Tuesday , August 20 2019
Just In
Varanasi
বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাটে বসে থাকা এক সাধু, নিজস্ব চিত্র

মানুষের মধ্যে কেন এত ক্ষোভ, এত দুঃখ, এত ব্যথা বেদনা, ব্যাখ্যা দিলেন সাধুবাবা

গুপ্ত গোদাবরী গুহার কিছুটা আগে দুধারে দোকানপাট, তারও একটু আগে যেখানে ভিখারিরা বসে ভিক্ষে করে, সেখানেই বসে আছেন এক বৃদ্ধ। সাধু না বলে পাগল বলাই ভাল। পাগল বলছি এই কারণে, বাইরে থেকে দেখলে একটা পাগলের যেসব লক্ষণ থাকে তার সব কটিই ফুটে উঠেছিল তাঁর দেহে। এটা মনে হল প্রথমদর্শনে। বহুবছর স্নান না করা মানুষ ধুলোময়লার মধ্যে শুয়ে বসে থাকলে দেহের যে দশা হয় এই বৃদ্ধের তেমনই। খালি গা। ময়লা জমে জমাট বেঁধে আছে। গাছের শুকনো বাকল যেন। নখ দিয়ে খুঁচিয়ে দিলে চকলা উঠে আসবে। গালভর্তি খোঁচাখোঁচা দাড়ি। ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো। পরনে ছেঁড়া এক টুকরো কাপড় নেমে এসেছে হাঁটুর কাছাকাছি। তেলকালি মোছার ন্যাকড়া যেন। সঙ্গে না লোটা, না কম্বল। কিছুই নেই। যাতায়াত করছে যাত্রীরা। কারও মুখের দিকে তাকাচ্ছেন মাঝেমধ্যে আবার মাথা নিচু করছেন। ভিক্ষে চাইছেন না কারও কাছে। বৃদ্ধ বসে আছেন আপনভাবে। অন্য ভিখারিদের তুলনায় ভাবে একটু স্বতন্ত্র। যেমন বেশ বোঝা যায় সম্ভ্রান্ত ঘরের বউ অনেক বউ-এর মাঝে।

গুহা থেকে ফেরার সময় হঠাৎ-ই নজর পড়ল। দাঁড়িয়ে গেলাম একটা দোকানের পাশে। লক্ষ্য করতে লাগলাম। আর একটু এগিয়ে গেলাম, কাছাকাছি। এবার চোখ পড়ল চোখদুটোয়। এমন চোখ কোনও পাগল বা সাধারণ মানুষের হয় না। দেবীচক্ষু। এ মুহুর্তে বয়েসটা আন্দাজ করতে পারলাম না।

তাঁকে যে গভীরভাবে লক্ষ্য করছি তা তিনি টের পেয়েছেন মনে হল। একবার তাকালেন আমার মুখের দিকে। কিছুটা অস্থির হয়ে উঠলেন বুঝতে পারলাম। ভাবলাম, দেখি ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে রইলাম। কাটল মিনিটদশেক। আরও যেন অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি। এক পাও নড়লাম না।

এবার দেখলাম বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। এখন ভাল করে লক্ষ্য করলাম চোখদুটো। অসম্ভব বড় আর ফালাফালা। কপালের উপর বেয়ে পড়া চুলগুলোতে প্রায় ঢেকে রয়েছে। চোখদুটো থেকে ঠিকরে যেন আলো বেরোচ্ছে। শান্ত চোখ অথচ স্থির। আরও একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলাম, চোখের পলক পড়ছে অনেকক্ষণ পর একবার।

ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। তাও প্রায় আধঘণ্টা। এবার ঝট করে উঠে তিনি হাঁটা ধরলেন। পিছু নিলাম কিছুটা তফাৎ রেখে। কিছুদূর যাওয়ার পর একবার দেখলেন পিছন ফিরে। দেখলেন পিছন ছাড়িনি, আছি। চলার গতি বাড়িয়ে দিলেন আরও। বাড়ালাম আমিও। চললেন আরও কিছুদূর। আবার তাকালেন পিছন ফিরে। দেখলেন আছি।

এখন একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়লাম দুজনে। গতি কমালেন বৃদ্ধ। একটু বাড়িয়ে দিলাম আমি কাছাকাছি হওয়ার জন্য। হলামও। এবার একেবারে পাশাপাশি। কোনও কথা বলার আগেই বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন,

– তু মেরা পিছু লিয়া কিঁউ?

শান্ত ও বিনীতভাবে বললাম,

– দেখলাম আপনি তো কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠলেন আমাকে দেখে। তারপরেই তো উঠে হাঁটা ধরলেন। আমিও এলাম পিছন পিছন।

পাগল যে এইভাবে কথা বলবে ভাবিনি। প্রথমে চোখদুটো দেখামাত্রই যে ধারনা হয়েছিল এখন দেখলাম ঠিক। পাগল নয়। খুব উচ্চমার্গের সাধু হবে নইলে চোখদুটো এমন হবে কেন, পলকই বা পড়বে কেন অত দেরি করে। এবার আরও ঝাঁঝিয়ে উঠলেন,

– ঠিক আছে, ‘ভাগ’ এখন।

মনে মনে ভাবলাম, ভাগ ভাগ বললেই কি আর ভাগি! বললাম,

– চলুন না বাবা, একটু বসি কোথাও।

স্বামীর আয় কম। একপাল বাচ্চা ছোটছোট। প্রত্যেকেই ভুগছে রোগে। বই-এর ধারে কাছে কেউ যায় না। মারামারি করছে সর্বদা। দেখার কেউ নেই। সামলাতে হচ্ছে মাকে। এমন বিরক্ত মা যেভাবে খিঁচিয়ে ওঠে সন্তানদের, ঠিক তেমনভাবেই খিঁচিয়ে বললেন,

– আমার সঙ্গে তোর কি দরকার? বসতেই বা যাব কেন, যাহ্‌! আমার পিছু ছাড়।

এ কথায় কোনও আমলই দিলাম না। বাঁকা কথা বললে সব পণ্ড হয়ে যাবে। তাই বিনীত, আরও বিনীত কণ্ঠে বললাম,

– আপনার কি কোনও ক্ষতি করছি আমি?

সাধুবাবার কণ্ঠে আগের তীব্রতার এতটুকুও কমল না। তিনি একই সুর, একই বাচনভঙ্গিতে বললেন,

– তু কুছ নেহি কিয়া, লেকিন ছোড় মেরা পিছু।

আর কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলেন। আমিও চললাম সঙ্গে সঙ্গে। কিছুদূর যাওয়ার পর দাঁড়িয়ে গেলেন। কটমট করে তাকিয়ে বললেন,

– তুই তাহলে পিছু ছাড়বি না, দেখবি তাহলে?

একটা কথাও বললাম না। ওইভাবে তাকানোয় দেহটা আমার শিহরিত হয়ে উঠল। ভাবলাম, ছেড়েদি। যাকগে যেখানে খুশি। আবার ভাবলাম, ইনি হয়ত উচ্চমার্গের কোনও সাধু। আমার মনের ভাব অবগত হয়েছেন। অনেক প্রশ্ন করব। তিনি বলতে চান না। তাই সরে পড়ার চেষ্টা করছেন।

অতএব যা হয় হবে। ছাড়ব না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এবার উত্তেজিত হয়ে বললেন,

– শালা কুত্তা কা বাচ্চা, তু নেহি ছোড়েগা মেরা পিছু?

কোনও কথা না বলে ঝট করে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। এত দ্রুত করলাম যে, বলার বা বাধা দেয়ার সুযোগই পেলেন না সাধুবাবা। এতে বেশ কাজ হল, যেন জল পড়ল আগুনে। শান্ত হলেন মুহুর্তে। মুখের ভাবটারই গেল পরিবর্তন হয়ে। আর একটু এগিয়ে গেলেন। বসলেন পথের ধারে একটা গাছের নিচে। বসলাম আমিও। লোক চলাচল করছে। অনেকেই দেখতে দেখতে যাচ্ছে। কয়েক মিনিট বসে রইলাম দুজনে। কোনও কথা বললাম না। সাধুবাবাই বললেন,

– কি ব্যাপার বলত! আমার সঙ্গে তোর কি দরকার?

মাথাটা নিচু করেই বললাম,

– বাবা, আপনার বাহ্যিক চেহারাটা দেখে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল আপনি বোধ হয় পাগল নইলে ভিখারি। পরে চোখদুটো দেখে মনে হয়েছে উচ্চমার্গের সাধক আপনি। তাই আপনার পিছু…

শেষ হতে দিলেন না কথাটা। রাগত কণ্ঠেই বললেন,

– চুপ, আর ও কথা মুখেও আনবি না। সাধক – হুঁ!

ও কথায় আর না গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,

– এই তীর্থে আছেন কত বছর?

সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

– কেন বলত?

ছোটবেলার কথা। অনেক সময় পড়া না করেই ইস্কুলে যেতাম। মাস্টারমশাই পড়া ধরতেন। পারতাম না। কিছু বললে মাথাটা নিচু করে থাকতাম। ভাবটা এমন যেন কত লজ্জাই না পেয়েছি! আসলে লজ্জা বা দুঃখ কোনওটাই ছিল না তখন। ফাঁকিবাজ আর কথার খেলাপকারীদের থাকে না ওটা। এমনটা করতাম যাতে আর কিছু না বলেন। ঠিক ইস্কুলের কায়দায় বললাম,

– তেমন কিছু নয়। এটা আমার কৌতূহল বলতে পারেন।

কথাটা শেষ করতেই বললেন,

– তোর এসব জানার দরকার নেই। এখন তুই যেতে পারিস।

কিছুতেই বাগে আনতে পারছি না সাধুবাবাকে। ধৈর্য হারালাম না। ভাবলাম, প্রশ্ন করলে এখন বেয়ারা উত্তর দেবে। বলার সুযোগটা দিতে হবে সাধুবাবাকে নইলে কথা হবে না। বিড়ি রয়েছে পকেটে। দিতে সাহস পাচ্ছি না। চুপ করে বসে থাকাটাই ভালো মনে হল। দেখা যাক কি হয়! আর কোনও কথা বললাম না। সাধুবাবা বেশ ভালো করে লক্ষ্য করছেন আমাকে। কেটে গেল প্রায় কুড়িমিনিট। এবার মুখ খুললেন,

– বেটা থাকিস কোথায়?

কণ্ঠস্বর শুনে একেবারে চমকে উঠলাম। মানুষের কণ্ঠস্বর এত করুণা ঢালা হতে পারে, এ না শুনলে কারও বিশ্বাস হবে না। এতক্ষণে খুশিতে ভরে উঠল মনটা। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেল। সাধুবাবার দেহ থেকে ভুরভুর করে বেরোতে লাগল চন্দনের গন্ধ। হাতটাও আমার গন্ধেতে ভরে গেল। বললাম,

– বাড়ি আমার কলকাতায়। বেরিয়েছি ভ্রমণ ও সাধুসঙ্গ করতে। আপনাকে দেখে মনে হল আপনি সাধু তাই আর পিছন ছাড়লাম না।

কথাটা শুনে হাসিতে ভরে উঠল মুখখানা। ভাবটাই কেমন যেন পাল্টে গেল। খুশিভরা মুখে বললেন,

– অনেক ঘুরেছিস?

‘হ্যাঁ’ বললাম ঘাড় নেড়ে। মুহুর্তের মধ্যে সাধুবাবাকে যেন আরও বেশি প্রসন্ন বলে মনে হল। ভাবের কি অদ্ভুত পরিবর্তন। চুপ করে রইলেন মিনিটখানেক। কিছু একটা ভেবে মাথাটা একটু দোলালেন। পরে বললেন,

– বহুদিন হল এখানে আছি। কতদিন ঠিক বলতে পারব না।

জানতে চাইলাম,

– বাবা এমন নোংরা অবস্থায় থাকেন কেন আপনি, নিজেকে কি গোপন করার জন্য?

তীর্থযাত্রীরা যাতায়াত করছে, আছে গ্রাম্য কিছু লোকও। তাদের দিকে তাকিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললেন,

– বেটা, কিছু থাকলে তো মানুষ কিছু গোপন করে। আমার তো কিছু নেই রে। আর এমনভাবে থাকি কেন জানিস? গুদামে অবহেলায় পড়ে থাকা চিনি পিঁপড়েতে ছোঁয় না। যত্নের চিনিতে পিঁপড়ে লাগে বেশি, সেইজন্যে।

বুঝে গেলাম, এখন প্রশ্ন করলে উত্তর পাব। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা মানুষের মধ্যে এত ক্ষোভ, এত দুঃখ, এত ব্যথা বেদনা কেন বলতে পারবেন? এর থেকে মানুষ কি মুক্তি পেতে পারে না, পেতে পারে না কি এতটুকু শান্তি?

মুখের দিকে তাকালেন। মুহুর্তমাত্র না ভেবেই বললেন,

– বেটা, পৃথিবীটা চলছে তার আপন নিয়মে, আপন গতিতে। ক্ষুদ্র মানুষ এই বিশাল পৃথিবীটাকে তার নিজের ‘ভাব’-এ নিজের নিয়মে, নিজের মতো করে নিয়ে চলেছে। এতে চলার পথে তার বাধা আর ধাক্কা আসছে অবিরত, ফলে ক্ষোভ দুঃখ হয়ে উঠেছে অনিবার্য। তাই এর থেকে মানুষের মুক্তি নেই, শান্তিও নেই।

জিজ্ঞাসা করলাম,

– আপনার মতো যাঁরা, আপনাদের মতো যাঁরা, তাঁরাও তো মানুষ। তাঁদের কেন এমন হয় না?

সাধারণভাবে উত্তর দিলেন,

– সংসারের সব ছেড়ে অথবা থেকেও যারা পৃথিবীর নিয়মেই গা ভাসিয়ে চলেছে, তারা অপ্রতিহত। তাদের আনন্দময় জীবনে কোনও সংঘাত নেই। তারা যে আপন করে নেয়নি পৃথিবীটাকে। এ পথে এসেও যারা অজ্ঞানতাবশত কখনও নিজের করে নিতে চেয়েছে, তারা আর পাঁচজনের মতোই মুক্ত হতে পারছে না পার্থিব ক্ষোভ দুঃখ ও বেদনা থেকে।

এবার উদাহরণ দিয়ে বললেন,

– যেমন ধর, সংসার ছেড়ে এল কেউ সাধুজীবনে। কিছুকাল পর তার আত্মপ্রতিষ্ঠার চিন্তা ঢুকল মাথায়। আশ্রম করব। সকলে মানবে। এমন শত চিন্তা। এসব যখনই ঢুকল মাথায় তখনই তার চলা শুরু হল নিয়মের বাইরে। অনিয়মে সুখ নষ্ট, শান্তিও নষ্ট। আরে বাবা কেউ যদি না মানে তাতে কি যায় আসে? কেউ যদি মানে তাতেই বা কি আসে যায়! এসব কি তুই সঙ্গে নিয়ে যাবি?

প্রশ্ন করলাম,

– এ তো বললেন সাধুদের কথা। সংসারী যারা তাদের তো প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন, প্রয়োজন জাগতিক বিষয়গুলোরও।

সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়েও মুখে বললেন,

– প্রয়োজন তো বটেই, তবে সংসারীদের প্রয়োজনের কোনও শেষ নেই। তার শেষ কোথায়, কারোরই তা জানা নেই। যার প্রয়োজন সে তো নিজেও জানে না তার কতটুকু প্রয়োজন। সংসারে বাঁচার জন্য সব কিছুরই প্রয়োজন আছে তবে তার ব্যবহারিক তারতম্যও তো আছে। ফলে যখন পৃথিবীর নিয়মের সঙ্গে তারতম্য হচ্ছে যেকোনও বিষয়, বস্তু বা চিন্তা নিয়ে, তখনই আসছে অশান্তি, ক্ষোভ দুঃখ। এ থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন। যারা মুক্ত হতে পেরেছে, যারা পারছে, তাদের সংখ্যা নেহাতই কম।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *