Mythology

নববিবাহিতা গোয়ালিনীর আদলে মাটির প্রতিমায় এলেন মাকালী

বাড়ির নববিবাহিতা গোপবধূ ঘরের দেওয়ালে গোবরমাটি দেওয়ার কাজ সবেমাত্র শুরু করেছে। তার ডান পা এগিয়ে, বাঁ হাতে গোবরমাটির তাল। মাটি লেপতে গিয়ে মাথার খোঁপা খুলে গিয়ে গোটা পিঠটা ঢেকে গিয়েছে এলোচুলে।

পরম্পরাগত কথা, কার্তিকমাসে দীপান্বিতা অমাবস্যায় যে কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়, তা প্রথম শুরু করেছিলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তন্ত্রাচার্য কৃষ্ণানন্দ থাকতেন নবদ্বীপে। নয়টি দ্বীপ নিয়ে ছিল নবদ্বীপ। আগমবাগীশ তার মধ্যে একটি দ্বীপে তন্ত্রসাধনা করতেন ন-টি ‘দিয়া’ তথা প্রদীপ জ্বালিয়ে। তখন সাধারণ মানুষ ওই দ্বীপকে বলতেন ন-দিয়ার চর। পরে লোকমুখে ন-দিয়া থেকে হয় নদিয়া, রূপান্তরিত হল জেলা নদিয়ায়।

বিগ্রহ ছাড়া তন্ত্রসাধনা চলছে কৃষ্ণানন্দের। একসময় অন্তরে প্রবল ইচ্ছা হল বিগ্রহ পুজো করবেন দেবীমূর্তি নির্মাণ করে। কিন্তু তন্ত্রমতে মূর্তি কেমন হবে, চার হাতের মধ্যে কোন হাতে খড়্গ, কোন হাত অভয়মুদ্রার, কোন হাত বরদানের, দু-পায়ের মধ্যে কোন পা মহাকাল মহাদেবের বুকে রাখা হবে, দেবীবিগ্রহ কেমন হবে, এসব কিছুই ঠিক করতে পারলেন না আগমবাগীশ। অন্তর তাঁর সর্বদাই কেঁদে ফেরে মায়ের শ্রীচরণ স্মরণ করে অবস্থা।

একদিন গভীররাতে হঠাৎ দেববাণী হল, ‘কৃষ্ণানন্দ! কাল ভোরবেলায় যাকে তুমি প্রথম দর্শন করবে, তারই মধ্যে খুঁজে পাবে আমার রূপ। তুমি আমাকে সেইভাবেই গড়ে পুজো করবে’।

উত্তেজনায় ও আনন্দে আর এক ফোঁটাও ঘুম হল না কৃষ্ণানন্দের। তখনও ভোর হয়নি। আবছা আলো আঁধারিতে নির্জন দ্বীপ ছেড়ে কৃষ্ণানন্দ ছুটলেন লোকালয়ে।

একটি গ্রামের এক বাড়িতে তখনও কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। কৃষ্ণানন্দ দেখলেন ওই বাড়ির নববিবাহিতা গোপবধূ ঘরের দেওয়ালে গোবরমাটি দেওয়ার কাজ সবেমাত্র শুরু করেছে। তার ডান পা এগিয়ে, বাঁ হাতে গোবরমাটির তাল। মাটি লেপতে গিয়ে মাথার খোঁপা খুলে গিয়ে গোটা পিঠটা ঢেকে গিয়েছে এলোচুলে। কাজ করছেন তাড়াতাড়ি, তাই বিন্দু বিন্দু ঘাম সারা কপাল জুড়ে। হাতে মাটি থাকায় হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ঘাম মুছতে গিয়ে কপালের সিঁদুরে রাঙা হয়ে যায় ভ্রু-দুটি। ডানহাতে ধরা গোবর মাটির তালটি (দলা) উপরদিকে তুলে যখন মাটির দিকে নামাতে যাবেন, ঠিক সেই সময় কৃষ্ণানন্দ প্রথম দর্শন করলেন এই গোপবধূকে। প্রণাম করলেন দু-হাত জোড় করে।

এদিকে পরপুরুষ তার মুখদর্শন করে ফেলেছেন দেখে গোপবধূ লজ্জায় দাঁড়িয়ে গেলেন জিভ কেটে। ব্যস, কৃষ্ণানন্দের দেবীমূর্তি নির্মাণের সমস্ত রসদই মিলল গোপবধূর মাধ্যমে। ফিরে এলেন তাঁর পর্ণকুটিরের সাধন আসনে। একাগ্র মনে এইভাবটি সামনে রেখে তন্ত্রাচার্য কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ আজ থেকে আনুমানিক ৫০০ বছর আগে, গঙ্গাতীরে শ্রীচৈতন্যের পদধূলিপূত নবদ্বীপে প্রায় লোকালয় শূন্য জঙ্গলাবৃত দ্বীপে তৈরি করলেন আজকের ঘরে ঘরে পূজিত ও প্রচলিত শ্যামা তথা কালীমূর্তি। বাংলায় এইভাবেই প্রথম এল প্রতিমায় দেবী কালিকার প্রসন্নময়ী মাতৃবিগ্রহ।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button