Monday , January 27 2020
Kal Bhairav Temple
উজ্জয়িনীর দ্বাররক্ষক মদ্যপানরত কালভৈরব

এটি কাছে থাকলে খাবার মিলবেই মিলবে, ভোলেবাবার কৃপার রহস্য জানালেন সাধুবাবা

এক তীর্থযাত্রীকে দেখলাম মদের বোতল হাতে চলেছেন কালভৈরব মন্দিরে। সাধুবাবার নজরে পড়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বোঝাতে চাইলেন ‘মস্তি হবে’। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, আপনার এই ৬৫ বছরের জীবনে সন্ন্যাসী হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এমন কোনও একটা দিন কি গেছে, যে দিনটার কথা কোনওদিন ভুলতে পারবেন না।

কথাটা শেষ হতে সাধুবাবা বলে উঠলেন,

– হাঁ হাঁ বেটা, আছে। সেদিনটার কথা আজও ভুলতে পারি না। শোন, একসময় আমার সাধনআসন বিছিয়ে ছিলাম চণ্ডীপাহাড়ের জঙ্গলে। একদিনের কথা। তখন আশপাশে একটা দোকানপাটও ছিল না। তাই পাহাড় থেকে নেমে এসেছি হরিদ্বারে। পথ অনেকটাই। এসেছি সবজিমণ্ডিতে বাজার করতে। আজ থেকে ধর ‘কমসে কম চালিস বরস’ আগের কথা। চাল ডাল সবজি কিনে টাকা দিয়ে বসে গল্প করছি দোকানদারের সঙ্গে। তারপর কথা শেষ হতে ওসব রেখে আপন খেয়ালেই ফিরে এলাম পাহাড়ি ডেরায়। এসে জঙ্গলে গেলাম ‘লকরি’ জোগাড় করতে। শুকনো ডালপালা নিয়ে ফিরে আসতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এল। ডেরায় ফিরে পুজোপাঠ জপতপ সেরে নিলাম। সারা দিনরাতের মধ্যে একবার মাত্র ভোজন করি। চুলাতে ‘আগ’ লাগিয়ে হাঁড়ি চড়িয়ে রসুই-এর আয়োজন করতেই দেখি চাল ডাল সবজি সব হরিদ্বারে ফেলে রেখে এসেছি। তখন জঙ্গল গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। যাওয়া সম্ভব না। আমি কোনও কিছু সঞ্চয় করি না। তাই কোনও আহার্য বস্তু আমার সঞ্চয়ে ছিল না। ফলে জীবনে একবারই একদিন অভুক্ত ছিলাম। পরের দিন অবশ্য হরিদ্বারে গিয়ে সব মিলেছে।

সারাজীবন মনে রাখার মতোই ঘটনা। বললাম,

– বাবা, এরকম ঘটনার ব্যাখ্যা কি দেবেন আপনি?

সাধুবাবা ঝোলানো পা দুটো বাবু করে নিয়ে বললেন,

– বেটা, জগতে সমস্ত ঘটনার পিছনে কারণ একটা থাকেই থাকে। তবে সব সময় কারণের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা মানুষের জানা থাকে না। এই ঘটনায় কখনও মনে হয়েছে একদিনের জন্যে কারও আহার বঞ্চিত করেছিলাম তাই আমিও বঞ্চিত হয়েছি। কখনও মনে হয়েছে, দেহের উপরে খুব বড় কোনও ধাক্কা একদিনের শারীরিক ক্লেশ দিয়ে তা থেকে আমার দয়াময় গুরুজি রক্ষা করলেন। এরকম পরিস্থিতি তোর হলে তুইও এমনটা ভাবতিস।

একদল দেশোয়ালি মহিলার মুখ পর্যন্ত ঘোমটা টানা। একনজরে কম করেও জনা পনেরো। তারা সকলে উচ্চস্বরে গান গাইতে গাইতে চলেছেন কালভৈরব মন্দিরে। কথা থামল। দুজনের চোখ গিয়ে পড়ল ওই দলের উপরে। ওরা মন্দিরে যেতেই প্রসঙ্গের মোড় ঘুরিয়ে বললাম,

– বাবা, ভারতের অসংখ্য তীর্থপর্যটন তো করেছেন। তার মধ্যে কোন তীর্থ আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, বলবেন দয়া করে?

সাধুবাবা উল্লসিত হয়ে বললেন,

– ‘হরদুয়ার বেটা হরদুয়ার’। বেটা, হরিদ্বার এমনই এক তীর্থ, এখানে কেউ নিতে আসে না, প্রাণমন ভরে দিতে আসে। এসে দেয় বলেই তো কি গৃহী কি সাধুসন্ন্যাসী, সকলে ফিরে যাওয়ার সময় অন্তরভরে নিয়ে যায় অনাবিল আনন্দ। বেটা, এখানে যা চাওয়া যায়, সাধুসন্ন্যাসীরা তাই-ই পেয়ে থাকেন। না চাইলেও পাওয়া যায়। গঙ্গামাঈয়াই দু হাত ভরে দেন। তা যদি না হত তাহলে হরিদ্বারে দশনামী সম্প্রদায়ের আটটা আখড়া চলছে কেমন করে? আখড়ায় প্রতিদিন সাধুভোজন, দরিদ্রনারায়ণ সেবা ও আনুষঙ্গিক খরচ প্রচুর। কোনও আখড়ার মহন্ত মহারাজ কারও কাছে ‘কভি ভিখ মাঙে’ না। বছরের পর বছর ধরে তীর্থদেবতাই জুটিয়ে দেয়, বুঝেছিস বেটা!

কথা শেষ হতে জানতে চাইলাম,

– আখড়ার মহন্ত মহারাজের পদ বিশাল। সম্মানের খাতিরে তিনি না হয় কারও কাছে ভিখ মাঙলেন না কিন্তু কি হরিদ্বার, কি কালভৈরব, আপনাকে কারও না কারও কাছে হাত তো পাততেই হয়।

কথাটা শেষ হতেই সজোরে মাথাটা ঝাঁকিয়ে বললেন,

– না না বেটা, ও অভ্যেসটা আমার নেই। চাইতে হয় না। আপনিই জুটে যায়। সারা দিনরাতের মধ্যে খাই তো মাত্র একবার, একাহারে থাকি। কতটুকুই বা খাই! খিদেটাই তো নেই, মরে গেছে। বেটা, দীক্ষার পর একটানা ৪০ দিন অন্ন গ্রহণ না করা আমাদের একটা নিয়ম বা ব্রত। দিনান্তে একবার ফলমূল খেতে হয়। ওতে কি মন ভরে না পেট? রসনা, আহার ও খাদ্যবস্তুর উপর লোভ সম্বরণ ও সংযমতার জন্য দীক্ষার পরে ৪০ দিনের এই ব্রত। এতে ধীরে ধীরে খাওয়ার উপরে ইচ্ছাটা একেবারে নষ্ট হয়ে যায়।

দীক্ষার পর পরই যে এমন একটা ব্রত পালন করতে হয়, এর আগে কোনও সাধুসন্ন্যাসীর মুখ থেকে শোনা ছিল না। আজ নতুন একটা বিষয় জানতে পেরে মনটা আনন্দে ভরে উঠল। সাধুবাবা বললেন,

– বেটা, আদর ও ভালোবাসায় যেমন নারী বা স্ত্রী বশীভূত এবং সংসার সুখের হয়, তেমনই ক্ষুধা বশীভূত হয় রসনা ও আহার সংযমে, অন্তরের সুখ হয়। আবার বলছি বেটা, কারও কাছে চাইতে হয় না। গুরু মহারাজের কৃপায় আপনিই জুটে যায়।

জানতে চাইলাম,

– এখানে একটা কথা আছে বাবা। ঘুমন্ত সিংহের মুখে হরিণ কখনও প্রবেশ করে না। তাকে ধরে খেতে হয়। এটাই যদি সত্য হয় তাহলে খাবার বা তারজন্য অর্থ না চাইলেও এসে যায় কেমন করে, গেরুয়াবসনের জন্য?

বাবু হয়ে বসা পা দুটো আবার ঝুলিয়ে বসলেন। মনে হয় যেন বেশ আরাম হল। আমি যেমন ছিলাম তেমনই রইলাম। সাধুবাবা বললেন,

– গেরুয়াবসন পরা থাকলেই কি টাকা আসে? কটা লোক ডেকে ডেকে টাকা দিচ্ছে সাধুদের! এই তো তোর সঙ্গে কতক্ষণ ধরে কথা বলছি। কত লোকই তো দেখতে দেখতে চলে গেল পাশ দিয়ে। একটা তীর্থযাত্রীও কি এসে একটা টাকা দিয়ে বলেছে, এই নাও সাধুবাবা, কিছু খাবারটাবার কিনে খেও।

এ কথার কোনও উত্তর দিতে পারলাম না। আমি নিজেও এসে একটা পয়সা প্রণামি দিইনি। চুপ করে আছি। এবার সাধুবাবা কারও কাছে না চেয়ে পাওয়ার আসল রহস্যটা তুলে ধরলেন,

– বেটা, যেদিন দীক্ষা হয় সেদিনই দীক্ষার পর গুরুজি একটা খর্পর তুলে দেন হাতে। এটা সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের নিয়ম। খর্পর থাকলে সন্ন্যাসীদের কখনও শুধু খাওয়া নয়, আমৃত্যু প্রয়োজনীয় কোনও কিছুর অভাব হয় না।

কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম খর্পর বস্তুটা কি? সাধুবাবা মুখে কিছু বললেন না। ছোট্ট ঝোলা থেকে বের করলেন একজনের রান্নার উপযোগী ছোট্ট একটা হাতলছাড়া লোহার কড়াই। ঠিক যেন পিঠে তৈরির সরা, তবে অত বড় নয়। সেটা দেখিয়ে বললেন,

– বেটা, আমি ভিক্ষে করি না, তবে এতে ভিক্ষে করা যাবে। রুটি করা যাবে। চাউল অউর সবজি ভি। এটা একজনের রান্নার উপযোগী হলেও ‘বেটা ইয়ে ভোলেনাথ কা খর্পর। ভোলেবাবা কা ভাণ্ডার’। কাছে থাকলে খাবার মিলবেই মিলবে। এমনই মহিমা ‘ভোলেবাবা কি কৃপা সে’।

বিষয়টা আমার একেবারেই জানা ছিল না। আজ জানতে পেরে মনটা আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠল। আর খোঁচালাম না। সাধুবাবা বললেন,

– বেটা, সবচেয়ে আনন্দ বেশি পাহাড়জঙ্গলে সাধনা করে। গাছগাছালির কুটিয়াতে বন্যজন্তুরা দেখেও দেখে না। চলে যায় আপন মনে। এতটুকুও হিংসার ভাব নেই তাদের অন্তরে।

থামলেন। ইশারায় বিড়ির কথা বললাম। ঘাড় নাড়লেন। দুটো ধরিয়ে একটা দিলাম সাধুবাবার হাতে। একটা নিলাম নিজে। এই সময় বললাম, যদি কালভৈরবের প্রসাদ পেতে ইচ্ছা করেন তাহলে মদ ভোগ দিয়ে দুজনে প্রসাদ পাব। এ কথা শুনে বেশ আনন্দের সঙ্গেই ঘাড় নাড়লেন। আমি মন্দিরপ্রাঙ্গণ ছেড়ে বেড়িয়ে এলাম। এখানে ফটো ও পুজোসামগ্রীর দোকানগুলো লুকিয়ে বিলিতি মদ বিক্রি করে এটা আমার জানা। আগেও তো বেশ কয়েকবার এসেছি তাই। একটা ‘পাইট’ কিনে সোজা ভৈরবমন্দিরে পূজারিকে দিয়ে বললাম, নিবেদন করে রাখতে। একটু পরে নিয়ে যাব। এসে বসলাম সাধুবাবার কাছে। পূর্বকথার খেই ধরে প্রশ্ন এল মাথায়। বললাম,

– বাবা একটু আগে বললেন, কারও কাছে ভিখ মাঙেন না। খর্পর খাবার ব্যবস্থা করে দেয়। জঙ্গলে সাধনা করার আনন্দ বেশি। সবই তো বুঝলাম। তা জঙ্গলে তো আর লোকবসতি নেই যে কোনও না কোনও ভাবে খাবার কিছু জুটে যাবে। জঙ্গলে যে সুস্বাদু ফলের গাছ হয় এমনও নয়। বাঁদরের ফল খেয়ে খেয়ে অরুচি ধরে গেছে আর আমরা তো মানুষ! আমার জিজ্ঞাসা, বনে যখন সাধনভজন তপস্যা করতেন, সেখানে তো কোনও লোকজন থাকত না, তখন দিনের পর দিন আহার জোগাড় হত কিভাবে, দিতই বা কারা?

এবার হাসিতে ভরে উঠল সাধুবাবার মুখখানা। হাসতে হাসতে বললেন,

– কিরে বেটা, সাধুসন্ন্যাসীদের হাঁড়ির সমস্ত খবরই তো দেখছি টুকটুক করে নিয়ে ফেললি। ব্যাপারটা কি বলত?

এ কথায় জোরের সঙ্গে বললাম,

– বাবা, আমার মদের নেশা নেই। এখনও আমি বিয়ে করিনি। অভাবেই আছি, কিন্তু কোনও মেয়েমানুষে আসক্তি নেই। আর এই চেহারা কোনও মেয়েই পছন্দ করে না। দেখতে সুন্দর নই। গায়ের রং কালো। মাকালীর থেকে হয়ত এক পোচ কম। রোগা ঢ্যাঙা চেহারা। যে কাজ করি তাতে নিজেরই চলে না। মেয়েদের আকর্ষণ করার মতো টাকাও নেই, কোনও গুণও আমার নেই। গালভর্তি দাড়ি। আমি দেখেছি, মেয়েরা মরতে রাজি কিন্তু সতীন নিয়ে ঘর করতে রাজি না। ঠিক সতীনের মতোই অপছন্দ দাড়ি আর ভুড়িয়ালা ছেলে। তাই বাবা, আমার কোনও ধান্দাটান্দা কিছু নেই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কেন জানি না, একটাই নেশা, সেটা সাধুদের জীবনকথা জানার।

এবারও হাসিমুখে বললেন,

– হাঁ বেটা, সে আমি তোর মুখ দেখে প্রথমেই বুঝেছি। সেইজন্য তো তোর সঙ্গে বসে কথা বলছি। তোকে ও কথা বললাম ‘মজাক’ করতে। এবার শোন, আসল কথাটা বলি। জঙ্গলে খাবার পাওয়াটা কোনও ব্যাপার না। আগেই বলেছি আমার সাধনআসন ছিল চণ্ডীপাহাড়ে। সেই সময় গাছের বেশ লম্বা ডাল ভেঙে তাতে একটা লাল পতাকা লাগাই। পরে ডালটা গাছে উঁচুতে বেঁধে দিই। এতে বহুদূর থেকে ভক্তদের কারও না কারও চোখে পড়ে। কেউ না কেউ বুঝে যায় ওখানে সাধু আছে। গুরুকৃপায় তাদেরই কেউ এসে খাবার কিংবা অর্থ দিয়ে যায়। ব্যস বেটা, আর কি? তুমুল বর্ষা ও হাড়কাঁপানো শীতেও দেখেছি খাবার আমার জুটে গেছে।

কথা কটা বলে গুরুজির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন। জঙ্গলে বসে সাধনকালে আহার সংগ্রহের এমন সৎ সরল ও সহজ কৌশলটা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। সাধুবাবা না বলে দিলে এমন সুন্দর বিষয়টা কিছুতেই জানতে পারতাম না। হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণকালীন বহুদূরে এমন পতাকা নজরে পড়েছে বহুবার। তবে এর অন্তর্নিহিত রহস্যটা প্রথম জানলাম। আনন্দে মনটা মাতোয়ারা হয়ে উঠল। বার বার প্রণাম করতে লাগলাম। সাধুবাবাও মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। আমার এই আনন্দের কথা কাকে কি করে যে বোঝাই!

এবার ইশারায় জানালাম কালভৈরবের প্রসাদটা আনতে যাচ্ছি। একছুটে নিয়ে এলাম। জলের বোতল ছিল সঙ্গে। অর্ধেকটা রেখে বাকিটা দিলাম। সাধুবাবা একনিঃশ্বাসেই মেরে দিলেন ভৈরবের প্রসাদ। আমি পারলাম না। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। বললাম,

– বাবা, সন্ন্যাসজীবনে আসার পর এমন কোনও ঘটনা কি ঘটেছে যাতে আপনার অন্তরে কোনও একটা ক্ষোভ বা দুঃখ রয়ে গেছে?

কথাটা শোনামাত্র মুখখানা মলিন হয়ে গেল। মুহুর্তে সামলে নিয়ে বললেন,

– ক্ষোভ দুঃখ মায়া সবই তো বেটা পিছনে ফেলে এসেছি, আর দুঃখ কি, মায়াই বা কি সে?

আমি কিন্তু ধরে ফেলেছি মুহুর্তে মুখের পরিবর্তন দেখে। একটা কিছু গোপন করছেন এ ব্যাপারে নিশ্চিত। একান্ত অনুরোধের সুরে জানতে চাইলাম,

– দীর্ঘকাল ধরে অনেকটা পথই তো চললেন। মানুষ দেখলেন, নিজেকেও তো দেখেছেন। ক্ষোভ দুঃখ না থাকলে এমন অন্য কোনও কিছু কি ঘটেছে যেটা আপনার অন্তরকে আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছে?

একটা বিষয় আমার জানা ও পড়া আছে। দান, সেবা, সম্মান, সরলতা, শাস্ত্র দিয়ে রমণীদের বশীভূত করা যায় না। এরা বশীভূত হয় আদরে। লোভী বশীভূত হয় টাকায়। ক্রুদ্ধকে বশ করতে হয় হাতজোড় করে। মন জুগিয়ে চললে মূর্খ বশে আসে। যথার্থ কথা বললে বশীভূত হয় পণ্ডিত। আর সাধুদের বশীকরণের কৌশলটা আমার নিজের আবিষ্কার। সাধু বশীভূত হয় পায়ে ধরলে। ঝপ করে পা দুটো ধরে ওই একই অনুরোধ করলাম। এবার সাধুবাবা আর চেপে রাখতে পারলেন না অন্তরের কথা। মলিন মুখেই বললেন,

– হাঁ বেটা, ক্ষোভ দুঃখ তো একটা আছেই। আমাদের একটা আশ্রম আছে। গুরুজির গদি আছে সেখানে। গুরুজির বয়েস এখন একশোর উপরে। বয়েসের ভারে তিনি এখন কিছু করতে পারেন না। নিয়মানুসারে গুরুভাইদের মধ্যে আমারই গদি পাওয়ার কথা। কিন্তু গুরুজি ওই গদি আমাকে না দিয়ে অন্য এক গুরুভাইকে দিলেন, যেটা হওয়া উচিত ছিল না। সেই থেকে তাঁর উপর ক্ষোভ অভিমান হল আমার। একটা মানসিক যন্ত্রণা সব সময়েই কুরে কুরে খায়। বহু বছর হয়ে গেল গুরুজির আশ্রমে যাই না, আর কখনও যাবও না।

এই পর্যন্ত বলে থামলেন। কেমন যেন একটা অন্তরের জ্বালার ভাব ফুটে উঠল চোখেমুখে। ভাবলাম, মাত্র আঠারোতে যে মানুষটা নির্বিকারচিত্তে যথার্থ প্রাপ্য পৈত্রিক সম্পত্তি হেলায় পরিত্যাগ করে এলেন খর্পর কৌপীনে, সেই মানুষটাই গুরুর গদি বঞ্চিত হয়ে পঁয়ষট্টিতে অহরহ ভোগ করে চলেছেন অব্যক্ত এক নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা। পরিত্যাগ করেছেন গুরুসঙ্গ, নষ্ট হয়েছে গুরুর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ভালোবাসা। অথচ গেরুয়া দেখে তা কিছুতেই বোঝার উপায় নেই। দেখেছি অনেক সাধু, অসংখ্য গৃহী অবোধ সংসারে একেবারে তলিয়ে গেছে আত্মাভিমানের ফাঁকে পড়ে। এই সাধুবাবার তেমনটা হবে না তো! মনটা আমার খারাপ হয়ে গেল। এর পর আর একটা কথাও বললাম না। জানতে চাইলাম না আর অতীত জীবনপ্রসঙ্গ। প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালাম। সাধুবাবা হাতটা মাথায় দিলেন। উজ্জয়িনীর ভৈরবগড়ে কালভৈরব মন্দিরঅঙ্গন ছাড়ার সময় অন্য এক সাধুবাবার সুন্দর একটা কথা মনে পড়ে গেল,

– বেটা, একটা সুন্দর মানুষ হল একটি সুন্দর বৃক্ষস্বরূপ। তাতে ফুটে ওঠা সুগন্ধি ফুল হল ভক্তি। সুমিষ্ট পাকা ফল হল প্রেম। এসবই হয় গুরুর অপার অনন্ত করুণায়। তাঁর করুণা লাভ না হলে তাঁকে লাভ করা যায় না।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *