Wednesday , November 14 2018
Kali Puja

মাটির প্রতিমায় কিভাবে এল কালীরূপ – শিবশংকর ভারতী

পরম্পরাগত কথা, কার্তিকমাসে দীপান্বিতা অমাবস্যায় যে কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়, তা প্রথম শুরু করেছিলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তন্ত্রাচার্য কৃষ্ণানন্দ থাকতেন নবদ্বীপে। নয়টি দ্বীপ নিয়ে ছিল নবদ্বীপ। আগমবাগীশ তার মধ্যে একটি দ্বীপে তন্ত্রসাধনা করতেন ন-টি ‘দিয়া’ তথা প্রদীপ জ্বালিয়ে। তখন সাধারণ মানুষ ওই দ্বীপকে বলতেন ন-দিয়ার চর। পরে লোকমুখে ন-দিয়া থেকে হয় নদিয়া, রূপান্তরিত হল জেলা নদিয়ায়।


বিগ্রহ ছাড়া তন্ত্রসাধনা চলছে কৃষ্ণানন্দের। একসময় অন্তরে প্রবল ইচ্ছা হল বিগ্রহ পুজো করবেন দেবীমূর্তি নির্মাণ করে। কিন্তু তন্ত্রমতে মূর্তি কেমন হবে, চার হাতের মধ্যে কোন হাতে খড়্গ, কোন হাত অভয়মুদ্রার, কোন হাত বরদানের, দু-পায়ের মধ্যে কোন পা মহাকাল মহাদেবের বুকে রাখা হবে, দেবীবিগ্রহ কেমন হবে, এসব কিছুই ঠিক করতে পারলেন না আগমবাগীশ। অন্তর তাঁর সর্বদাই কেঁদে ফেরে মায়ের শ্রীচরণ স্মরণ করে অবস্থা।

একদিন গভীররাতে হঠাৎ দেববাণী হল, ‘কৃষ্ণানন্দ! কাল ভোরবেলায় যাকে তুমি প্রথম দর্শন করবে, তারই মধ্যে খুঁজে পাবে আমার রূপ। তুমি আমাকে সেইভাবেই গড়ে পুজো করবে’।

উত্তেজনায় ও আনন্দে আর এক ফোঁটাও ঘুম হল না কৃষ্ণানন্দের। তখনও ভোর হয়নি। আবছা আলো আঁধারিতে নির্জন দ্বীপ ছেড়ে কৃষ্ণানন্দ ছুটলেন লোকালয়ে।

একটি গ্রামের এক বাড়িতে তখনও কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। কৃষ্ণানন্দ দেখলেন ওই বাড়ির নববিবাহিতা গোপবধূ ঘরের দেওয়ালে গোবরমাটি দেওয়ার কাজ সবেমাত্র শুরু করেছে। তার ডান পা এগিয়ে, বাঁ হাতে গোবরমাটির তাল। মাটি লেপতে গিয়ে মাথার খোঁপা খুলে গিয়ে গোটা পিঠটা ঢেকে গিয়েছে এলোচুলে। কাজ করছেন তাড়াতাড়ি, তাই বিন্দু বিন্দু ঘাম সারা কপাল জুড়ে। হাতে মাটি থাকায় হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ঘাম মুছতে গিয়ে কপালের সিঁদুরে রাঙা হয়ে যায় ভ্রু-দুটি। ডানহাতে ধরা গোবর মাটির তালটি (দলা) উপরদিকে তুলে যখন মাটির দিকে নামাতে যাবেন, ঠিক সেই সময় কৃষ্ণানন্দ প্রথম দর্শন করলেন এই গোপবধূকে। প্রণাম করলেন দু-হাত জোড় করে।

Kali Puja

এদিকে পরপুরুষ তার মুখদর্শন করে ফেলেছেন দেখে গোপবধূ লজ্জায় দাঁড়িয়ে গেলেন জিভ কেটে। ব্যস, কৃষ্ণানন্দের দেবীমূর্তি নির্মাণের সমস্ত রসদই মিলল গোপবধূর মাধ্যমে। ফিরে এলেন তাঁর পর্ণকুটিরের সাধন আসনে। একাগ্র মনে এইভাবটি সামনে রেখে তন্ত্রাচার্য কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ আজ থেকে আনুমানিক ৫০০ বছর আগে, গঙ্গাতীরে শ্রীচৈতন্যের পদধূলিপূত নবদ্বীপে প্রায় লোকালয় শূন্য জঙ্গলাবৃত দ্বীপে তৈরি করলেন আজকের ঘরে ঘরে পূজিত ও প্রচলিত শ্যামা তথা কালীমূর্তি। বাংলায় এইভাবেই প্রথম এল প্রতিমায় দেবী কালিকার প্রসন্নময়ী মাতৃবিগ্রহ।



About Sibsankar Bharati

স্বাধীন পেশায় লেখক জ্যোতিষী। ১৯৫১ সালে কোলকাতায় জন্ম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। একুশ বছর বয়েস থেকে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে জ্যোতিষের প্রশ্নোত্তর বিভাগ, ছোট গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের ফিচার। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, আনন্দলোক, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, সকালবেলা সাপ্তাহিকী, নবকল্লোল, শুকতারা, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার নিবেদন 'আমার সময়' সহ অসংখ্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে অজস্র ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাধর্মী মনোজ্ঞ রচনা।

Check Also

Kali Puja

সময় বাঁধা, তারমধ্যেই আকাশ রাঙাতে প্রস্তুত শহরবাসী

কেউ বা ঘরের জানালায়, কেউবা ছাদে, কেউবা বারান্দায়। খবরের কাগজ পেতে তাতে ছড়ানো নানা বাহারি বাক্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.