Tuesday , November 12 2019
Indian Rupee

নিদারুণ অর্থকষ্টেও এই কাজ করতে নিষেধ করলেন সাধুবাবা, করলে ভোগান্তি হয় ৩ পুরুষের

মানুষ কে কোন জাত, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কত দূর, এ দুটো প্রশ্ন অত্যন্ত অবমাননাকর। কাউকে এ প্রশ্ন করলে তাকে অপমানই করা হয়। এ কথা জেনেও জিজ্ঞাসা করলাম,

– আপনি পড়াশুনো করেছেন কতদূর?

হাসলেন সাধুবাবা। দারুণ হাসলেন কথাটা শুনে। হাসি দেখে ভাবলাম, সাধুদের মুখে এত হাসি আসে কোথা থেকে! বলেই ফেললাম,

– এত হাসেন কেমন করে?

হাসির রেশটা তখনও থামেনি। হাসতে হাসতেই বললেন,

– সাধুদের কিছু নেই বলেই তো হাসিটা আছে। সংসারীদের কিছু আছে বলেই তো হাসিটা নেই। সাধু আর গৃহীর তফাৎটাই তো এখানে। নিঃস্বের হাসিই তো সম্বল।

একটু থেমে বললেন,

– বেটা, ইস্কুলের মুখই আমি দেখিনি। চাষির ছেলে। ছোটবেলা থেকে চাষবাস নিয়ে ছিলাম তাই পড়াশুনো হয়নি আমার।

অম্লান মুখমণ্ডল সাধুবাবার। একের পর এক দিচ্ছেন প্রশ্নের উত্তর। খুশিতে মন আমার ভরে উঠেছে। চট করে ছেড়েও উঠতে পারছি না। অসংখ্য প্রশ্ন কিলবিল করছে মাথার মধ্যে। জিজ্ঞাসা করলাম,

– শুনেছি বাপমায়ের জীবিতকালে গৃহত্যাগ করলে নাকি তাঁদের অনুমতি নিতে হয়? অনুমতি ছাড়া সাধুজীবনে এলে নাকি অভীষ্ট সিদ্ধ হয় না?

মানসিক প্রসন্নতায় সাধুবাবার মুখখানা উজ্জ্বল ও প্রদীপ্ত। কথাটা শুনে ‘না’ সূচক হাত নাড়িয়েও মুখে বললেন,

– না না বেটা, ওটা ঘোর সংসারী বাপমায়ের স্বার্থসিদ্ধির কথা। গুরুজির মুখে শুনেছি, এমন কথা কোনও শাস্ত্রে লেখা নেই। বৈরাগ্য উপস্থিত হলে কোনও কিছুর প্রয়োজন হয় না। অনুমতি মনের একটা ভেক ব্যাপার। মানুষ কি বাপমায়ের অনুমতি নিয়ে মরে? সংসারে মন মরে গেল। মৃত্যু হল পার্থিব জীবনের। অপার্থিব জীবনে প্রবেশ করবে এতে অনুমতির কি আছে। বিয়ের পর কি কোনও ছেলে বাপ মায়ের অনুমতি নিয়ে স্ত্রীসঙ্গম করে? দেহ মন আত্মা, এ তিনের কল্যাণ ও তৃপ্তিতে যেকোনও কর্ম বা সাধনায় কারও অনুমতির প্রয়োজন হয় না।

কথাটা বলে সাধুবাবা যেন একটা আত্মতৃপ্তি লাভ করলেন। প্রশ্ন করলাম,

– বাবা, সত্যিই যদি কেউ গৃহত্যাগ করে তবে তার বিবাহ ও সাংসারিক সব ভোগ করে পরে গৃহত্যাগ করা ভাল, না প্রথম থেকেই ভোগের মধ্যে না গিয়ে সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়া ভাল? আপনার দু জীবনের অভিজ্ঞতা কি বলে?

মিনিটখানেক চুপ করে রইলেন। পরে বললেন,

– দেখ বেটা, সাধুসন্ন্যাসীদের চলার পথটা খুব একটা মসৃণ নয়। পতনের ভয় সর্বদাই। ক্রোধটাকে তত গুরুত্ব দিই না। কাম আর লোভ, ভয়টা এ দুটোতে। সব ত্যাগ করে ব্রহ্মচারী সাধু আর সংসারে সব ভোগ করে পরে সাধু, আসতে হচ্ছে তাকে সাধুজীবনে। একজনের অনাস্বাদিত আর একজনের আস্বাদিত জীবন, গুরুত্ব এবং ভয়টা উভয়পক্ষের সমান সমান। তার মধ্যে বাল্যকাল থেকে ব্রহ্মচারীদের পতনের ভয়টা একটু বেশি বলেই মনে হয়। তবে যত সংযমী সাধুই হোক, কে কখন পড়বে তা বলা মুশকিল। একটা ঘটনার কথা বলি শোন। এটা আমার নিজের চোখেই দেখা।

মুখমণ্ডলটা গম্ভীর হয়ে উঠল সাধুবাবার। চুপ করে বসে রইলেন। ভাবটা দেখে মনে হল চলে গেছেন সুদূর অতীতে। তারপর শুরু করলেন এইভাবে,

– সংসার ত্যাগ করে সাধুজীবন শুরু আমার চিত্রকূটেই। আজ থেকে বছর পঁচিশেক আগের কথা। সেই সময় আমার এক গুরুভাই-এর ছোট্ট একটা কুঠিয়া ছিল এখানে। বয়েস তখন তার বছর পঁয়তাল্লিশ হবে। খুব ভাল সাধু। সাধনজীবনে অনেক উচ্চাবস্থায় পৌঁছেছে। মাথায় বিশাল বিশাল জটা। আহার নিদ্রা বলে ওর কিছু ছিল না। প্রায়ই তার সঙ্গ করতাম। বিভিন্ন শাস্ত্র ও সাধনজীবনের নানা কথা শুনতাম। বিদ্যের দৌড় আমার অক্ষর পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তুলসীদাসজির রামায়ণ আমি ওর মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করেছি। বেশ আনন্দেই দিন কাটতো ওর সঙ্গে।

এই পর্যন্ত বলে থামলেন। পরের কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,

– গুরুভাই-এর মুখে শুনেছি, ও বারোবছর বয়সে গৃহত্যাগ করেছিল।

পূর্বাশ্রমে থাকত প্রতাপগড়ে। আমার গুরুজি ওকে অক্ষর পরিচয় করিয়েছিলেন। আমি যখন সাধুজীবনে আসি গুরুজির বয়স তখন অনেক। শেষ অবস্থা। তাই অক্ষরজ্ঞান লাভের সৌভাগ্য হয়নি, চেষ্টাও করিনি। দীক্ষার পর কাটল বছরখানেক। দেহরক্ষা করলেন গুরুজি। বেটা, লক্ষ্মী আর সরস্বতী দুজনের কৃপা একসঙ্গে খুব কম লোকেরই লাভ হয়। আমার দিকে ওরা কেউ ফিরেও তাকায়নি। আমি চলি গুরুজির কৃপাতে।

সাধনজীবনে গুরুভাই-এর যখন উচ্চাবস্থা তখনই এল ওর পতনের সময়। এই চিত্রকূটের এক দোকানদার বড় ভাল মানুষ। ভজনপ্রিয়। গুরুভাইকে বিশ্বাস করত অসম্ভব। আন্তরিক শ্রদ্ধাভক্তিরও তুলনা ছিল না। প্রকৃতই সাধু ছিল আমার গুরুভাই।

সাধুসেবায় কিছু দান করলে পুণ্য হবে, অন্তরে এই বিশ্বাস ছিল দোকানদারের। অনুমতি নিয়ে কিছু মিষ্টি দুধ পাঠিয়ে দিত প্রতিদিন। পাঠাতো তার মেয়েটিকে দিয়ে। বয়স তখন তার বছর ষোলো সতেরো। মেয়েটির আসা যাওয়াটাই হল কাল। পঁয়তাল্লিশের গুরুভাই। এত বছরের সংযমী জীবনের বাঁধ ভাঙতে শুরু করল এবার। ভিতরে ভিতরে বাড়তে থাকল দুর্বলতা। ক্রমেই আসক্ত হয়ে পড়ল মেয়েটির দেহের প্রতি তীব্রভাবে। বেটা, কামের ছোবল এড়াতে পারল না গুরুভাই।

সাধুবাবা থামলেন। সম্পূর্ণ অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। কৌতূহল সামলাতে না পেরে বললাম,

– তারপর, তারপর কি হল বাবা?

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

– তারপর আর কি! যা হবার তাই-ই হল। মেয়েটির সঙ্গে গুরুভাই দিনের পর দিন দৈহিকমিলনে লিপ্ত হতে থাকল গোপনে। কামের ছোবল আর প্রকৃতির চাবুক, এ থেকেই মেয়েটির গর্ভে এল একটি সন্তান। কালের নিয়মে তা একদিন গেল জানাজানি হয়ে। অগত্যা বিয়ে করতে বাধ্য হল গুরুভাই। স্থানীয়রা জোর করে বিয়ে দিল মেয়েটির সঙ্গে। এখন স্ত্রী সন্তান নিয়ে ও সংসার করছে।

বিস্মিত হয়ে গেলাম সাধুবাবার কথা শুনে। কামের অদ্ভুত মার। কঠোরতপা সাধুকেও ছাড়ে না। এমন ঘটনার কথা গৃহজীবনে শোনা যায় আকছার। বিজ্ঞানের দয়ায় অঙ্কুরে অসংখ্য বিনষ্ট হয় প্রতিদিন। শতকরা একটার খবরও পাওয়া যায় না। সাধুজীবনেও ঘটে। ভাবতে লাগলাম অনেক কথা। কূলকিনারা কিছুই পেলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম,

– এখন আপনার সেই গুরুভাই-এর সঙ্গে কি দেখাসাক্ষাৎ হয়?

মাথাটা মৃদু নেড়ে বললেন মলিনমুখে,

– কখনও সখনও দেখা হয়, তবে সংসারী হলেও সাধুমনটা এখনও নষ্ট হয়ে যায়নি। এখন বুঝতে পারছিস, সংসারে নারীভোগ করেই সাধু হও আর না করে হও, কাম বাসনা আসক্তি সঙ্গেই থাকবে। সংযমতাই সাধনার মূল কথা। আর ওটা যে কার, কখন কিভাবে ভাঙবে তা অত্যন্ত সংযমী সাধু যেমন, তেমনই বলতে পারবে না চুটিয়ে ভোগ করে সংসার ত্যাগ করা সাধুও। নইলে মেয়ের বয়সী মেয়ের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটে! আমি তো চিনি ওকে, সত্যিই ওর মধ্যে দেখেছি সংযমী নিষ্পাপ নির্বিকারভাব।

এবার জানতে চাইলাম,

– বাবা, আপনি তো মেয়েটিকে দেখেছেন। কি এমন দেখে মেয়েটির আকর্ষণে পড়ল আপনার গুরুভাই? এত বছরের সংযমজীবন শেষ হয়ে গেল একেবারে!

গম্ভীরভাবে সাধুবাবা বললেন,

– এটা বুঝলি না! প্রতিদিন মেয়েটিকে দেখত। কথা বলত। উঠতি বয়সের মেয়ে। যৌবন ফুটছে টগবগ করে। ‘বেটা, কিসিকা উপর নজর সে নজর মিলা করকে বাত করনে সে আঁখকে দ্বারা কাম মনমে ঘুস্ যাতা। কাম আঁখমে ভি হোতা হ্যায় পুরুষোকা। স্ত্রীয়োঁকে কুচমে।’ নিত্য অনাস্বাদিত ভোগ্যবস্তু চোখে দেখলে ধীরে ধীরে ভোগের বাসনা তো জাগবেই। পুরুষের কাম দেহে থাকে না, থাকে চোখে। চোখ থেকে বিতরিত হয় মনে, পরে দেহে। স্ত্রীজাতির চোখে কাম থাকে না। তা যদি থাকত তাহলে গোটা জগৎ সংসারটারই পতন ঘটে যেত। ‘বেটা, আঁখ মিলানা হ্যায় তো ভগবান সে মিলাও।’

এবার একেবারে হাত দিলাম একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারে,

– বাবা, গৃহীজীবন থেকে এলেন সাধুজীবনে। এই জীবনে আসার পর আপনার মনে কখনও নারীভোগের ইচ্ছা জাগেনি?

উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন সাধুবাবা। একটু চমকে উঠলাম হাসির শব্দে। হাসতে হাসতেই বললেন,

– বেটা, সংসারে থেকে দীর্ঘদিন কামরস আস্বাদন করেছি আমি। স্বামী বৃদ্ধ হলে কোনও পত্নীর প্রবৃত্তি হয় না, ইচ্ছাও করে না স্বামীকে আলিঙ্গন করতে। সাধুজীবনে আমার বৃদ্ধস্বামীর পত্নীর মতো মনের অবস্থা।

প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম,

– এমন একটা উপদেশ দিন যাতে সংসারীদের কল্যাণ হয়। মিনিটখানেক ভাবলেন। বললেন,

– বেটা, যত অর্থকষ্টেই থাকিস না কেন, ঘুষ আর সুদের অর্থ নিবি না। ও দুটোর অর্থে পার্থিব প্রতিষ্ঠা আর আর্থিক সচ্ছলতা থাকে। তবে নিশ্চিত জানবি, এই অর্থ যে গ্রহণ করে সে স্ত্রী সন্তান অথবা শরীর, এর কোনও না কোনওটাকে নিয়ে ভুগবে। তার সন্তান, সে-ও পরবর্তীকালে ভুগবে সংসারে সন্তান, স্বামী বা স্ত্রীকে নিয়ে। এখানেই শেষ নয় বেটা, তার সন্তানও ভুগবে ওই একইভাবে। পর পর এই তিনপুরুষ শান্তি পাবে না মৃত্যু পর্যন্ত। জুটলে খাবি, না জুটলে খাবি না। ভিক্ষে করবি তবু ঘুষ আর সুদ খাবি না কখনও। একজনের পাপে ভুগবে তিনপুরুষ। এ কথা আমার নয়, শুনেছি গুরুজির মুখে। উপদেশ চাইলি, মনে পড়ে গেল তাই বললাম।

অনেকটা সময় কেটে গেল। উঠতে হবে। প্রণাম করে শেষ প্রশ্ন করলাম, এবার ঈশ্বর সম্পর্কে,

– বাবা, ঈশ্বরের অস্তিত্ব কি কিছু উপলব্ধি হল, তাঁর সন্ধান কি কোথাও কিছু পেলেন?

উজ্জ্বল হাসিমাখা মুখ সাধুবাবার। উদাত্তকণ্ঠে বললেন,

– বেটা, তিলের মধ্যে তেল, ফুলের মধ্যে সুগন্ধ, চকমকির মধ্যে আগুন, দুধের মধ্যে যেমন মাখন নিহিত আছে তেমনই ঈশ্বর রয়েছেন তোর, আমার আর সকলের প্রাণের মাঝে।

জিজ্ঞাসা করলাম,

– আপনি তো বাবা কথাটা বললেন সহজ উদাহরণে। কিন্তু আমাদের তো তা উপলব্ধিতে আসে না। তাঁকে লাভ বা উপলব্ধি করার উপায় কি?

মুখে হালকা হাসির প্রলেপ লাগিয়েই বললেন,

– বেটা, প্রথমে ঈশ্বর আসেন উদাহরণে পরে উপলব্ধিতে। আর বিরহ বেদনা ছাড়া কি তাঁকে লাভ করা যায়?

এবারও বললাম,

– বাবা, আবার সেই উদাহরণ?

সঙ্গে সঙ্গেই বললেন,

– হাঁ বেটা উদাহরণেই বলি, তিলকে নিষ্পেষণ করলে যেমন তেল পাওয়া যায় তেমন বিরহ বেদনা দ্বারা প্রাণকে নিষ্পেষণ করলে তবেই পাওয়া যায় তাঁকে।

মুহুর্ত দেরি না করে বললাম,

– আপনি কি পেয়েছেন?

হাসিতে ভরে উঠল সাধুবাবার মুখখানা। বললেন,

– তা তো জানিনে বেটা।

কেমন যেন একটা গোপন করাব ভাব ফুটে উঠল কথাটায়। মনে হল লুকোতে চাইছেন কিছু। আমি কথায় একটু চাপ দিয়ে বললাম,

– তাহলে এসব কথা আপনি বলছেন কি করে?

মুখে চাপাহাসি অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

– বেটা এসব কথা বলছি উপলব্ধি থেকে।

একটু অধৈর্য হয়েই বললাম,

– ঈশ্বর যদি উপলব্ধিতেই তবে উপলব্ধিটা কি?

একঝলক দেখে নিলেন আমার মুখটা। চোখদুটো ঘুরিয়ে দেখে নিলেন চারপাশে। সোজাসুজি তাকালেন মন্দাকিনীতে ছোট্ট একটা নৌকার দিকে। তারপর আবার তাকালেন আমার মুখের দিকে। এবার শান্তকণ্ঠে বললেন সাধুবাবা,

– ওটা না আসলে বুঝবিনে!

(পরবর্তী পর্ব আগামী বুধবার)

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *