Thursday , November 23 2017

এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

Bengali Festivals

জগদ্ধাত্রী পুজোও শেষ। শহরটা হঠাৎ অন্ধকারে ডুবে গেছে। না, আলো কমে যায়নি। আসলে উৎসবের দিনগুলোতে আলোর বন্যায় ভেসে যাওয়া শহরটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাটা সহজে মেনে নিতে পারছে না। যে পাড়াটা সারাবছর রাস্তার আলোয় আলোকিত, সেই রাস্তায় শেষ একমাসে বিভিন্ন সময়ে নজর কেড়েছে ঝলমলে আলোক সজ্জা। ফলে সেই রঙিন আলোয় ধাঁধানো চোখ ফের রাস্তার বাতিস্তম্ভের মামুলি আলোয় ফিরতে একটু সময় তো নেবেই।

শহরে আবার এখন অঘ্রাণের হিমেল পরশে বেশ একটা শীত শীত ভাব এসেছে। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে শুকনো পাতা ঝরছে। উত্তরের জানালা খুললেই হুড়মুড়িয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে হিমেল হাওয়া। চামড়ায় বেশ একটা টান। খড়ি ফোটা চামড়া বলছে এবার গ্লিসারিন সাবান চাই। চাই পেট্রোলিয়াম জেল অথবা কোল্ড ক্রিম। বাজারে গেলে শীতের ফসলের পশরা। নতুন ফুলকপি, গাজর, বিনস, সিম, মুলো, কড়াইশুঁটি, পালং শাক। ভোরের দিকে রাস্তায় বের হলে একটা চাদর না জড়ালে ঠান্ডায় একটা অস্বস্তি হচ্ছে। এমনকি বেলাতেও ঠান্ডা জলে চান করতে গেলে শরীরটা প্রথমদিকে শিরশির করে উঠছে। সব মিলিয়ে শহরে শীত এল বলে।

শারদ উৎসবের শেষ। এবার শীতের উৎসব। আর তার দিকেই চেয়ে শহরবাসী। হাতে আর মেরেকেটে একমাস। তারপরই বড়দিনের আনন্দে মেতে উঠবে শহরবাসী। সপ্তাহব্যাপী সেই উৎসবে দাঁড়ি পড়বে পয়লা জানুয়ারি পেরিয়ে। ফলে এখন থেকেই কাজের ফাঁকে বছর শেষের ছুটির আনন্দ উপভোগের উপায় খুঁজতে ব্যস্ত সব বয়সের মানুষ। কেউ ভাবছেন দূরে কোথাও বেরিয়ে আসার কথা, তো কেউ ভাবছেন কলকাতার মধ্যেই যাদুঘর, চিড়িয়াখানা আর রেস্তোরাঁর জিভে জল আনা খাবারে ছুটির আমেজটা উপভোগ করতে। আর শহরের নেক্সট জেন? বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈচৈ করে সাতটা দিনই কিভাবে কাটানো যায় তার প্লান এখন থেকেই তৈরি করছে তারা। আর যত প্রোগ্রাম হচ্ছে। তার অধিকাংশই বাতিল হচ্ছে। ফের নতুন করে প্ল্যান বানানোর পালা। মানে কোনও কিছুই মনঃ পুত হচ্ছে না। সবেতেই মনে হচ্ছে, এতে কি পুরো মজাটা উপভোগ করা যায়! কেকের কোম্পানিগুলোর এখন হাঁফ ছাড়ার সময় নেই। জোর কদমে চলছে কেক বানানোর প্রস্তুতি।

বাজারে এবার ইতিমধ্যেই হাজির হয়েছে নতুন গুড়, জয়নগরের মোয়া। মিষ্টির দোকানগুলোয় ছানায় মাখা নতুন গুড়ের সন্দেশ বাঙালিকে আয়, আয় করে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তাদের কত বাহার। সেই সঙ্গে হাজির খেজুরের গুড়। সঙ্গে রয়েছে কাঁচা সোনার মত নলেন গুড়ের হাঁড়ি। নবান্নের ঘ্রাণে গ্রাম বাংলায় আকাশ, বাতাস ম ম করছে। ক্লান্ত দুপুরে শহরের অলিতে গলিতে শোনা যাচ্ছে মোয়া বিক্রেতার হেঁড়ে গলার চেনা সুর, জয়নগরের মোয়া, জয়নগরের মোয়া! অনেক বাড়িতে তো আবার এখন থেকেই শুরু হয়েছে পিঠেপুলির তোড়জোড়। চালের গুঁড়ি, নারকেল, দুধ, নলেন গুড়। পুলি পিঠে থেকে সিদ্ধ পিঠে, পাটিসাপটা থেকে আস্কে পিঠে বা জিভে জল আনা গোকুল পিঠে। বাঙালির শুধু কামড় দেওয়ার অপেক্ষা। তারপর শুধু চোখ বুজে এক স্বর্গীয় আনন্দে ডুবে যাওয়া। আফটার অল, ভোজন রসিক বাঙালির জীবনে বাসনার সেরা বাসাই যখন রসনা!

আসলে শীত নিয়ে বাঙালিদের মধ্যে একটা ফ্যান্টাসি আছে। এমনিতেই এখানে শীত খুব অল্প দিনের। তার পরই পচা গরম। না কোথাও যাওয়ার উপায় আছে, না ঘরে থাকার। সে এক প্রাণান্তকর অবস্থা। তাই একটু নরম রোদ গায়ে মেখে কিছু অবসর কাটানোর জন্য শীতের জুড়ি মেলা ভার। কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্যও শীত একনম্বর সময়। ফলে তার আগমনী বার্তা বঙ্গজীবনে একটা খুশির হিন্দোল বয়ে আনবে তাতে আর অবাক হওয়ার কি আছে!

এখন আবার অনেক স্কুলে পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা শেষ হতে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। তারপর বছর শেষের ছুটি। তাই বাড়ির পড়ুয়া সদস্যদের নিয়েও এই সময়ে কোনও সমস্যা নেই। বাঙালি এই কটা দিনের সদ্ব্যবহার করতে যে উঠে পড়ে লেগেছে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ট্রেনের বুকিং দেখলেই বোঝা যায় বাঙালি কতটা দূরদর্শী। মাস চারেক আগে থেকেই ট্রেনের সব টিকিট বুক। মানে ডিসেম্বরের শেষে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান সেপ্টেম্বরেই সেরে ফেলেছেন সকলে।

শীতের হাওয়ার আলগা পরশ গায়ে লাগলেই বাঙালির মন উড়ুউড়ু। কাজে মন বসে না। কেমন যেন ছুটি ছুটি মন খালি বলে, চলো বেড়িয়ে পড়ি। দূরে কোথাও, অন্য কোনওখানে! যেখানে ইট, কাঠ, পাথর নেই। কাজের চাপ নেই। টাইমে অফিস নেই। ব্যবসার টানাপড়েন নেই। যেখানে নরম ঝিলমিল রোদ খেলে বেড়ায় সবুজ অরণ্যে। অথবা কান পাতালে শোনা যায় শুকনো পাতা ঝরার শব্দ। সেখানে গাছের ছাওয়ার ফাঁক দিয়ে আপন মনে খেলা করে রোদ। যেখানে এক অচেনা ফুলের মন মাতানো গন্ধ মনকে হঠাৎ আনন্দে ভরিয়ে তোলে। যেখানে অচিন পাখির হাজারো ডাক পরিবেশটা সুরে ভরিয়ে রাখে। মনে হয় এসব যেন আমার আসার খুশিতে কেউ আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল। বাঙালি সেই প্রকৃতির বুকে ভেসে যেতে চায়।

তবে এখন ছুটির দেরি আছে। ফলে সবটাই কল্পনা। আসছে, আসছে মজা। আর আপাতত সেই আসছে মজায় মশগুল বাঙালি। উৎসবের আগেই উৎসব শুরু। বাইরে নয়, মনে। অফিসবাবু ভাবছেন আর ভাল লাগছে না। কবে যে বড়দিনটা কাছে আসবে। গৃহিণী ভাবছেন রান্নাঘর থেকে তো আমার মুক্তি নেই। তবু বছর শেষে একটু বেড়াতে তো পারব। দুদিন বাইরের রেস্তোরাঁয় খাওয়া হলে খুন্তি নাড়া থেকে তো রেহাই! আর কচিকাঁচার দল ভাবছে স্কুলের পরীক্ষাটা কবে যে শেষ হবে। কেন আসে এই পরীক্ষাগুলো! আর সবে কৈশোর পার করা ছেলে মেয়ের দল ভাবছে একটা হোল নাইট পার্টি হলে কেমন হয়। বাবা-মাকে এবার রাজি করাতেই হচ্ছে। সবমিলিয়ে সকলের মনে আনন্দ। শীতের পোষাকে গা মুড়ে সবাই বেরিয়ে পড়তে চায়। শীতের ছুটিতে রুটিনে বাঁধা জীবনটা না হয় একটু লাগামছাড়াই হল! তাতে ক্ষতি কি? সবাই চায় এই কটাদিন চুটিয়ে উপভোগ করতে। তাই এখন কাউন্টডাউনটাও একটা উৎসব। বাঙালির এই পথ চাওয়াতেও আনন্দ।

(চিত্রণ – সংযুক্তা)

About Rajarshi Chakraborty

স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর। ফ্রিলান্সার হিসাবে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। তবে লেখালিখির নেশাটা স্কুল জীবন থেকেই। স্কটিশ চার্চ স্কুলে পড়তে দেওয়াল পত্রিকা দিয়ে লেখা শুরু। কলেজ জীবন থেকেই বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হতে থা‌কে। সাংবাদিক হিসাবে প্রথম চাকরি মিঠুন চক্রবর্তীর ‘সিগনাস’-এ। এখানে টিভি নিউজ ‘আজকের খবর’ ও দৈনিক সংবাদপত্র ‘খবরের কাগজ’-এ চুটিয়ে সাংবাদিকতা। এ সময়েই সাংবাদিকতা জগতে পরিচিতি। এরপর ‘বাংলা এখন’ চ্যানেলে কাজ। পরে কলকাতার সারা জাগানো ‘কলকাতা টিভি’-তে সাংবাদিক হিসাবে যোগদান। গল্প, কবিতা থেকে প্রবন্ধ, সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর লেখায় বরাবরই সাবলীল। বাংলাদেশের খেলার পত্রিকা, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রকাশিত বাংলা ম্যাগাজিন ‘উৎসব’ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত কিশোর ভারতী ও সাফল্য পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা নজর কেড়েছে।

Check Also

Bengali Festivals

একদিন দল বেঁধে ক’জনে মিলে

চড়ুইভাতি শব্দটার সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আজকের নয়। বংশপরম্পরায় এ শব্দ বাঙালি জীবনকে ক্ষণিকের খোলা হাওয়ায় ভরিয়ে দিয়েছে।

One comment

  1. এক কথায় দারুণ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *