Tuesday , June 19 2018
Haridwar

মানুষ সাধু হয় কেমন করে – এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাধুর কথা – শিবশংকর ভারতী

১১ জুলাই বুধবার ২০১০। আজ সারাদিন ধরে হরিদ্বারের আনাচে কানাচে গেরুয়ায় সাধু দেখলাম অসংখ্য তবে চোখদুটো সাধুর নয়। কাম ও বাসনায় ভরা চোখ। এদের দেখে মনে পড়ে গেল হরিদ্বারে ১৯৭৮ সালে মে মাসের এক সাধুবাবার কথা। স্টেশন থেকে বেরোতে যাব হঠাৎ চোখে পড়ল প্লাটফরমের একেবারে শেষের দিকে। এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, বৃদ্ধ এক সাধুবাবা বসে আছেন হাঁটুমুড়ে। মুখে বিড়ি। খালি গা। শ্যামবর্ণ নয় তবে খুব যে উজ্জ্বল, তাও নয়। পরনে গেরুয়া কাপড় তেলচিটে মারা। মাথায় জটা নেই তবে তেল না দেওয়ার ফলে লালচে চুলগুলো যেন জটা বাঁধার আশায় সমানে লড়াই করে চলেছে। মুখে বড় বড় দাড়ি, তবে ঘন নয়। প্লাটফরমের পাশে রেলিং-এ গায়ে তার গাঁটওয়ালা লাঠিটাকে এমনভাবে রেখেছে, মনে হয় যেন কোনও ব্লাডপ্রেসার রুগী ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। পাশে ছোট্ট একটা ঝুলি। হয়তো বা কিছু দরকারি জিনিসপত্র আছে। তা থাক, আমার দরকার নেই। আমার দরকার সাধু। মোটের উপর সাধু হলেই হল। প্রণাম করে পাশে বসলাম অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে। এক ঝুড়ি কথা নিয়ে। সাধুবাবা নীরব। নীরবতা ভাঙলাম আমি,

– সাধুবাবা?

সঙ্গে সঙ্গেই বললেন,

– কহো বেটা।

– আপকা ডেরা কাঁহা বাবা?

একথায় তাকালেন আমার মুখের দিকে। তারপর হাতের বিড়িটায় একটা সুখটান দিয়ে বললেন,

– মেরা তো কাহি ডেরা নেহি হ্যায়। সাধুলোগ তো রমতে হুয়ে পানি হ্যায়। ইয়ে তো মুঝকো ভি পতা নেহি হ্যায়। যব যহাঁ যাতা হু, ওহি মেরা ঘর হো যাতা হ্যায়।

কণ্ঠস্বর গম্ভীর। সারামুখে একটা হাল্কা হাসির প্রলেপ। এবার সাধুবাবা বিড়ির শেষাংশটা ফেলে দিলেন। আমি একটা বিড়ি ধরিয়ে হাতে দিলাম। মুখটা দেখেই বুঝলাম বেশ খুশি হলেন। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, আপকা চলতা ক্যায়সে?

প্রসন্ন মনেই উত্তর দিলেন,

– গুরু মহারাজ কি কৃপাসে।

– আপ ক্যা ভিখসা করতা?

বিড়িতে ফুকফুক করে টান দিলেন বার তিনেক। তারপর হাসিমুখেই বললেন,

– বেটা, সাধুলোগ কা তো কামই হ্যায় ভিখসা মাঙনা। ম্যায় তো কমাতা তো হুঁ নেহি। যব যাহা যো কুছ মিল যাতা, ওহি ভোজন কর্ লেতা হুঁ।

নিভে এল বিড়িটা। টান দিলেন বার কয়েক। পরে বললেন,

– ম্যায় তো বেটা এ্যায়সা হি হুঁ। লেকিন বেটা, আজকল তো সাধুয়ো মে ভি পরিবর্তন আ গয়া হ্যায়। তু তো বেটা লিখাপড়া হ্যায়। মুঝসে তু জাদা সমঝতা ভি হ্যায়। ফির ভি ম্যায় তুঝে থোড়া বহুত বতাতা হুঁ। আজ সে কুছ সাল পহলে ভি যব তু ছোটা থা, সাধুয়ো কো বড়া সম্মান কিয়া যাতা থা। বস্ওয়ালে ভি চলতি বস্ রোককে রাহ চলতে হুয়ে সাধু কো পহলে প্রণাম করতে থে অউর হাতজোড় কর পুছতে থে, আপ কাঁহা যায়েঙ্গে? ম্যায় আপকো পহুঁচা দেতা হুঁ। লেকিন বেটা, আজকল তো সাধুলোগ কুত্তে কি তরহ হো গয়ে হ্যায়। ক্যা বাতায়ু বেটা, আজকল তো সাধুলোগ গাঁওমে পরিবার রখকে আতে হ্যায় অউর সাধুকা ভেক পকড় কর রুপেয়া কমাতে হ্যায়, অউর ফির ঘর ভেজতে হ্যায়। তুম মেরি বাতো কি সাচ্চাই অগর পরখনা চাহতে হো তো হৃষীকেশ চলে যাও অউর খুদ আপনি আঁখো সে দেখ বাতানুকূল কমরে মে সাধু মহারাজ আরাম সে বয়ঠে হুয়ে মৌজমস্তি কর রহে হ্যায়। ক্যা তুম উসকো আপনে আত্মা সে সাধু কহোগে ইয়া ভোগী?

আজ সকাল থেকে হরিদ্বারে ‘হর কি পেয়ারি’ দিয়ে গঙ্গার জল অনেকটাই বয়ে গেছে তবে আমার মনের ইচ্ছা এখনও পূরণ হয়নি।

হরিদ্বারে গঙ্গা আমাকে কখনও বিমুখ করেনি। না চাইতে সব দিয়েছে আর দু-একটা সাধু জুটিয়ে দেবে না, তাই কখনও হয়। শ্রাবণীমেলায় অসংখ্য মানুষের গিজগিজে ভিড়ের মধ্যেও চোখ পড়ল গেরুয়ার উপর। মাথায় গেরুয়া পাগড়ি। গেরুয়া জামা গায়ে। বাউল কায়দায় পরা গেরুয়া কাপড়। চুল দাড়ি সব সাদা। বহু বছর পর আজ একজন ফরসা সাধু পেলাম। উচ্চতা পাঁচ ফুটের কাছাকাছি। কপালে তিলক টিলক কিছু নেই। ছোট্ট ঝোলা আর এক চিমটে ছাড়া কাছে আর কিছু নেই।

সাধুবাবা কোথাও যাচ্ছিলেন হয়তো। আমি সামনাসামনি দাঁড়িয়ে হাতটা ধরে একটা জায়গা দেখিয়ে বললাম,

– বাবা, ওখানে একটু বসবেন, দু-চারটে কথা বলব।

কথার কোনও উত্তর না দিয়ে একটা বন্ধ দোকানের সামনে কাঠের পাটায় বসলাম দুজনে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, আপনি কোন সম্প্রদায়ের সাধু? বাড়ি কোথায় ছিল আপনার?

কোনও রকম ভণিতা না করে বললেন,

– বেটা, আমি দশনামী জুনা আখড়ার গিড়ি সম্প্রদায়ের নাগা সাধু। উত্তরাখণ্ডে তেহেরি গাড়োয়ালই আমার জন্মস্থান। ১৯১৭ সালে আমার জন্ম।

সাধুবাবা পা ঝুলিয়ে বসেছেন, আমিও। এবার আমার জিজ্ঞাসার কাঠি দিয়ে খোঁচাতে শুরু করলাম,

– কত বছর বয়েসে গৃহত্যাগ করেছেন এবং কেন করলেন?

অধিকাংশ সাধুসন্ন্যাসীরা পূর্বাশ্রমের অর্থাৎ ফেলে আসা জীবনের কথা বলতে চান না। কয়েক ট্যাঙ্কার তেল মাখানোর পর মুখ খুলে থাকেন। এই বৃদ্ধ একেবারেই বিপরীত। কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিচ্ছেন অকপটে। গালে একটা দাঁত নেই। কথা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে তবুও আমি অভ্যস্ত বলে সেই অসুবিধেটা কাটিয়ে নিয়ে কথা বলছি। স্রোতবতী গঙ্গায় স্নাত সাধুবাবা গঙ্গার স্রোতধারার মতো বলে চললেন,

– বেটা, তখন আমার বয়েস বারো। স্কুলে পড়তাম। একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম সাধু হব। হাঁটতে হাঁটতে এলাম হরিদ্বারে, ভীমগোড়া মহাশ্মশানে। এই শ্মশানে একজন ‘বঙ্গালী’ সাধুবাবা থাকতেন। তাঁর কাছে গিয়ে বললাম আমি সাধু হব। তিনি আমাকে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। আমি বললাম, তুমি যদি আমাকে সাধু না বানাও তাহলে আমি গঙ্গায় ডুবে মরব। সাধুবাবার অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও বাড়ি ফিরে গেলাম না। সেই বাঙালি সাধুবাবাই আমার গুরুজি মহারাজ। তখন গুরুজির বয়েস ‘পয়ষাট’। বেঁচেছিলেন ১৪৫ বছর। আমার দাদা গুরুজির ‘দেহান্ত’ হয় ১৭৫ বছর বয়েসে। গুরুজি ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁর জন্মস্থান এবং বাড়ি ছিল ঢাকায়।

সাধুবাবা একটু থামলেন। যাত্রী কোলাহলে কানদুটো যাওয়ার জোগাড়। অন্য কোনও দিকে মন নেই আমার। এতক্ষণ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার পরিস্থিতি ছিল না। এবার প্রণাম করে বললাম,

– বাবা বারোবছর বয়েসে হরিদ্বারে যখন এলেন তখন এখানকার চেহারা কেমন ছিল?

প্রসন্নচিত্ত বৃদ্ধ জানালেন,

– হরিদ্বারের চারিদিকে তখন ঘন জঙ্গল। মাত্র তিন চারটে পাণ্ডার টিনের দোচালা ঘর ছিল যাত্রীদের থাকার জন্য। জঙ্গলে হাতি, বাঘের আনাগোনা আমি নিজের চোখে দেখেছি। গঙ্গার এপারে জঙ্গলের মধ্যে দু-চারজন সন্ন্যাসী নানান গাছ লতাপাতার কুঠিয়া করে ভজন করতেন। ‘আংরেজ’ সরকার হরিদ্বারের অনেক উন্নতি সাধন করেছে।

একটু থামলেন তবে দেখে মনে হল না স্মৃতিমন্থন করছেন। টিভিতে ছবি দেখার মতো দেখে যেন সব কথা বলে চলেছেন। জিজ্ঞাসা করলাম,

– দীক্ষার পর কি করলেন, কোথায় গেলেন?

অকপট সাধুবাবা বললেন,

– বেটা, দীক্ষার পর আমার ‘বঙ্গালী’ গুরুজি আমাকে নিয়ে গেলেন ‘ঢাকা বঙ্গালে’। ওখানে ছিলাম তিনবছর। ঢাকার এক মহাশ্মশানে গুরুজি আমাকে নিয়ে মহাকাল ভৈরবের সিদ্ধির জন্য মড়ার উপর বসে শবসাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এটা করেছিলেন সাধনপথের সমস্ত বিঘ্ননাশের উদ্দেশ্যে। ঢাকায় থাকাকালীন গুরুজির বাড়িতে গিয়ে তাঁর মাকে দর্শন করেছিলাম। ওই সময় মায়ের বয়েস হয়েছিল ৮০ বছর। তারপর একে একে ভারতের সমস্ত তীর্থদর্শন করলাম। পরে মানস কৈলাস, চিন, তিব্বত ও লাসা, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, বেলুচিস্তান, আফগানিস্তান, বার্মাসহ বিভিন্ন জায়গা আমি কখনও একা, কখনও গুরুজির সঙ্গে ঘুরেছি। কখনও গাড়িতে, কখনও দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে তবে বেটা হিংলাজ মাতার দর্শনে যাওয়া হয়নি।

জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, সারাটা জীবন তো শুধু পথই চললেন। এই চলার পথে এমন কোনও ঘটনার কথা কি মনে আছে যা আজও আপনি ভুলতে পারেননি।

এ জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পলকচিন্তাও করতে হল না বৃদ্ধের। দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে বললেন,

– বেটা, তখন আমার বয়েস পঁয়তাল্লিশ। হিমালয়ের বিভিন্ন তীর্থে ঘুরে বেড়াতাম পায়ে হেঁটে। সে বার হিমালয় ভ্রমণকালীন হঠাৎই খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম। পৌঁছলাম এক সাধুবাবার আস্তানা গুহায়। বৃদ্ধ জটাধারী সাধুবাবা সেদিন আটার মণ্ডের মতো কি একটা জিনিস রুটি করার আগে লেচি করার মতো করে তিনটে খণ্ড করলেন। সামনে জ্বলন্ত ধুনিতে একটু তাপ দিলেন। তারপর একটা খণ্ড আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘খেয়েনে বেটা, এতে তোর দেহে কোনও রোগ থাকবে না। নীরোগ দেহে বেঁচে থাকবি ১৪৫ বছর।’

এই কথাগুলো বলে মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমাখা মুখে বললেন,

– বেটা ওটা খাওয়ার পর আমি সুস্থ হয়ে গেলাম। তারপর থেকে এই ৯৭ পর্যন্ত আমার কোনও রোগ হয়নি। আজও সম্পূর্ণ সুস্থ। আমিও বাঁচব গুরুজির মতো ১৪৫ বছর। এই দ্যাখ না, গত চারদিন আগে লাঠি ছাড়া হরিদ্বার থেকে যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, কেদার ও বদরীনারায়ণ পায়ে হেঁটে ঘুরে এসেছি। এখানে আর চারদিন থাকব। একজন মহাত্মা আসবেন, তাঁর সঙ্গে যাব অমরনাথ দর্শনে।

বৃদ্ধের কথা শুনে স্তম্ভিত হেয়ে গেলাম। সাধারণ একটা হিসাব বলি, হরিদ্বার থেকে গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী, গোমুখ, কেদার ও বদরীনারায়ণ পায়ে হেঁটে দর্শন করতে হলে হাঁটতে হবে মোট ১৩৬০ কিমি। হরিদ্বার থেকে বদ্রীনারায়ণ ৩২৭ কিমি। যাক, এখন ওসব ভাবার সময় নেই, আসল কাজটা বাদ পরে যাবে। সাধুবাবা নিজের থেকেই বললেন,

– বেটা, বারোবছর বয়েসে সংসার ত্যাগের পর থেকে ৯৬ এর মধ্যে প্রতি বছর অমরনাথ আর কেদার বদরীজির দর্শন করেছি পায়ে হেঁটে। এ্যায়সা হি দর্শন করতে রহুঙ্গা।

সাধুবাবা এবার পা-দুটো তুলে বাবু হয়ে বসলেন। আমি বসে থাকলাম বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে একইভাবে। তীর্থযাত্রীদের কোলাহলের আর শেষ নেই। আমি এরই মধ্যে কথা চালিয়ে যাচ্ছি। কি আর করা যাবে! বললাম,

– বাবা, আপনার জীবনে ‘চমৎকারী’ ঘটনা কি কিছু ঘটেছে। দয়া করে বলবেন?

এ প্রশ্নে সাধুবাবার ফরসা মুখখানা যেন আরও উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আনন্দে। আমার পিঠে হাত দিয়ে হাল্কা থাবড়াতে থাবড়াতে বললেন,

– বেটা, আমার গুরুর দেয়া একটা কৌপিনসম্বল ফকির আমি। এই ফকিরকে যখন রাজা উজির ধনবান কোটি কোটিপতি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তখন ভাবি, পৃথিবীতে এর চাইতে বড় বিস্ময়কর ‘চমৎকারী’ আর কি হতে পারে?

এবার এদিক ওদিক চোখ দুটো ঘুরিয়ে নিয়ে বললাম,

– বাবা, আপনার গুরুজির দেহরক্ষার পর তাঁকে আমার মতো রক্ত মাংসের দেহে কি দর্শন পেয়েছেন?

এবার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে নীরোগ সদানন্দময় বৃদ্ধ বারোতে গৃহছাড়া হয়ে ৯৭-তে আমাকে যে কথাগুলো বললেন তাতে আমার সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। তিনি বললেন,

– বেটা, আমার গুরুজি যোগী ছিলেন। তাঁর দেহত্যাগের পর রক্ত মাংসের দেহে, এই রকম তোর মতো সামনা সামনি দর্শন হয়েছে বহুবার। শুনলে তুই অবাক হবি, গুরু গোরখনাথজি রক্তমাংসের দেহে দর্শন দিয়েছেন একবার। আমার গুরুজি মরা মানুষকে বাঁচাতে পারতেন, এ আমি নিজের চোখে দেখেছি। এসব কথা এ যুগে কেউ বিশ্বাসই করবে না। বেটা, আমি দুশো এবং তিনশো বছর বেঁচে আছেন, এমন মহাত্মার দর্শন ও সঙ্গ করেছি বহুবার।

মহাযোগী গোরখনাথের জন্ম আনুমানিক দশম শতাব্দীতে। এযুগে তাঁর রক্তমাংসের দেহদর্শন এক সীমাহীন বিস্ময়কর ঘটনা। পথের ধারে বসে কথা হচ্ছে। অগণিত শ্রাবণী মেলার যাত্রীদের কোলাহলে আমাদের অস্বস্তির আর শেষ নেই। তবুও খানিক ফাঁকা জায়গায় বসে কথা হচ্ছে। এমন দুর্লভ দর্শনের কথা এজন্মে আর কারও মুখ থেকে শুনতে পাব এরকম আশা নেই। একটু থেমে বৃদ্ধ বললেন,

– বেটা, আমার দাদা গুরুজি ১৭৫ বছর বয়েসে ‘জিন্দা সমাধি’ নিয়েছিলেন। দেহরক্ষার পনেরো দিন আগে মাটি কেটে সমাধিক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল। যথা নিয়মে দেহরক্ষার দিন আমি ও আমার গুরুজি মাটি চাপা দিয়েছি জীবন্তদেহে। ঠিক একইভাবে আমার গুরুজির ১৪৫ বছর বয়েসে জিন্দা সমাধির সময় আমি উপস্থিত ছিলাম।

সাধুবাবা থামলেন। ভাবছি, কি দুর্লভ অভিজ্ঞতা আর বিস্ময়কর ফেলে আসা জীবন সাধুবাবার। আমি যেসব কথা শুনলাম তা হয়তো ৯৭-এর জীবনের এক পয়সা মাত্র। সাধুবাবার গালে দাঁত না থাকায় আর টানা নিজের গাড়োয়ালি ভাষার সঙ্গে মিশ্রিত হিন্দিতে বলা বেশ কিছু অভিজ্ঞতার কথা আমি ছিটেফোঁটাও বুঝতে পারিনি। তবে চোখমুখের ভাব আর কথা বলার প্রকাশভঙ্গীতে বুঝতে পারছিলাম যে, তিনি রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়ে অভিভূত হওয়ার মতো অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন।

এখন ঝট করে প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম,

– বাবা, সারাজীবন চলার পথে অজস্র সুন্দরী রমণী নজরে এসেছে। তাদের দেখার পর মনে কাম বিষয়ক কোনও ভাবনা কি আপনাকে কখনও বিব্রত করেছে?

সঙ্গেসঙ্গেই উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বৃদ্ধ বলে উঠলেন,

– নেহি নেহি বেটা, আমার মনে কখনও কোনও দিন নারীঘটিত বিকার আসেনি। সেই ১২ থেকে ৯৭ পর্যন্ত আমি অত্যন্ত কঠোর ব্রহ্মচারী। আগে আমার মাথা থেকে পা অবধি জটা ছিল। একটা নেংটি পরেই জীবন কেটেছে। আস্তানা ছেড়ে লোকালয়ে বেরলে কোনও মহিলাকে প্রণাম তো দূরের কথা, কাছে আসতে দিইনি। শুনলে তুই অবাক হবি, এখন জটা না থাকলেও জীবনে কোনও নারীকে আমার এ দেহ স্পর্শ করতে দিইনি। আমার গুরুজির মতো আজ অত্যন্ত কঠোর অটুট ব্রহ্মচারী আমি।

এতক্ষণ যে দোকানের সামনে বসে কথা বলছিলাম, হঠাৎ দেখি সেই দোকানের মালিক এসে হাজির। এখন দোকান খুলবে। অগত্যা উঠতে হল। আরও অনেক কথা বলার ইচ্ছা ছিল সাধুবাবার সঙ্গে, তা আর হল না। প্রণাম করলাম অশীতিপর বৃদ্ধকে। মুহুর্তে হারিয়ে গেলেন ভিড়ে। আমি যখন বাড়িতে থাকব তখন হিমাচল প্রদেশের কুলুর এই নির্বিকার কুমার ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী হয়তো কোনও সিদ্ধ মহাত্মার সঙ্গে অমরনাথ গিরিগুহায়।

শীর্ষচিত্র – হরিদ্বারে গঙ্গার ঘাট – সৌজন্যে – জীবন – পিক্সাবে



About Sibsankar Bharati

স্বাধীন পেশায় লেখক জ্যোতিষী। ১৯৫১ সালে কোলকাতায় জন্ম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। একুশ বছর বয়েস থেকে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে জ্যোতিষের প্রশ্নোত্তর বিভাগ, ছোট গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের ফিচার। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, আনন্দলোক, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, সকালবেলা সাপ্তাহিকী, নবকল্লোল, শুকতারা, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার নিবেদন 'আমার সময়' সহ অসংখ্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে অজস্র ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাধর্মী মনোজ্ঞ রচনা।

Check Also

Ram Jhula

মানুষ সাধু হয় কেমন করে – দান করলে সত্যি কি কোনও ফল হয় – শিবশংকর ভারতী

দান তিন রকমের। সাত্ত্বিক রাজসিক আর তামসিক।

3 comments

  1. Mainak Chakraborty

    Ami bharati babu K shib thakur bole mani

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.