Friday , September 20 2019
Kumbh Mela
দিনের আলোয় ঝলমল করছে ত্রিবেণীসঙ্গম

জীবনে বিভিন্ন রিপুর তাড়না থেকে মুক্তির উপায় জানালেন সাধুবাবা

সাধুবাবার জীবনপ্রসঙ্গে জানতে চাইলাম,

– বাবা, ছোটবেলা থেকে কিভাবে বেড়ে উঠলেন, যখন জ্ঞান হল তখন কিভাবে চললেন, গুরুজি কি শেখাতেন আপনাকে, সকাল থেকে সারা দিন-রাত কি করতেন, কেমন করে কাটাতেন, এ বিষয়ে দয়া করে কিছু বলবেন, যাতে সংসারে থেকে চেষ্টাচরিত্র করে যদি কিছু আয়ত্ত করতে পারি।

বেশ মন দিয়ে শুনলেন কথাগুলো। কথা হচ্ছে তবে নিজের খুব অস্বস্তিও হচ্ছে। না পারছি বিড়ি খেতে, না পারছি খাওয়াতে। এক ভাঁড় যে চা খাব তারও উপায় নেই। একটা দোকান নেই কাছাকাছি যে ছুটে গিয়ে একটু চা নিয়ে আসি। সাধুবাবা প্রশান্তচিত্তে বলতে শুরু করলেন,

– বেটা, আমি যখন বুঝতে শুরু করলাম তখন বয়েস বছর কয়েক হবে। সেই সময় গুরুজি বেনারস ছেড়ে আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পরলেন তীর্থদর্শনে। চলতে লাগলাম এক তীর্থ থেকে আর এক তীর্থে। খুব বিশেষ প্রয়োজন না হলে গুরুজি ট্রেন বা বাসে উঠতেন না। ‘পয়দল’ চলতাম। ভিক্ষাই ছিল আমাদের বৃত্তি তবে আমাকে একা কখনও ছাড়তেন না। সারাদিন ও রাতে আমরা একবার মাত্র আহার করতাম। নিরামিষ আহার, কিন্তু কোনও কিছুতে ‘নিমক’ ব্যবহার করতাম না। গুরুজি বলতেন নিমকে দেহের তেজ নষ্ট করে রজোগুণ বাড়িয়ে দেয়। আহার করতাম সন্ধ্যার পর। শীত গ্রীষ্ম বর্ষাতে তিনবার স্নান ছিল বাঁধা।

একটানা একটু বলে থামলেন। জিরিয়ে নিয়ে আবার বলতে লাগলেন,

– গুরুজি একটা মন্ত্র দিয়েছিলেন আমাকে। বলেছিলেন চলাফেরায় সবসময় যেন জপ করি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা কথাও যেন না বলি। কারণ তিনি বলতেন, কথায় শক্তিক্ষয় হয়। যত কথা কমবে তত মনের শক্তি বাড়বে। অতিরিক্ত বাক্যব্যয়ীদের মানসিক শক্তি খুব কম হয়। আমি জপ ছাড়া আর কিছু করতাম না। যখন কোথাও বিশ্রামের জন্য বা গুরুজি রান্না করতেন কিংবা খাওয়ার পর। একসঙ্গে বসলে তিনি জপ করতে নিষেধ করতেন। সেই সময় তিনি সহজ সরলভাবে শাস্ত্রের কথা গল্প করে শোনাতেন। ভারতের অসংখ্য সাধক মহাত্মাদের জীবনী বলে তাঁদের পথ ও মতকে নিজেরও একই মত স্বীকার করে নিয়ে আমাকে সেই পথই অনুসরণ করতে বলতেন।

জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, আপনার গুরুজির ডেরা কোথায় ছিল, থাকতেন কোথায়?

স্বাভাবিকভাবে বললেন,

– আমার গুরুজির কোনও ডেরা ছিল না, আমারও নেই। বেটা, এত বড় দেশে ছোট্ট এই দেহটাকে একটু গড়িয়ে নেওয়ার জায়গার কি সত্যিই অভাব আছে বলে তোর মনে হয়? জন্মের পর মানুষের প্রথম ডেরা তো মায়ের কোল। সেটা নির্দিষ্ট করেই ভগবান পৃথিবীতে পাঠান। বনের পশুদের আশ্রয়ের অভাব হতে দেখেছিস কোথাও?

মাথাটা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। মুখে কিছু বললাম না। চমৎকার উদাহরণ দিলেন আশ্রয়ের প্রশ্নে। বললাম,

– বাবা, সাধুজীবনে সারাদিন-রাত আর কি কি করতেন?

সাধুবাবা একটু এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,

– এইভাবেই আমার দিন কেটে যেত গুরুজির সঙ্গে।

জানতে চাইলাম,

– লোকালয়ে চলাফেরা করতেন তাতে জপের কোনও বিঘ্ন হত না?

মাথাটা সজোরে নাড়িয়ে বললেন,

– না না বেটা, জপের কোনও বিঘ্ন হত না, আজও হয় না। জপ তো করে মন, বিঘ্ন হবে কেন? আমার থাকার চিন্তা নেই, খাওয়া বসার চিন্তা নেই, চিন্তা নেই জাগতিক কোনও কিছু চাওয়া পাওয়ার, সুতরাং সাধনে বিঘ্ন হবে কেন? মানুষের সাধনপথের প্রথম অন্তরায়ই তো বাসনা। ওটা যার নেই তার সাধনভজনে মন না বসার কোনও কারণ নেই। কিন্তু বেটা মহামায়ার এমন খেলা যে মানুষকে মায়াবদ্ধ করেই সংসারে পাঠান। এ থেকে কেটে বেরিয়ে আসা খুব একটা সহজ কাজ নয়, অবশ্য তিনি যদি কাটিয়ে দেন তো আলাদা কথা।

জানতে চাইলাম,

– বাবা, আমরা সকলের মায়া কথাটা শুনি এবং লোককে জ্ঞান দেয়ার সময় নিজেও বহুবার বলে থাকি। ভাসা ভাসা একটা ভাবের উপর অর্থ করে নিয়ে বলি। আপনি একটু দয়া করে বলুন না, মায়া শব্দের প্রকৃত ও অন্তর্নিহিত অর্থ কি?

কথাটা শুনে মুখে একটু হাসির রেখা ফুটে উঠল। মনে হল বেশ খুশি হলেন। আমি বহুবার বহুক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, অক্ষরজ্ঞানহীন সাধুমহাত্মাদের কাছে সামান্য স্কুলকলেজের বিদ্যার অহংকারে গর্বিত মনটা যখন অজ্ঞানতার কথা স্বীকার করে সাধুদের কাছে মাথাটা নত করেছে, তখনই দেখেছি তারা আনন্দিত হয়েছেন, আমার জানাও হয়েছে অনেক অজানা বিষয়। সাধুবাবা বললেন,

– হাঁ বেটা, অনেক কথার অন্তর্নিহিত প্রকৃত অর্থ ও সত্য না বুঝে আমরা সেই শব্দ ব্যবহার করে থাকি। সেটা বহুবারই করে থাকি। এটা মানুষের স্বভাবদোষ, এতে কোনও দোষ নেই। মানুষ সারাদিনে যত কথা বলে তার প্রায় সবটা বলতে হয় তাই বলে, না বুঝে বলে, যেটুকু বলে তা শব্দের ভাবের উপর ভিত্তি করেই বলে, যার প্রকৃত অর্থ জানা নেই। বেটা, সব যদি বুঝে বলত তবে মানুষ কোনও কথাই বলতে পারত না। সেইজন্য কথা কম বলতে হয়। তাতে মন সংযম হয়, মনের শক্তি বাড়ে, মন আনন্দে থাকে।

এবার হাসতে হাসতে বললেন,

– এখন বলি তোর মায়ার কথা। এই মায়ার সঙ্গে আরও একটা কথা যুক্ত হয়ে আছে সেটা মহামায়া। বিশেষভাবে মায়া বিস্তার করে যিনি এই বিশ্বসংসার রচনা করেছেন তিনিই মহামায়া। আর বেটা অজ্ঞানতাজনিত মনের বদ্ধতাকেই মায়া বলে।

হিন্দিভাষী সাধুবাবার কথাগুলো ধরে বুঝে নোট করতে বেশ সময় লেগে যাচ্ছে। বোঝার জন্য একই কথা অনেক সময় দুবার তিনবার করে জিজ্ঞাসা করছি, তবুও তাঁর বিরক্তি নেই। জানতে চাইলাম,

– বাবা, আপনি বললেন ‘অজ্ঞানতাজনিত মনের বদ্ধতা’ – অজ্ঞানতা বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?

এবার একটু সামনে পিছনে দুলতে দুলতে বললেন,

– বেটা, পৃথিবীতে এসে অতিক্ষুদ্র থেকে অতি বৃহৎ পর্যন্ত সবকিছুকে আমার করে দেখাকেই ‘অজ্ঞানতাজনিত মনের বদ্ধতা বা মায়া বলে, যা মহামায়ারই রচনা। মানুষকে একসময় চলে যেতেই হবে অথচ তা ভাবে না বলেই সবকিছুকে নিজের বলে ভাবে। এটাই অজ্ঞানতা। যার মধ্যে ‘আমার’ ভাবটা কাটলো, তখনই জানবি মহামায়ার মায়াটাও কাটলো।

সাধুসঙ্গ করার সময় প্রশ্নের কোনও ঠিক থাকে না। যখন সেটা মাথায় আসে সেটাই করে ফেলি। এবার আচার বিচারের প্রশ্ন এল মাথায়। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, যদি দোষ না নেন তো একটা কথা বলি।

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতে বললাম,

– আপনি তো একটু আগে বললেন ভিক্ষাই আপনার বৃত্তি। ভিক্ষালব্ধ খাবার দিয়ে আপনি দেহটা রক্ষা করে চলেছেন। অনেক সাধুসন্ন্যাসী আমাকে বলেছেন, কারও এঁটো খাবি না, কারও হাতের কোনও খাবার খাবি না। এসব কথা স্মৃতিশাস্ত্রে আছে। আমি নিজেও পড়েছি। সংসারে থেকে এসব কথা মেনে চলা যে অসম্ভব তা আপনিও বোঝেন। যারা পারে তাদের সংখ্যা যে করগুনে বলা যায় সেটা ভালোভাবে জানেন। আমার জিজ্ঞাসা, আপনি সাধু হয়ে যে বৃত্তি গ্রহণ করেছেন তাতে তো নিজেই বারোজনের হাতের ছোঁয়াছুঁয়ি খাচ্ছেন, এতে কি কোনও দোষও হচ্ছে না? সংসারে থেকে আমাদের কি করা উচিত, এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?

সাধুবাবা মন দিয়ে কথাগুলো শুনলেন। মিনিটখানেক বসে রইলেন চুপ করে। পরে শুরু করলেন বেশ গম্ভীরভাবে,

– হাঁ বেটা, সাধুরা যা বলেছেন আর তুই শাস্ত্রে যা পড়েছিল সবই ঠিক। তবে এখানে কিছু কথা আছে। যেকোনও খাদ্যদ্রব্য কিনে খেলে দোষ হয় না। অর্থের বিনিময়ে অথবা শ্রমের বিনিময়ে খাদ্যদ্রব্য গ্রহণেও কোনও দোষ হবে না। একেবারে হবে না বললে একটু মিথ্যাই বলা হবে। তবে দোষের অনেক উপশম হবে, মাত্রা কমে যাবে কিন্তু একটু হবে। দোষটা কি? বেটা, স্পর্শজনিত কারণে অতি সূক্ষ্মভাবে কামনাবাসনা ও রিপুর প্রভাব সংক্রামিত হয় অন্যের স্পর্শ করা খাবার খেলে। স্পর্শকারীর রিপুর তারতম্য ভেদে সংক্রামিত বিষয়টার হেরফের হয় মাত্র। এতে মনের অস্থিরতাও বাড়ে। শুধুমাত্র দীক্ষিত নারীপুরুষ ও সাধনভজনশীলদের হাতের খেলে দেহমনে তত বিরূপ প্রভাব পড়ে না। সেখানে তুই মূল্য দিয়ে খাস বা না খাস। যেকোনও ব্যক্তির গুরু বা ইষ্টের নিবেদিত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণে কোনও দোষের কিছু নেই। এছাড়া যতটা সম্ভব অন্যের হাতের খাবার, বিশেষ করে রান্না করা খাবার না খাওয়াই ভালো যদি সাধনপথে এগোতে চাস। এখানে বেটা আর একটা কথা আছে, যেকোনও দেবদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্যবস্তুকে আমরা প্রসাদ বলি, তা যে কেউ দিক না কেন, পাওয়ামাত্র ইষ্টকে স্মরণ করে গ্রহণ করতে হয়। প্রসাদে তাঁরই গ্রহণজনিত শক্তি নিহিত থাকে তাই কোনও স্পর্শ দোষ হয় না। সেখানে যদি স্পর্শের কথা ভেবে প্রসাদ ফিরিয়ে দিস তাহলে ভগবানের শক্তিকে ছোট করেই তা করা হবে, দেখাও হবে। প্রসাদে আর প্রসাদস্পর্শকারীর কোনও বিচার করতে নেই, সে দীক্ষিত বা সাধনভজনশীল হোক বা না হোক।

এই পর্যন্ত বলে থামলেন। সাধুবাবা যেমন আমার কথা শুনছেন মন দিয়ে, আমিও শুনছি তেমনই। প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিলেও একটার উত্তর বেশ সুন্দরভাবে এড়িয়ে গেলেন বুঝলাম। আমার কাছে যে পার পাওয়ার উপায় নেই তা সাধুবাবার চেয়ে অনেক বেশি নিজেই জানি। বললাম,

– বাবা, একটা কথা কিন্তু এড়িয়ে গেলেন। আপনি যে বারোজনের ছোঁয়াছুঁয়ি খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করেছেন তাতে কি কোনও ক্ষতি হয় না, ওতে কি স্পর্শদোষ নেই?

এ প্রশ্নে একঝলক হাসি মুখে ফুটে উঠে তা মিলিয়ে গেল মুহুর্তে। একটু নিচু অথচ বেশ গম্ভীরসুরে একটা কথাই শুধু বললেন,

– বেটা, ভিতরে গুরুশক্তি এসে গেলে তখন কোনও বিচার না করেই সব খাওয়া ও গ্রহণ যায়।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *