Sunday , September 22 2019
Lakshman Jhula
ফাইল : লক্ষ্মণঝুলা, ছবি - আইএএনএস

যোগবলে প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া বালককে জীবনদান করলেন মহাযোগী

এই পর্যন্ত বলে থামলেন। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি আমার ট্রেনের সময় এগিয়ে আসছে। তাই মনে মনে ভাবলাম, যতটা সম্ভব জেনেনি। সময় নষ্ট না করে সরাসরি ফিরে গেলাম আগের প্রশ্নে,

– বাবা, একটা জিজ্ঞাসার উত্তর আপনি এড়িয়ে গেছেন অন্য প্রসঙ্গে। দয়া করে বলুন না, কেন ঘর ছাড়লেন?

প্রশ্নটা শোনামাত্র সাধুবাবার মুখখানা বিবর্ণ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। দেখে মনে হল যেন ভিতরে ভিতরে বেশ অস্থির হয়ে উঠলেন। শূন্যদৃষ্টিতে একবার এদিক ওদিক চোখদুটোকে ঘুরিয়ে নিলেন। এবার আর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে করুণ সুরে বললেন,

– বেটা, সাধুজীবনে আসার ভাবনা আমার কখনওই ছিল না। ‘গয়া জিলাতে আমাদের বাড়ি। আমরা ছিলাম আট ভাইবোন। অভাবের সংসার। বাবা দিনমজুরের আর মা ‘বাবু’-র বাড়িতে করতেন বাসন মাজার কাজ। তাতে বেটা সংসারই চলত না। বাবার কাজটাও প্রতিদিন হত না। দুদিন হল তো সাতদিন বসে গেল। ফলে বেশিরভাগ দিন একবেলা আবার কোন কোনওদিন সকলের না খেয়েই দিন কাটতো। এইভাবে কাটতে লাগল দিনগুলো।

একটু থামলেন। প্ল্যাটফর্মের আলো আঁধারিতে দেখলাম চোখদুটো জলে ভরে উঠেছে। মুখখানায় আষাঢ়ে মেঘ যেন ছেয়ে গেছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই সাধুবাবা ঘুরিয়ে নিলেন চোখদুটোকে। বুঝতে অসুবিধা হল না চোখের জল গোপন করতে চাইলেন। একটু অন্যমনস্কভাবে বললেন,

– তখন আমার বয়েস বছরপাঁচেক। অভাবের সংসারে সেদিন আহারের কোনও ব্যবস্থাই হল না। সারাটা দিন না খেয়েই কাটালাম। সন্ধের পর এমন ক্ষিদে পেল যে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। আমার সব ভাইবোনেরা না খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেও আমি ঘুমাইনি ক্ষিদের জ্বালায়। কিছু খাবার জন্য বায়না ধরলাম মায়ের কাছে। ‘আমায় খেতে দাও’ ‘আমার ক্ষিদে পেয়েছে’ এই একই কথা সমানে বলতে থাকায় মা বিরক্ত হয়ে খুব মারলো আমাকে। ছোটবেলা থেকে এমনিতেই আমি একটু ‘টেটিয়া’। মার খেয়ে কিছু বললাম না। চুপ করে বসে রইলাম কিন্তু ভিতরে ভিতরে অভিমানে রাগে ফুঁসলে উঠতে লাগলাম। একটু রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে লুকিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে। গাঁয়ের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এসে গেলাম স্টেশনে। ‘ভুখা’ পেটে স্টেশনে এসে ক্লান্ত দেহে ভিখিরিদের মতো ঘুমিয়ে পড়লাম প্ল্যাটফর্মে। সেদিন শরীর আর বইছিল না।

সাধুবাবা থামলেন। দুচোখ থেকে গাল বেয়ে টপটপ করে নেমে এল জলের ধারা। মুছে ফেলার চেষ্টা করলেন না। স্থির হয়ে একাসনে বসে রইলেন। মনে মনে ভাবলাম, দেখেছিও অনেক, সাধুদের অন্তরে চাপা দুঃখ শোক বেদনা বা কোনও ক্ষোভের আগুন থাকলে তা একটু উস্কে দিলে তখন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে গৃহীদের মতো। আমার মনে হয় সাধুদের সঙ্গে গৃহীদের দুঃখ ও বেদনামূলক মানসিকতায় পার্থক্য নেই এতটুকু। পার্থক্য শুধু বৃত্তি আর পথ চলায়। যাইহোক, করুণ মুখে বললেন,

– ভোর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল স্টেশনে ট্রেন ঢোকার শব্দে। ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। এরপর কোনও কিছু না ভেবে উঠে পড়লাম ট্রেনে। সেদিন ছিল খালি গা আর পরনে ছেঁড়া একটা প্যান্ট। ভিখিরির ছেলে ভেবে কেউ কিছু বলল না। ট্রেনে উঠে মেঝেতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙল, জানতে পারলাম ট্রেন বেনারসে এসেছে। ক্ষিদের জ্বালায় তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। তারপর কয়েকজনের কাছে হাত পাততেই কিছু জুটে গেল। ক্ষিদের জ্বালাটাও মিটলো। এইভাবে পথে পথে ঘুরি, ভিক্ষে করি আর খাই। শুয়ে থাকি যখন যেখানে দেহটা এলিয়ে পড়ে।

অতীতকথা স্মরণ করে ভুরুটা একটু কোঁচকালেন। দেখলাম চোখমুখের করুণভাবটা অনেক কেটে এসেছে। বললেন,

– দেখতে দেখতে বেটা এমনিভাবে বাবা বিশ্বনাথের কোলে কেটে গেল প্রায় মাসতিনেক। একদিন ঘুরতে ঘুরতে গেছি বিশ্বনাথ মন্দিরের সামনে। দেখি একজন ধনী ভক্ত-সাধু আর ভিখিরিদের পুরি সবজি পয়সা দান করছে। আমিও আর সকলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লাম লাইনে। দান নিয়ে যখন খানিকটা এগিয়ে গেছি তখন পথের ধারে বসে থাকা এক সাধুবাবা আমাকে ডাকলেন। আমি তাকাতেই ইশারায় আরও কাছে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন। এগিয়ে যেতে তিনি বললেন, ‘কিরে বেটা, তুই ভিক্ষে করছিস কেন, ভিক্ষে করে ভিখিরিরা। সাধুরা কখনও ভিক্ষে করে নাকি? সাধুরা হাত উপুড় করতে শিখেছে, হাত পাততে শেখেনি। তোর কপালে ‘বড়া সাধু হোনে কা’ চিহ্ন আছে। চল আমার সঙ্গে, তোকে এখন থেকে আর কিছু ভাবতে হবে না। তোর ভাবনা আমি ভাববো,’ বলে আমাকে সোজা নিয়ে গেলেন দশাশ্বমেধ ঘাটে। আমাকে নিয়ে তিনি নিজেও স্নান করলেন। আমি কোনও কথা বলতে পারিনি। সবকিছু করছি বিবশভাবে। মুখে কে যেন তালা দিয়ে রেখেছে। স্নানের পর আমাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলেন কাশীর দুর্গামন্দিরে। ওখানেই কানে ‘ফুক’ দিলেন। তখন তো নেহাত বাচ্চা। কিছু বুঝি না, বোঝার চেষ্টাও ছিল না। মুখে কোনও কথা না বলে যা করাচ্ছেন সাধুবাবা তা-ই করছি। যখন এপথের একটু জ্ঞান হল, তখন বুঝেছি ওইদিনই আমার জীবনবন্ধন লাভ হয়েছিল। পরে বেনারসে কয়েকদিন কাটানোর পর গুরুজি আমাকে নিয়ে সোজা এলেন হরিদ্বারে। ওখান থেকে কেদারবদরীসহ চারধাম ঘুরলাম পায়ে হেঁটে। এইভাবে তীর্থভ্রমণ, সাধনভজন আর যোগশিক্ষা চলতে লাগল গুরুজির কাছে। পেটের জন্য ঘর ছেড়ে বেটা পেটের চিন্তাই আমার চলে গেল। ধীরে ধীরে একসময় বুঝতে পারলাম ‘বহুত ভাগ সে’ আমি এসেছি এক পরমানন্দময় জীবনে। আর একটা কথা বেটা, গুরুজি সাধুদের ভিক্ষা করাটা বড় অপছন্দ করতেন। নিজেও কখনও ভিক্ষা করতেন না। যতদিন দেখেছি, যখন যা কিছুর প্রয়োজন হত তখন তিনি রাস্তায় অথবা কোনও গাছের তলায় গিয়ে বসতেন। দেখতাম, প্রয়োজনীয় জিনিস অথবা সেই দ্রব্যের মূল্য কেউ না কেউ অতি সত্বর দিয়ে গেছে।

একটানা বলে একটু থামলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, আপনার গুরুজি কি এখনও দেহে আছেন?

এখন দেখছি আগের মতোই প্রসন্নতা ফিরে এসেছে সারা মুখখানায়। তিনি বললেন,

– গুরুজি এখন আর দেহে নেই। আজ থেকে প্রায় বছর দশেক হল তিনি পুষ্করে দেহ রেখেছেন।

কৌতূহলী হয়ে বললাম,

– বাবা, কথা শুনে মনে হল আপনার গুরুজি মহারাজ যোগী ছিলেন। গুরুজির সঙ্গে থাকাকালীন জীবনে এমন কোনও অলৌকিক ঘটনা কি ঘটেছে, যা দেখে আপনি তাজ্জব বনে গেছেন!

কথাটা শেষ হওয়ামাত্র বললেন,

– ইয়ে তো বেটা বহুত দফা হুয়া। ‘লেকিন’ এসব কথা শুনলে তোর বিশ্বাস হবে না।

সঙ্গে-সঙ্গেই বললাম,

– বাবা, আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে আপনার কি কিছু যায় আসে? দয়া করে বলুন না জীবনে গুরুজির দেখানো কৃপার কথা।

এবার সাধুবাবা দু-হাত জোর করে কপালে ঠেকালেন। প্রণাম করলেন তার করুণাময়ের উদ্দেশ্যে। পরে চোখদুটো বন্ধ করে বললেন,

– বেটা, একটা ঘটনার কথা তোকে বলছি। গৃহত্যাগের পর ঘুরতে ঘুরতে আমি আর গুরুজি একদিন হরিদ্বার হয়ে এসেছি লছমনঝোলায়। দুজনে বসে ছিলাম গীতাভবনের সামনে গঙ্গার ঘাটের সিঁড়িতে। সেই সময় কিছু তীর্থযাত্রী স্নান করছিল গঙ্গায়। একজনের একটা বছরদশেকের বাচ্চা দেখতে দেখতে ভেসে যেতে লাগল প্রবল স্রোতের টানে। তখন বর্ষার পাহাড়িজলে গঙ্গার টানই আলাদা। মুহুর্তে মধ্যে ঢেউ-এর তালে তালে বাচ্চাটা মিলিয়ে গেল চোখের সামনে। সেই সময়ে সকলের চিৎকারে মর্মান্তিক এই ব্যাপারটা গুরুদেবের নজর এড়ায়নি। তখন তো এতো বুদ্ধি হয়নি আমার। যোগ বিভূতির আমি কিছুই বুঝি না। গুরুজিকে দেখলাম দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে গেলেন গঙ্গায়, সঙ্গে আমিও। এবার তিনি গঙ্গারজল অঞ্জলিভরে তুলে নাক দিয়ে টানতে লাগলেন। এমনটা করতে লাগলেন সমানে। মিনিটখানেকও যায়নি, ঘাটের সকলে দেখলাম স্রোতের বিপরীতে সোঁ সোঁ করে জলের উপরে ভেসে আসছে ছেলেটির দেহ। চোখের পলকে অচৈতন্য দেহটি এসে থামল আমার গুরুজির চরণের কাছে। আলতোভাবে তুলে এনে তিনি সিঁড়িতে শুইয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে কি বলে তিনটে ফুক মারতেই ছেলেটি উঠে বসল। ওই সময় গীতাভবনের কাছে যারা ছিল, তাদের আশ্চর্যের আর অবধি রইল না। ছেলেটিসহ উপস্থিত সকলে প্রণাম করল গুরুজিকে। ধন্য হলাম আমি। এই ঘটনার পর গুরুজি ওখানে আর এক মিনিটও রইলেন না। আমাকে সঙ্গে নিয়ে আবার রওনা হলেন হরিদ্বারের পথে।

এই পর্যন্ত বলে সাধুবাবা মাথা চুলকাতে চুলকাতে জানতে চাইলেন, ‘সময় কত হল?’ ঘড়ি দেখে সময় জানাতে বললেন,

– বেটা, আমার ট্রেনের সময় প্রায় হয়ে এল। আর মিনিটদশেক বাকি।

একথায় মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। খারাপ হল এই ভেবে আর বেশিক্ষণ কথা বলা যাবে না। তবুও যতটুকু জানা যায় মনে করে বললাম,

– বাবা, এমন কয়েকটা কথা বলুন বা উপদেশ দিন যাতে আমার মনের মলিনতা দূর হয়।

হাসি হাসি মুখ করে অন্তরঙ্গতার সুরে বললেন,

– বেটা, কোনও নারীপুরুষের মনই মলিন নয়। রিপু মানুষের নির্মল মনকে মলিন করে রাখে। রিপুর প্রভাবে মন আচ্ছাদিত হয়ে থাকে। প্রভাবটা কাটলে মনের নির্মলতা উপলব্ধি করা যায়, বুঝলি?

জানতে চাইলাম,

– বাবা, সংসারে থেকেও সংসারে বৈরাগী থাকার পথটা কি আপনার জানা আছে?

মাথাটা দোলাতে দোলাতে সাধুবাবা বললেন,

– বেটা, সংসারে বা সংসারজীবনের বাইরে, যেখানেই বল না কেন, ত্যাগের আশ্রয়ে আশ্রিত না হলে অন্তরে কখনও বৈরাগ্য আশ্রয় নিতে পারে না। বৈরাগ্য না এলে মনও তার শরণাগত অর্থাৎ আশ্রয়প্রার্থী হয় না। শরণাগত হলে অনুরাগ হয়। অনুরাগ থেকে তাঁর কৃপা করুণা সবই লাভ হয়। যার ভিতরে ত্যাগ নেই, শুধু পাওয়ার বাসনা, তার এপথে কিছু পাওয়া হয় না। একটাই পাওয়া হয়, সেটা শতসুখেও আমৃত্যু মানসিক যন্ত্রণা, এমনকি মৃত্যুর পরেও। বেটা, ত্যাগে সব পাওয়া যায়, ঈশ্বরকেও।

প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢোকার শব্দ এল। সাধুবাবা ছোট্ট ঝোলটা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি বসা অবস্থাতেই প্রণাম করলাম। মুখে কথা বললেন না। হাসিমুখে হাতটা অভয়সূচক করলেন। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন। মিলিয়ে গেলেন ভিড়ের মধ্যে। খানিক পরেই ট্রেন ছাড়ল। সাধুবাবার কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হাঁ করে চেয়ে রইলাম ট্রেনের দিকে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ট্রেনটা, তবে মন থেকে সাধুবাবা নয়।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *