Sunday , October 20 2019
Haridwar
হরিদ্বারের দক্ষরাজ মন্দির, নিজস্ব চিত্র

মন্দিরে গিয়ে কি করতে হয় আর কি করতে নেই জানালেন সাধুবাবা

সাধুবাবার সম্পর্কে ভেবে নিলাম একমুহুর্ত। একটু আগেই রাস্তার চরিত্রহীন কুকুরগুলোর মতো তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন আমাকে। কোনও কথাই বলতে চাইছিলেন না। অথচ এখন, ভাবতেই কেমন যেন লাগছে! হঠাৎ সাধুবাবা বললেন,

– হ্যাঁরে, তুই তো একটু আগে বললি অনেক ঘুরেছিস। ভালো কথা। মন্দিরে গিয়ে দেবদেবীর দর্শন করিস, পুজো দিস এসব তো করিস?

প্রসঙ্গ পাল্টে এ রকম একটা প্রশ্ন করায় একটু অবাকই হলাম। উত্তরে বললাম,

– কোনও তীর্থে গেলে স্বাভাবিক নিয়মেই যাই মন্দিরে আর সকলে যেমন যায়। পুজো দেয়ার ব্যাপারটা আলাদা। ইচ্ছে হলে দিই, নইলে নয়। হঠাৎ এ কথা জিজ্ঞাসা করলেন!

মুখখানা গম্ভীর হয়ে উঠল সাধুবাবার। অপলক দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

– যদি মনের উন্নতি চাস, আত্মিক কল্যাণ চাস তাহলে আর যাস না। কেন নিষেধ করছি বলি শোন। সাধারণভাবে অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটে মন্দিরে। বিশেষ করে প্রসিদ্ধ মন্দিরে তো কোনও কথাই নেই। সেখানে প্রবেশ করলে পারমার্থিক কল্যাণ তো হয়ই না, অকল্যাণই হয়। অবশ্য তুই যদি আধ্যাত্মিক কল্যাণ না চাস তো আলাদা কথা।

চমকে উঠলাম কথাটা শুনে। বিস্মিত হয়ে বললাম,

– বলেন কি বাবা, এমন কথা তো শুনিনি কখনও!

গম্ভীরভাবে বললেন,

– হাঁ বেটা, ঠিকই বলছি। মন্দিরে ঢুকলে অক্টোপাসের মতো মনকে আঁকড়ে ধরবে সংসারের বাসনাগুলো। ঈশ্বরের কাছে মুক্তির প্রার্থনা করলেও ধরবে, কিছু না ভাবলেও ধরবে। একবার পরখ করে দেখিস। বহু মানুষের সমাগম হয় এমন মন্দিরে যাবি। ভিতরে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকবি কিছুক্ষণ। কোনও কিছু নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। এবার বেরিয়ে এসে স্থির হয়ে কোথাও দাঁড়া। দেখবি নানা কামনামূলক চিন্তার উদয় হচ্ছে মনে। এটা হবে সকলের। খুব খেয়াল করলে তবেই বোঝা যায় অথচ ভুল করেও কেউ খেয়াল করে না।

একটু থামলেন। সামনে পড়ে থাকা গাছের পাতা একটা তুলে নিলেন হাতে। বোঁটাটা ধরে দু-আঙুলে ঘোরাতে লাগলেন কানে সুড়সুড়ি দেয়ার মতো করে। এমন করতে করতে বললেন,

– আবার এমনও হবে, বাইরে থেকে কামনামুক্ত ভাব নিয়ে মন্দিরে ঢুকে দাঁড়াবি কিছুক্ষণ। দেখবি ধীরে ধীরে সেই ভাবেরও পরিবর্তন হয়ে যাবে অজান্তে। সাংসারিক বাসনার ভাবই ক্রমাগত প্রতিফলিত হতে থাকবে মন। যত বেশিক্ষণ থাকবি, ততবেশি করে ওগুলো মনের মধ্যে আসতে থাকবে।

কথাগুলো শুনছি হাঁ করে। এসব কথা তো শুনিনি কখনও। মনে মনে ভাবছি, কোনও মন্দিরে গিয়ে এমন ভাবনা এসেছিল কিনা মনে! কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। সাধুবাবা বললেন,

– যেসব মন্দির নির্জনে, লোক সমাগম হয় না বললেই চলে, সেখানে গেলে মনে চট করে জাগতিক বাসনার উদয় হবে না। মনের ভাবটি থাকবে স্বতন্ত্র। নির্জনে অবস্থিত মন্দিরে যাওয়ার ফল অনেক ভাল ‘জাগ্রত’ বলে খ্যাত মন্দিরের তুলনায়। তবে সাংসারিক কোনও কামনায় ওসব ‘জাগ্রত’ মন্দিরই ফলপ্রদ। সত্যি যদি কেউ কামনা থেকে মুক্ত হয়ে মনকে পরমানন্দে রাখতে চায় তাহলে কোনও মন্দিরে না যাওয়াই মঙ্গল। কি হবে বলত একঘটি জল বিশ্বনাথের মাথায় ঢেলে! পুণ্য হবে, মুক্তি পাবি? তাহলে তো সবাই মুক্ত হয়ে যেত।

এবার থাকতে না পেরে বললাম,

– বাবা আপনি বললেন, মন্দিরে গেলে সাংসারিক কামনা বাসনা মনকে আঁকড়ে ধরবে, কেন ধরবে, কেমন করে ধরবে, কারণটা কি বলবেন?

মিনিটখানেক চুপ করে রইলেন। ভাবের কোনও পরিবর্তন দেখলাম না। কিছু যে একটা চিন্তা করছেন তাও মনে হল না। শূন্যদৃষ্টিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন চারদিকে। বললেন,

– ‘মন্দির’ শব্দটাই বশ করে মানুষকে। আকর্ষণ করে টেনে আনে দূর-দূরান্ত থেকে। তাই তো মানুষ ছুটে আসে—আসে অসংখ্য কামনা নিয়ে। মন্দিরে চলতে থাকে কামনা বাসনারই প্রার্থনা। ফলে সীমাবদ্ধ মন্দির অভ্যন্তরের বায়ুমণ্ডল পরিব্যাপ্ত হয়ে যায় পার্থিব কামনায়। মুখে উচ্চারিত কামনাবাক্যের শব্দ এবং চিন্তাতরঙ্গ গেঁথে যায় দেয়ালে, ঘুরতে থাকে মন্দিরক্ষেত্রের বায়ুমণ্ডলে। এবার মন্দিরে ঢোকার সঙ্গেসঙ্গেই বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ানো অসংখ্য মানুষের কামনামূলক চিন্তা ও কথাগুলো আশ্রয় করে দেহ ও মনকে। তারপরই ক্রিয়া করতে থাকে। ফলে মন ভরে ওঠে কামনা বাসনায়। এগুলো হয় সব অলক্ষ্যে, অজান্তে। চোখে দেখা যায় না। বুঝতে পারেন শুদ্ধদেহি ও মনের যাঁরা। মনে রাখবি, কোনও বাক্য বা চিন্তা কখনও লুপ্ত হয় না। রয়ে যায়, ভেসে বেড়ায় বায়ুমণ্ডলে, গেঁথে যায় বদ্ধ জায়গার বস্তুতে।

সাধুবাবা একটা উদাহরণ দিয়ে বললেন,

– স্বামী স্ত্রী পাশাপাশি কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলে একের কামচিন্তা অপরের দেহমনকে আশ্রয় করে উত্তেজিত করে তোলে। যতই মনে করুক ঠিক থাকব, কিছুতেই থাকতে দেবেনা। একদিন দুদিন তারপর যে কে সেই। মন্দিরেও তাই, ধরবেই ধরবে। দেহ মন শুদ্ধ হলে মন্দিরের ব্যাপারটা বুঝতে পারবি সহজে। ওটা শুদ্ধ হয় ঈশ্বরের স্মরণ মনন ও অনুধ্যানে। যাদের হয়েছে তারা কামনা জর্জরিত মানুষ দেখলে বা কাছে এলে বুঝতে পারে। কারণ চিন্তাতরঙ্গ তার দেহ মনকে স্পর্শ করে। ফলে তারা বিরক্ত হয়, সঙ্গ দিতে চায় না। তবে একটা কথা নিশ্চিত জানবি, সাধনশক্তি না থাকলে মন্দিরে গেলে মন কামনায় আচ্ছন্ন হবে। সত্যিই যদি মনের উন্নতি চাস তাহলে মন্দিরের ভিতরে যাস না। বাইরে থেকে দেবদর্শন করিস। মনের মুক্তি কখনও মন্দিরে আসে না।

অবাক হয়ে গেলাম কথাগুলো শুনে। অধ্যাত্মভূমি তপোবন এই ভারতবর্ষ। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য তীর্থে অগণিত মন্দির। এসব কি তাহলে কামনা জর্জরিত হয়ে আছে? সেখানে যারা যায় তাদের কি কোনও কল্যাণই হয় না? কোনও সাধকের জীবনীতে তো এমন কথা পাইনি! এইমুহুর্তে আর কিছু ভাবলাম না। সময় নষ্ট হয়ে যাবে। বাদ পড়ে যাবে অন্য কথা, অন্য জিজ্ঞাসা। প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম,

– বাবা আপনি কোন সম্প্রদায়ের সাধু?

এখনও আমি সেই চন্দনের ভুরভুর করা গন্ধের মধ্যেই আছি। আমার গা-ও ভরে গেছে গন্ধে। ‘সম্প্রদায়’ কথাটা শুনে হেসে ফেললেন। বললেন,

– লেখাপড়া শিখে তোর এতদিনে এই জ্ঞান হয়েছে? ঈশ্বরের রাজত্বে যারা বাস করে, তাঁকে যারা ডাকে, তাদের কোনও সম্প্রদায় আছে নাকি? তাঁকে ডাকতে সম্প্রদায়ভুক্ত হতে হয় নাকি!

সাধুবাবার এ কথার পর আর কোনও কথা চলে না। তাই ও প্রসঙ্গ ছেড়ে অন্য কথা জিজ্ঞাসা করলাম,

– কত বছর বয়সে ঘর ছেড়েছেন, ছাড়লেনই বা কেন?

কথাটা শুনে একটু বিব্রত হলেন বলে মনে হল। মুহুর্তে তিনি সেই ভাবটা কাটিয়ে বললেন,

– পরমাত্মার ইচ্ছা তাই-ই হয়েছে। ওসব কথায় তোর কাজ নেই।

তবুও একটু চাপ দিলাম,

– বলুন না বাবা, কারণ তো কিছু আছে, কেন ছাড়লেন?

মিনিট পাঁচ সাত কি ভেবে পরে বললেন,

– বেটা, বিশ্বসংসারে চেষ্টা করে কেউ যেমন সাধক বা বিজ্ঞানী হতে পারে না তেমনই পারে না চোর হতে। পথ নির্দিষ্ট ছিল, হয়েছে। তবে লৌকিক কারণ তো কিছু আছেই। আমার ফেলে আসা জীবন ফেলেই এসেছি। তাই কাজ নেই ও কথায়।

বুঝতে পারলাম পিছনে ফিরে যেতে চান না সাধুবাবা। না চাইলে কি হবে, আমাকে জানতেই হবে। পা-দুটো ধরে অনুরোধের সুরে বললাম,

– দয়া করে বলুন না বাবা, ক্ষতি তো কিছু নেই।

আমার হাতদুটোকে সরিয়ে দিতে দিতেই বললেন,

– ছাড় ছাড়, পা ছেড়ে দে। সাধুদের বলতে নেই ওসব কথা।

হাত সরিয়ে নিলাম পা থেকে। চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। চোখমুখের ভাবটা কেমন যেন বদলে গেল। ফিরে গেলেন সুদূর অতীতে যেখানে কোনও সাধুবাবাই সহজে যেতে চান না,

– তখন বেটা বয়েস কত হবে ঠিক বলতে পারব না। সাত আট এ রকমই হবে। জন্মের পর যখন সামান্য জ্ঞান হল, দেখতাম বাবা আমার মাকে ভীষণভাবে মারধোর করত। কারণ বা অকারণ, কি জন্যে যে মারতো তা বুঝতাম না। এমন কোনও দিন ছিল না যেদিন মা আমার বাবার হাতে মার খায়নি। এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারতাম না। বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে মা একা একা বসে কাঁদতেন। মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতাম আমিও। ক্রোধ হত বাবার উপরে। তখন তো আমি বাচ্চা, কিছু করতে পারতাম না, পারতাম না কিছু বলতে।

কথাটুকু শেষ হতেই চোখদুটো জলে ভরে উঠল সাধুবাবার। তাকিয়ে থাকতে পারলাম না মুখের দিকে। নিজেরই কেমন যেন একটা অস্বস্তির সৃষ্টি হল। তবুও বললাম একটু অপেক্ষা করে,

– বাবা, আপনি তো সাধু। সংসারের কোনও বন্ধন নেই। যা কিছু সুখ দুঃখ তার বাইরেই আপনার জীবন। আর আপনি কাঁদছেন? আপনার ভিতরেও গৃহীদের মতো এত মায়া!

এবার চোখ থেকে টপটপ করে জল নেমে এল গাল বেয়ে। একটু ধরা গলায় বললেন,

– বেটা, সাধু হয়েছি বলে কি কাঁদতে নেই? ভগবানের জন্যে চোখের জল ফেলতে পারি আর দুঃখিনী মায়ের জন্যে পারব না? পৃথিবীতে মা ছাড়া সন্তানের আপন কে আছে? কেউ নেই, কেউ হতেও পারে না। আর মায়ার কথা বলছিস?

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

– মায়া আমার নেই রে! মায়া থাকলে কি আর মাকে ফেলে বেরোতে পারতাম! বেটা, মায়া জাগতিক ও পারমার্থিক দুরকমের আছে। জাগতিক বা পার্থিব মায়া সৃষ্টি করে বন্ধন। আর ত্যাগের সৃষ্টি করে অপার্থিব বা পারমার্থিক মায়া। মায়া ভগবানেরও আছে—আছে বলে তিনিও কষ্ট পান তাঁর ভক্তের জন্য। কেন জানিস, ভক্ত ধর খুব কষ্টে আছে অথচ ভগবান ছাড়া সে কিছু জানে না। কিন্তু কর্ম এমন যে, ভক্তের কষ্ট তাঁকেও সহ্য করতে হয় নির্বিকার হয়ে। ভক্তের জন্য ভগবানের যে কষ্ট, এটাও জানবি মায়া তবে অপার্থিব। ভক্তের উপর ভগবানের মায়া। এ মায়ায় ত্যাগ সৃষ্টি হয় ভক্তের। তাঁর নজরটা তার উপরে থাকে বলে। আর তা থাকে বলেই তো ভক্তের পিছনে পড়ে থাকে ভগবান মুক্তি দেয়ার জন্য। বেটা, একেবারে সত্য এ সব কথা। চামড়ার চোখে দেখা যায় না বলে কেউ বিশ্বাস করবে না।

যত শুনছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি সাধুবাবার কথায়। চুপ করে রইলেন খানিকটা সময়। পূর্বপ্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে দিতেই বললেন,

– প্রতিদিন এইভাবে দেখতাম মায়ের উপর অত্যাচার। ক্ষমতা ছিল না যে প্রতিবাদ করি। ধীরে ধীরে কেমন একটা বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হতে লাগল মনে। একদিন বাবা বেদম মার মারলেন মাকে। এ মার চোখে দেখা যায় না। সংজ্ঞা হারিয়ে মা আমার লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। ছুটে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। ব্যস, তারপর আর ফিরে যাইনি ঘরে।

গৃহত্যাগের কাহিনি শুনে মনটা ভরে উঠল অস্বস্তিতে। সাধুজীবনে এসে সাধুবাবার মায়ের জন্য চোখের জল না পড়লে হয়ত সাধুজীবনটাই কলুষিত হত সাধুবাবার। দুজনে রইলাম কোনও কথা না বলে। মিনিটদশেক কাটল। বললাম,

– বাবার বয়েস কত হল এখন?

মলিনতার ছাপ পড়েছে মুখে। একটু ভেবে নিয়ে বললেন,

– বহুকাল হল ঘর ছেড়েছি, সেই ছেলেবেলায়। সে কি আজকের কথা, ঠিক বলতে পারব না বেটা।

বলে আবার ভাবলেন কয়েকমিনিট। বললেন,

– আন্দাজ ৮০/৮৫ বছর তো হবে।

জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাড়ি কোথায় ছিল? ঘর ছেড়ে বেরিয়ে প্রথমে গেলেন কোথায়?

চোখের ভিজে পাতা প্রায় শুকিয়ে এসেছে। দুহাতে মুছে বললেন,

– ঘর ছেড়ে তো বেরলাম। মনে শান্তি নেই। মায়ের কথা মনে করে শুধু কাঁদতাম আর কাঁদতাম। তখন একমাত্র সঙ্গীই আমার চোখের জল। এত কেঁদেছি যে পরে একটা সময় এল চোখের জল বোধ হয় আমার শুকিয়ে গেছিল। আর আসত না। কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। কাকেই বা বলব? একটা অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করতাম বুকের ভিতর। একে তো মনের এই অবস্থা, তার উপর থাকা খাওয়া ঘুম কোনওটারই তখন ঠিক ছিল না। সম্বল করেছি ভিক্ষাবৃত্তি। যা জুটতো তাই-ই খেতাম। এভাবেই চলতে লাগলাম অনিশ্চিত জীবন, অনিশ্চয়তার পথে। বাড়ি ছিল সাহারাণপুরে।

একটু থেমে ঘন একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তাকালেন মুখে দিকে। কোনও কথা না বলে রইলাম একইভাবে। সাধুবাবা বললেন,

– ধাক্কা খেতে খেতে একদিন গেলাম বৃন্দাবনে। প্রতিমুহুর্তে মায়ের করুণ মুখখানা ভেসে উঠত চোখের সামনে। অস্থির হয়ে ছটফট করতাম। এমন অবস্থায় কাটল প্রায় মাস আটেক। একদিন বসে আছে যমুনাতীরে গোঘাটে। মায়ের কথা ভাবছিলাম অন্যমনস্ক হয়ে। হঠাৎ দেখি এক জটাজুট সন্ন্যাসী এসে দাঁড়ালেন সামনে। মুহুর্ত দেরি করলাম না। অসহ্য যন্ত্রণায় ভেঙে পড়া মনটা তখন আমার ‘মন’-এ নেই। জড়িয়ে ধরলাম তাঁর পা-দুটো। কাঁদতে থাকলাম আকুল হয়ে। একটা কথাও সরলো না মুখ থেকে। পা-দুটো ছাড়লাম না। ধরে তুললেন আমাকে। বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘চল বেটা, তোকেই তো নিতে এসেছি। তোর দুঃখ কিসের? আমি তো আছি’।

আর কোনও কথা নয়। সঙ্গী হলাম সন্ন্যাসীর। একটা নেংটি দিলেন তিনি। পুরনো ছেঁড়া নোংরা পোশাক ছেড়ে নিলাম নেংটি। এলাম বৃন্দাবন থেকে হরিদ্বারে। তারপর হাঁটাপথে হরিদ্বার থেকে গেলাম রুদ্রনাথে। তখন ওপথ ছিল বড় কঠিন দুর্গম। এখনকার মতো এত লোক সমাগম ছিল না। রুদ্রনাথে কয়েকদিন থাকার পর দীক্ষা দিলেন সেই সন্ন্যাসী। তিনিই আমার পূজনীয় গুরুজি। দীক্ষা রুদ্রনাথ মন্দিরে। দীক্ষার পরেই লোপ পেল অন্তরের সমস্ত বেদনা। স্থিতি এল মনের। একেবারে শান্ত হলাম।

অবাক হয়ে গেলাম সাধুবাবার কথা শুনে। কি অদ্ভুত পরিবর্তন! কি অকল্পনীয় যোগাযোগ! এর কি সত্যিই কোনও ব্যাখ্যা আছে? বিস্মিত মনে জানতে চাইলাম,

– তখনকার দিনে পথ ছিল দুর্গম। কেদারবদরীতে তো লোকজন কিছু যেত। রুদ্রনাথে তীর্থযাত্রী যেত না বললেই চলে। গেলেও তা ধরার মধ্যে নয়। তখন ওখানে খেতেন কি, থাকতেনই বা কোথায়?

চোখমুখে দেখলাম আগের অস্বস্তির ভাবটা কাটিয়ে উঠেছেন সাধুবাবা। প্রসন্ন মনেই বললেন,

– ওখানে গুহা ছিল অনেকগুলো। তার মধ্যে একটা ছিল গুরুজির। তিনি ওখানে থাকতেন, তপস্যাও করতেন। এসব জেনেছি অনেক পরে। ওই গুহাতে রয়ে গেলাম গুরুজি আর আমি। দীর্ঘ প্রায় সত্তরটা বছর কাটিয়েছি হিমালয়ে রুদ্রনাথের গিরিগুহায়।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *