Friday , December 13 2019
Devprayag
দেবপ্রয়াগে ভাগীরথী ও অলকানন্দার সঙ্গমস্থল, ছবি - সৌজন্যে - উইকিপিডিয়া

দেশলাই ছাড়াই ফুঁ দিয়ে লম্ফ ধরালেন সাধুবাবা, অলৌকিক ঘটনায় ঘটল দুঃখের অবসান

১৯৭৯ সালের মে মাসের কথা। একাই এসেছি হরিদ্বারে। কয়েকদিন কাটানোর পর মনটা আমার অস্থির হয়ে উঠল মানুষের কোলাহলে। এখন কেদার বদরীনারায়ণের মরশুম তাই ভিড়ের যেন আর সীমা পরিসীমা নেই। ভাবলাম, দেবপ্রয়াগে দুদিন কাটিয়ে আসি। হরিদ্বারের তুলনায় অনেক বেশি নির্জন। তীর্থযাত্রী ও ভ্রমণপিয়াসীদের আসা যাওয়াটা এখানে প্রায় নেই বললেই চলে। তাদের লক্ষ্য মূলত কেদারনাথ ও বদরীনারায়ণ। ভাবলাম মানে লোটা কম্বল নিয়ে চলা।

এ যাত্রায় লোটা কম্বলের মধ্যে যে ফুলপ্যান্ট জামা পরে আছি সেটা, আর গায়ে দেয়ার একটা চাদর। সোয়েটার কেনার টাকা কোথায়? ওরকম নানা জিনিস না কেনার সঞ্চয়ই তো আমার ভ্রমণ পথের পাথেয়। মোটের উপর এখন সঙ্গী আমার একখানা গামছা।

বদরীনারায়ণের পথ ধরেই চলা। ছোটখাটো চটি, চড়াই উৎরাই করে বাস এসে হাঁফ ছাড়ে দেবপ্রয়াগে। বদরীনারায়ণের পথে প্রথম আসে দেবপ্রয়াগ। সময় লাগে ঘণ্টা তিনেক। উচ্চতায় ১,৫৫০ ফুট। হৃষীকেশ থেকে ৭০ কিমি। থাকার জায়গা অঢেল। ধর্মশালা, পাণ্ডাদের বাড়ি, যাত্রীনিবাসের ছড়াছড়ি। যাত্রীদের সাধ্যের বাইরে যায় না ভাড়া।

অনাবিল আনন্দ আর অপরূপ সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে বসে আছে দেবপ্রয়াগ। এর পরতে পরতে জমে রয়েছে এক অনাস্বাদিত আনন্দরস, যাতে পাওয়া যায় নৈসর্গিক ভ্রমণের মাধুর্য, আধ্যাত্মিকতার সুমধুর গন্ধ। গোমুখের বিগলিত উদ্দাম জাহ্নবীর করুণাধারায় একাত্ম হয়ে গিয়েছে বদরীনারায়ণের বুক বেয়ে আসা অলকানন্দার সুনীল জলধারা। ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ। হাজার নানান গাছ আর ঘন পাইন বনের সমাহার। এর জেল্লা আর জৌলুসই আলাদা। বনেদি বাড়ির বধূর মতো। ভাগীরথী আর অলকানন্দার অবিরাম কলতানে পাহাড়ি জঙ্গল সর্বদাই মাতোয়ারা। এমনটা মাতিয়ে তোলে ভ্রমণপিয়াসীদের, পাহাড়ি তীর্থের আকর্ষণে দেবপ্রয়াগে আসা তীর্থকামীদের হৃদয়, মন।

শ্রীরামচন্দ্রের পদধূলিতে ত্রেতায় পূত হয়েছিল দেবপ্রয়াগ। ব্রহ্মার তপোভূমিও বটে। এখানে বৌদ্ধ ও দক্ষিণ ভারতীয় ভাস্কর্যের আদলে নির্মিত রঘুনাথজির মন্দির, ক্ষেত্রপাল মন্দির, কালী মন্দির, শ্রীরামচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত শিব মন্দির, বশিষ্ঠকুণ্ড, ইন্দ্রদ্যুম্ন বিশ্বতীর্থ, আদি বিশ্বেশ্বর, তুণ্ডেশ্বর, গঙ্গাযমুনা ও ভরত মন্দির, মহাবীর মন্দির, প্রাচীন চন্দ্রেশ্বর মহাদেব মন্দির, শঙ্করাচার্য মন্দির, এমন অসংখ্য ছোট বড় মন্দির ছড়িয়ে রয়েছে দেবপ্রয়াগের পাহাড়িঢালে।

আজ থেকে আনুমানিক ১২৮৬ বছর আগের কথা। দুর্গম হিমালয়ের প্রসিদ্ধ পাঁচটি তীর্থের সংস্কার করেছিলেন আচার্য শঙ্কর। মাত্র বারোবছর বয়েসে দুর্গম তীর্থ বদরিকাশ্রমের উদ্দেশে যাত্রা করে প্রয়াগ হরিদ্বার হয়ে একসময় আচার্য আসেন পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা শান্ত স্নিগ্ধ চোখজুড়নো আরণ্যক পরিবেশ দেবপ্রয়াগে। এখানকার মন্দির দর্শন এবং তীর্থকৃত্যাদি শেষ করে পরম তৃপ্তিলাভ করেন তিনি।

দেবপ্রয়াগে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াই যাদের চাই তাদের খোঁজে। কিন্তু দেখা মেলে না। মনে মনে ভাবি, সাধুদের আকাল লাগল নাকি? দেখতে দেখতে দুটো দিন কেটে গেল এইভাবে। ভাবলাম আজ উত্তরকাশী চলে যাব। ওখানে দিন দুয়েক কাটিয়ে হরিদ্বারে ফিরব। সকালে ঘুম থেকে উঠে মনপ্রাণ ভরে স্নান করলাম ভাগীরথী-অলকানন্দা সঙ্গমে। তারপর রামমন্দির দর্শন করে যখন বাস রাস্তায় আসার জন্য পাহাড় ঠেলে বেশ খানিকটা উঠেছি, তখন হঠাৎ ‘যে খায় চিনি’ হয়ে গেল। নজরে এল একটা গাছের ডালে ঝোলানো গেরুয়া বসন। আমার অবস্থান থেকে খানিকটা দূরে সঙ্গমের কাছে। দেবপ্রয়াগের মন্দির আশ্রম এলাকার বিপরীতে। এখানে লোকালয় নেই। এরপর পাহাড়িঢালে মানুষের আঁচড়হীন গাঢ়সবুজের ঘন জঙ্গল।

দূর থেকে গেরুয়া দেখে সম্মোহিতের মতো পা জোড়া যে কখন এসে দাঁড়িয়ে গেছে গাছের গোড়ায় তা ভাবতেই পারিনি। সম্বিৎ ফিরতে দেখি এক বৃদ্ধ উলঙ্গ সাধুবাবা উঠে আসছেন ভাগীরথী-অলকানন্দা সঙ্গমে স্নান সেরে। কেমন দেখছি দিগম্বরকে! দীর্ঘকাল রোদ জলে স্নান করা দেহের রং যেমন হয় তেমন, তামাটে। বিশাল জটাভার নেই। সারা মাথাভর্তি খয়েরি জটা কাঁধ ছাড়িয়ে খানিকটা। এঁর চোখদুটো আমার দু-গালে দুটো চুমু খেয়ে যেন বলে ছিল, ‘এই ব্যাটা, ভাবিস না, এ চোখ নির্বিকার নির্লিপ্তের হয়, বুঝেছিস।’ ভ্রুর কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান টিকালো নাক। পাতলা চেহারা। মালাই চাকিতে মাংস নেই। চোখদুটো সামান্য বসে যাওয়ায় মুখের হনুদুটো একটু বেরিয়ে এসেছে। পুরুষাঙ্গটা সদ্যজাত শিশুর মতো। বয়েস আন্দাজ পঁচাত্তরের কাছাকাছি। গালভর্তি পাকা দাড়ি।

আমার চোখে সাধুবাবা এই রকম। কোনও কিছুতেই আমার যেন তর সয় না। বরাবর ধৈর্যটা কম। সব ব্যাপারে এখনই চাই, এই মুহুর্তে হলে ভালো। দেরির মধ্যে নেই। একটুও তর সইল না। গেরুয়া পরার সময় দিলাম না। প্রণাম করলাম ছোঁ মেরে। শান্ত সাধুবাবা হাতদুটো মাথায় দিলেন। সর্বাঙ্গে একটা শিহরণ খেলে গেল। বুঝে গেলাম ভুল জায়গায় পা পড়েনি।

গেরুয়াটা পরার আগে পরে নিলেন কৌপীনটা। পরে কোমরে জড়িয়ে নিলেন গেরুয়াটা। এতক্ষণ খেয়াল করিনি ঝোলাটা ছিল গাছের গোড়ায়। তুলে নিলেন কাঁধে। এই পর্যন্ত কোনও কথা হয়নি। এবার সাধুবাবাই বললেন,

– কিছু বলবি বেটা?

সাধুবাবা হিন্দিভাষী, শান্ত পদক্ষেপ করলেন। আমি পাহাড়ের ঢালে একটু জঙ্গল ভরা জায়গায় বিশাল একটা সম্ভবত সেগুন গাছ দেখিয়ে বললাম,

– বাবা, ওখানে যদি একটু বসেন তাহলে আমার কিছু কথা আছে, বলতে পারি। আমার দেখানো জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতেই আমি বসতে বললাম। সাধুবাবা বসলেন। আমি বসলাম তাঁর বাঁ পাশে। সাধুবাবা বললেন,

– বেটা, কোথায় থাকিস, কি করিস, এখানে কি জন্যে এসেছিস?

সাধুবাবার সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর সংক্ষেপে দিয়ে বললাম,

– বাবা আমার বড় কৌতূহল মানুষ সাধু কেন হয়, কি পায়, কিসের টানে সংসার ছেড়ে এক অনিশ্চিত জীবনপথে ছুটে চলে, এসবই আমার জিজ্ঞাসা। আপনি যদি এসব কথার উত্তর দেন তাহলে আমার মনের আশাটা মেটে।

এ কথা শুনে সাধুবাবার মুখখানায় প্রসন্নতার মধ্যেও কেমন যেন একটা ভাবনার ভাব ফুটে উঠল মুহুর্তমাত্র। পরে বললেন,

– বল বেটা, তুই কি জানতে চাস?

এক কথায় রাজি হয়ে যাবেন, এমন কল্পনাতেও ছিল না আমার। আনন্দে মনটা মাতোয়ারা হয়ে উঠল। যত সাধুসঙ্গ করেছি, খুব কম সংখ্যক সাধুছাড়া কেউই ফেলে আসা জীবনকথা প্রথমে বলতে চাননি। পরে অকপটে প্রাণের দুয়ার খুলে জানিয়েছেন তাঁদের কথা, আলাদা জীবনদর্শনের কথা। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, আপনি কোন সম্প্রদায়ের সাধু?

সাধুবাবা বললেন,

– বেটা, আমি আচার্য শঙ্করের দশনামী সম্প্রদায়ের ‘পুরী’ উপাধিধারী সন্ন্যাসী।

জানতে চাইলাম,

– এখন বয়েস কত চলছে, কত বছর বয়েসে গৃহত্যাগ করেছেন, ঘর ছেড়ে কেন এলেন এপথে, বাড়ি কোথায় ছিল আপনার?

এক সঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন শুনে একবার তাকালেন মুখের দিকে। চোখের ভাষায় বুঝলাম, সাধুবাবা ভাবলেন, এসব কথার উত্তর আমাকে দেয়া উচিত কি না? একটু ভেবে বললেন, যেমন সব সাধুরাই বলেছেন,

– বেটা, সাধুদের গৃহত্যাগের পর সন্ন্যাসজীবনে ফেলে আসা জীবনের কথা বলতে নেই। এসব কথা শুনে তোর কোনও লাভও হবে না। তবুও তোর কৌতূহলের জন্য বলছি। এখন আমার বয়েস আন্দাজ নব্বই। গৃহত্যাগ হয়েছিল ১১/১২ বছর বয়েসে। বাড়ি ছিল মধ্যপ্রদেশের অত্যন্ত দুঃখী জেলা বস্তারের জগদলপুরে।

সাধুবাবা থামলেন। চেহারা দেখে ধারণা হয়েছিল বয়েস আন্দাজ পঁচাত্তর। এখন কথা শুনে সে ভুলটা ভাঙল। ছিপছিপে পাতলা চেহারা বলে বয়েসের ধারণাটা করতে পারিনি। এখন মনে হল সাধুবাবার যোগীদেহ। গৃহত্যাগের প্রশ্নে জানালেন,

– বেটা, আমাদের পরিবারে ছেলে বলতে একমাত্র আমি। আমার নিচে পর পর চারটে বোন। আমার যখন বয়েস ১১/১২, তখন মা আবার সন্তান প্রসব করলেন। অভাবের সংসার। সামান্য চাষবাসের পয়সায় সংসার প্রায় না চলারই মতো। অধিকাংশ রাতই কাটতো আমাদের না খেয়ে। ঠিক এরকম অবস্থার মধ্যে মা একটি কন্যা প্রসব করলেন। একসময় অভাবে সংসার অচল হয়ে পড়ল। বাবা বিষ এনে খাবারে মিশিয়ে মা সমেত পাঁচ বোনকে মারলেন, নিজেও খেলেন। একা পড়ে রইলাম অসহায় অবস্থায়। গাঁয়ের কারও আর্থিক অবস্থা এমন ছিল না যে আমাকে দুমুঠো অন্ন দেবে। মাঝে মাঝেই দিন কাটতো অনাহারে। একদিন কিছু ভাবলাম না। বেরিয়ে পড়লাম নিরুদ্দেশের পথে।

একটু থামলেন। বললাম,

– বাবা, গৃহত্যাগের পর মায়ের কথা কি কখনও মনে পড়েছে?

কথাটুকু শেষ হতেই দেখলাম, দুচোখ থেকে টপটপ করে নেমে এল অশ্রুধারা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন নব্বইয়ের নির্বিকার নির্লিপ্ত বৃদ্ধ। অস্ফুট কান্নার সুরে আমার মনে হল দেবপ্রয়াগের প্রতিটা গাছের পাতার স্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। কলকাকলি যেন রোধ হয়ে গেল পাখিদের। মনে হল কলনাদিনী অলকানন্দা ও ভাগীরথী গঙ্গার জলধারা হারিয়ে ফেলল অনন্তকালের কলনাদ। সাধুবাবা বললেন,

– মাকে কি কখনও ভোলা যায়! মায়ের একটা কথা আজও আমি ভুলতে পারি না বেটা, আমার শেষ বোনটা হওয়ার পর একদিন কাছে ডেকে চুপিচুপি বলেছিলেন, খোকা, বড় অভাবের সংসার। তুই তাড়াতাড়ি বড় হয়ে তোর বোন আর আমাকে একটু দেখিস।
এই পর্যন্ত বলে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন বৃদ্ধ। সান্ত্বনা দেয়ার কোনও ভাষা আমার জানা নেই। হিমালয় গহনে নির্বিকার নির্লিপ্ত এই সন্ন্যাসীকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো কোনও শব্দ অভিধানে আছে বলে মনে হয় না। শুধু এসময়ে এটুকুই ভাবলাম, মানুষ সাধনবলে যত উচ্চমার্গের যোগী মহাপুরুষই হোক না কেন, মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ির বন্ধন কখনও ছিন্ন হয় না। মায়ার বাইরে যাওয়ার কারও সাধ্য নেই। একটু সামলে নিয়ে সাধুবাবা বললেন,

– দীর্ঘক্ষণ হেঁটে একসময় পৌঁছলাম স্টেশনে। ট্রেন ধরে কোথা থেকে কোথায় গেছিলাম, আজ তা আর মনে পড়ে না। পেট চালাতাম ভিক্ষা করে। আজ এখানে, কাল সেখানে, এইভাবে ধাক্কা খেতে খেতে উপস্থিত হলাম নর্মদার উৎস অমরকণ্টকে। এরই মধ্যে তিন তিনটে বছর কেটে গেছে পলকে। পোশাকের পরিবর্তন হয়নি। জামাটা ছিঁড়ে ফাতা ফাতা হয়ে গেছে। প্রতিদিন নর্মদাকুণ্ডে স্নান করে ভিক্ষায় বসি। জুটে যায় কিছু। বিকেলে যাই জ্বালেশ্বর মহাদেব মন্দিরে। নর্মদা মন্দির থেকে বহু দূরে, আরও গভীর ঘন জঙ্গলের কাছে। সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসি। রাতে ওখানে থাকার ব্যবস্থা নেই। হিংস্র জন্তুরও ভয়ঙ্কর উৎপাত।

একটু থামলেন। ডাইনে বাঁয়ে তাকালেন একবার শূন্যদৃষ্টিতে। এরপর আমার মুখের দিকে। পরে বললেন,

– বেটা, নিত্য নর্মদাকুণ্ডে স্নান, নর্মদা মাঈর দর্শন আর ভিক্ষাতেই কেটে গেল প্রায় একটা বছর। এতদিনে ভাগ্য প্রসন্ন হল। একদিন জ্বালেশ্বর মহাদেব মন্দিরের উঠোনে বসে আছি। হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলেন এক জটাজুট সন্ন্যাসী। কোনও কথা না বলে ইশারায় সঙ্গে যেতে বললেন আমাকে। আমি বিবশভাবে অনুসরণ করলাম সাধুবাবাকে। অনেকটা পথ হেঁটে আমরা এলাম ভৃগুকমণ্ডলুতে। দেখলাম জটাজুটের গাছ লতাপাতা দিয়ে তৈরি ছোট কুটির। তখন সন্ধ্যা প্রায় লাগো লাগো। ঘরের কোণে রাখা একটা লম্ফ বের করে সাধুবাবা ফুঁ দিতেই জ্বলে উঠল। তখন এসব বিষয়ে কোনও বোধবুদ্ধি না থাকলেও দেশলাই ছাড়া লম্ফ জ্বলতে দেখে অবাকই হলাম। আর সেদিন এও অন্তরে বুঝেছিলাম, এই সাধুবাবার করুণায় অবসান হবে আমার দুঃখময় জীবনের।

সাধুবাবার মুখখানা কেমন যেন এক অপার্থিব উজ্জ্বলতায় ভরে উঠল। উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, ‘জয় গুরু মহারাজ কি জয়, জয় নর্মদা মাঈয়া কি জয়।’ আমি দু-পায়ে হাত দিয়ে একবার প্রণাম করে নিলাম। অর্থের অসুবিধা থাকায় তখন বিড়ি খেতাম। বিড়ি দিয়ে শুরু করে সাধুসঙ্গ শেষ করতাম বিড়িতে। অতি বৃদ্ধ এই সাধুবাবাকে বিড়ি খাওয়ার কথা বলতে কেমন একটা সংকোচ হল তাই বললাম না। বৃদ্ধ বললেন,

– এই পর্যন্ত আমার সঙ্গে কোনও কথা হল না। সাধুবাবার আসনের সামনে ধুনি জ্বলছিল। আমি বসলাম বাঁদিকে। ক্রমে রাত বাড়ল। খাবার তৈরি ছিল। যথাসময়ে শুয়ে পড়লাম। ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতে নর্মদায় স্নান করে আসতে বললেন। স্নান সেরে ফিরে এলে সাধুবাবা আমার বাড়ি থেকে পরে আসা পুরনো পোশাকের পরিবর্তে একটা নেংটি পরতে দিলেন। পরে দীক্ষা দিয়ে একটা গেরুয়া দিলেন নেংটির উপর পরতে। সেই থেকে শুরু হল আলাদা জীবন, পা পড়ল অন্য জগতে।

এবার সাধুবাবা আমাকে বললেন,

– বেটা, এখন আমি উঠি, তুই কোথায় যাবি?

আমি দুটো পা ধরে বললাম,

– বাবা, একটু বসুন, আমার কিছু কথা আছে যা বলা হয়নি আপনাকে। এখান থেকে ভেবেছিলাম উত্তরকাশী যাব। তা আর যাব না। আপনার সঙ্গে কথা শেষ হলে সোজা চলে যাব হরিদ্বারে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *