর বিশ্বাস হবে না বেটা, ওই সব ‘ডাকু’রা ঝুলিতে টাকা না পেলে নেংটি পর্যন্ত খুলে দেখে। এ অভিজ্ঞতা আমার একবারের নয়, অনেকবারই হয়েছে। আমি বহু সাধুর মুখেও ওদের এই ব্যবহার ও অত্যাচারের কথা শুনেছি বহুবার বহু জায়গায়। দুদিনের সুখের জন্যে সাধুদের ভিক্ষে করা দু-চার টাকা কেড়ে নেয় এরা। বেটা, সাধুদের সাময়িক কিছু কষ্ট হয় ঠিকই তবে নিশ্চিত জানবি, এর ফল ওদের ভোগ করতেই হবে।

সাধুবাবা ফরসা। দেখলাম ক্রোধ ও উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে মুখখানা। উত্তেজিত কণ্ঠেই বললেন,

– কামার্ত নারী যেমন স্থান কাল পাত্র বিচার করে না কাম চরিতার্থ করার জন্যে তেমনি এইসব অর্থলোভীরাও সাধুসন্ন্যাসী পরান্নভোজীদের কথা ভাবে না একবারও। যেকোনও ভাবে অর্থলালসা চরিতার্থ করাই এদের উদ্দেশ্য, নইলে কেউ সাধুদের নেংটি খুলে দেখে, টাকা আছে কিনা?

এই পর্যন্ত বলে চুপ করে রইলেন। খানিকটা সময় কেটে গেল। কোনও কথা বলছেন না দেখে বললাম,

– আর একটা কি অভিজ্ঞতার কথা যেটা আপনার মনে আছে, সেটা বলবেন?

 

সাধুবাবা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। কেটে গেল আরও প্রায় মিনিট পাঁচেক। বললেন,

– বেটা, তখন আমার বয়েস বছর পঁয়তাল্লিশ হবে। বেরিয়েছি ভারতের সমস্ত তীর্থদর্শনে। কোথাও কোনও স্থায়ী ডেরাও নেই আমার। যখন যেখানে যেমন, তখন সেখানে থাকি সেরকমভাবে। কখনও গাছতলায়, কখনও পথের ধারে, কখনও ইস্টিশানে আবার কখনও পড়ে থাকি কোনও ধর্মশালা কিংবা মন্দিরচাতালে। এইভাবেই চলছে আমার তীর্থপরিক্রমা। সে বার গেছিলাম নেপালে পশুপতিনাথ দর্শনে। ফিরছিলাম বিহার হয়ে এলাহাবাদে। এই এলাহাবাদেই ঘটল একটা বড় বিপত্তি। ওদিকে যাওয়ার কোনও ইচ্ছা ছিল না। ইচ্ছা ছিল জ্বালামুখীতে যাব। তা ভাবলাম, তার আগে প্রয়াগে একটু স্নান করে যাই। ব্যস, ভাবামাত্র ট্রেন ধরে সোজা এলাম এলাহাবাদে। নামলাম ট্রেন থেকে। এবার স্টেশনের বাইরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েই পা টা গেল হড়কে। টাল সামলাতে পারলাম না। এমনভাবে পড়লাম, ডান পা-টাই আমার ভেঙ্গে গেল। দুর্ভোগ আর কাকে বলে!

এখন আর কোনও উত্তেজনা নেই সাধুবাবার চোখেমুখে। ভাবটা বেশ আগের ভাবেই এসেছে। বললেন,

– লোকজন সব ছুটে এল। বসাল ধরাধরি করে। আমার গেরুয়াবসন দেখে কেউ আর হাসপাতালে নিয়ে গেল না। স্থানীয় কয়েকজন রিকশায়ালা বলল, এখানে এক সাধুবাবার আশ্রম আছে, সেখানে নিয়ে যাই। যা ব্যবস্থা করার তারাই করবে। তখন বুদ্ধি আমার লোপ পেয়েছে। কি করব বুঝে উঠতে পারলাম না। কিছু বলার মতো মনের অবস্থাও ছিল না। কয়েকজন ধরে তুলে দিল একটা রিকশায়। গঙ্গার কাছাকাছি নিয়ে এল একটা আশ্রমে। স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা ভিতরে। রিকশায়ালা আমাকে সেই আশ্রমে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।

এবার একটা পা ভাঁজ করে আর একটা পা টানটান করে বসলেন। মুখের দিকে তাকালেন একবার। কথা বললাম না। তিনি বললেন,

– আশ্রমে যাওয়ামাত্রই সাধুরা লেগে গেলেন সেবায়। ডাক্তার আনলেন। পায়ের ফটো তোলা হল। প্লাস্টার হল। পড়ে রইলাম আশ্রমের একটা ঘরে। সম্পূর্ণ সুস্থ হলে ভালভাবে চলতে প্রায় মাস ছয়েক লেগেছিল। সাধুদের একান্ত সেবাযত্ন ও প্রচেষ্টায় সুস্থ হয়ে উঠলাম। ওই সময় দেখেছিলাম এক সাধুর পতন, যা সারাটা জীবন আমার মনে থাকবে।

বলে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। একটু কৌতূহলী হয়ে নড়ে বসলাম, তাকিয়ে রইলাম মুখের দিকে। শুরু করলেন,

– বেটা, তখন আমি প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছি। আশ্রমেই ছিলাম। একদিন দুপুর বেলা, তখন সাধুভোজনের সময়। হঠাৎ দেখলাম একদল গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে হইহই করে ঢুকল সোজা মহন্তের ঘরে। চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে এল আশ্রমের উঠোনে। শুরু হল বেদম মার। প্রথমে আশ্রমের সাধুরা কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। পরে যাইহোক করে মহন্তজিকে ঠেকালেন সকলের মারের হাত থেকে। দেখলাম অল্প বয়েসি একটা কুমারী মেয়ে কাঁদছে আশ্রমের এক পাশে বসে।

এই পর্যন্ত বলে আমার মুখের ভাব লক্ষ্য করতে লাগলেন সাধুবাবা। আমি একটু অধৈর্য হয়ে বললাম,

– তারপর কি হল বাবা?

গম্ভীর স্বরে বললেন,

– আশ্রমের মহন্তজির বয়েস হয়েছিল সত্তর। এমন সাধনসুলভ দেহ ছিল যে দেখলে মনে হত না পঁয়তাল্লিশের উপর বয়েস হবে। পাশের গ্রামের অনেকে আসত আশ্রমে, আর সব আশ্রমে যেমন সকলে যায়। মহন্ত মহারাজ সকলের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের সুখে আনন্দ পেতেন, দুঃখে সান্ত্বনা দিতেন। এটা আমি রোজই দেখতাম। আমার সঙ্গে তার ছিল আন্তরিকতা। কুমার ব্রহ্মচারী ছিলেন তিনি। মাঝেমধ্যে যেতেন গ্রামে কিছু কিছু ভক্তের বাড়িতে। অনেকে অনুরোধও করত যাওয়ার জন্যে। পরিচয় ঘনিষ্ঠ হলে যেটা হয় আর কি! যাওয়াটাই হয়েছিল মহন্তজির কাল। এই যাওয়া ও তাদের আসা, এতেই মহন্ত মহারাজের সংযমী রিপু ধীরে ধীরে হয়ে পড়ল অসংযমী। মনের গতি তখন বইতে লাগল অন্য খাতে। সকলের অলক্ষ্যে, কোনও এক দুর্বল মুহুর্তে কাম গ্রাস করে ফেলেছিল মহারাজকে। হয়তো একদিন বা একাধিক দিন মিলিত হয়েছিলেন মেয়েটির সঙ্গে, যে আশ্রমের উঠোনে বসে কাঁদছিল। তারপর আর কি! প্রকৃতির নিয়মকে কি কেউ লঙ্ঘন করতে পারে, না পৃথিবীর কেউ কোথাও পেরেছে কখনও? তার নিয়মেই পেটে বাচ্চা এসেছে মেয়েটির। ব্যাপারটা বাড়ি থেকে গ্রাম হল। ফল যা হবার তাই-ই হল। গ্রামবাসীরা মহন্ত মহারাজকে জোর করে ধরে নিয়ে গেল গ্রামে। আমি আর আশ্রমে রইলাম না। সম্পূর্ণ সুস্থ না হলেও তখন চলার মত ক্ষমতা ছিল। সেইদিনই বেরিয়ে পড়লাম আশ্রম থেকে। পরে ঘটনা কি ঘটেছিল তা আমার জানা নেই। তবে দেখেছিলাম মহন্তজি ছিলেন সত্যবাদী। ঘটনাটিকে তিনি অস্বীকার করেননি। সকলের সামনে তার নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেছিলেন। আজও আমি সেই ঘটনাকে ভুলতে পারিনি।

ঘটনাটি শুনে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, সারাজীবন সাধনভজন করা ব্রহ্মচারী বয়স্ক সাধুর জীবনে যদি এমন ধাক্কা আসে তাহলে গৃহীজীবনে আধ্যাত্মিকমার্গে উন্নত অবস্থার মানুষেরও তো এমন অবস্থা হতে পারে?

উত্তরে বললেন,

– হাঁ বেটা, হতে পারে। সাধুসন্ন্যাসী আর গৃহী বলে কোনও কথা নেই, কামরিপুর এই তীব্র প্রভাব সকলের জীবনে আসতে পারে। স্থান কাল পাত্র বিচার না করেই তা আসতে পারে। তবে গৃহীসাধকদের ক্ষেত্রে ভয়টা থাকে কম। কারণ নারীভোগের মধ্যে দিয়ে সে অগ্রসর হয় বলে কামরিপুর তাড়নাটা কম। ব্রহ্মচারী সংযমের মধ্যে থাকে বলে কামরিপুর বশীভূত হয়। তেমন প্রভাব থাকে না ভোগের দিকে। তবে অপ্রত্যাশিতভাবে কখনও ভোগের সুযোগ এসে গেলে তখন এর প্রভাব দমন করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষুধার্ত সিংহের কাছে হঠাৎ কোনও মৃগ এসে পড়লে যেমন অবস্থা হয়, তেমন।

Advertisements

Check Also

Kal Bhairav Temple

বাহন কুকুর, করেন মদ্যপান, কালভৈরবের মাহাত্ম্যকথা

কালভৈরবকে যে কোনও সুরাই পরিবেশন করা চলে। দিশি বা স্কচ, যে কোনও সুরা হলেই হল। কোনওটাতেই কালভৈরবের আপত্তি নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *