বৈষ্ণবতীর্থ অম্বিকা কালনা

Ambika Kalna

হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল হয়ে কাটোয়া যাওয়ার ট্রেন আছে। ব্যান্ডেল-কাটোয়া শাখায় অম্বিকা-কালনা। আমার যাত্রাপথ শিয়ালদা থেকে। সকালের কাটোয়া লোকাল ধরে বেলা ১০:৩০ মিনিট নাগাদ এলাম কালনায়। এই নিয়ে তিনবার আসা। আজ থেকে ৯৪ বছর আগে (১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে) হাওড়া থেকে শেওড়াফুলির ভাড়া ছিল তিন আনা। শেওড়াফুলি থেকে ব্যান্ডেল দু-আনা দশ পাই, ব্যান্ডেল থেকে বাঁশবেড়িয়া দশ পাই, আর বাঁশবেড়িয়া থেকে কালনার ভাড়া ছিল তিন আনা। হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল হয়ে অম্বিকা-কালনা স্টেশন ৮২ কিলোমিটার। স্টেশনের পূর্বদিকে একটু গেলেই ভাগীরথী। এরই তীরে শহর কালনা।

স্টেশনের বাইরেই সাইকেল রিকশার ছড়াছড়ি। একজনের সঙ্গে কথা হল, কালনায় যা কিছু দেখার আছে সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে শেষে স্টেশনে এনে  পৌঁছে দেবে। এই চুক্তিতে উঠে বসলাম রিকশায়। কালনার পথেপথে শুরু হল চলা।

পূণ্যসলিলা ভাগীরথীর পশ্চিমকূলে অম্বিকা-কালনা বা শ্রীপাট অম্বিকা-কালনা একটি প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু স্থানরূপেই সুপরিচিত। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে এই স্থানটি উল্লিখিত হয়েছে আম্বুয়া বা অম্বুয়া মুলুক নামে। এ পারে কালনা, ওপারে শান্তিপুর।

অনেকের অনুমান, অম্বুঋষির আশ্রম স্থল হিসাবে স্থানটি প্রসিদ্ধিলাভ করেছিল অম্বিকা নামে। স্বর্গীয় বিনয় ঘোষ মন্তব্য করেছেন –

“অম্বিকা-কালনার অম্বিকা জৈনদেবী ছিলেন। পরে তিনি হিন্দু শক্তি পূজায় স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়েছেন। বৌদ্ধতন্ত্রের প্রভাবের যুগেই বাংলাদেশে অম্বিকা পূজার প্রচলন ছিল মনে হয়। অর্থাৎ পাল যুগে। অম্বিকা-কালনার ইতিহাস হিন্দু পালযুগ পর্যন্ত বিস্তৃত না হলে ‘অম্বিকা’ কথার ব্যাখ্যা করা যায় না।”

Umakant Premanand Shah রচিত ‘Iconography of the Jain Goddess Ambika’ নামক একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে (Journal of the University of Bombay, 1940 সালে প্রকাশিত) উক্ত মন্তব্যটি করেছিলেন শ্রদ্ধেয় বিনয় ঘোষ।

খানসাহেব মৌলবি ওয়ালীর মতে কালনা একটি প্রসিদ্ধ স্থান ছিল হিন্দু ও মুসলমান যুগে। সরকার সাতগাঁও-এর অন্তর্ভুক্ত ‘অম্বোয়া’ নামে একটি পরগণার কথা উল্লেখ আছে আইন-ই-আকবরিতে। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে ভন ডেন ব্রুকের মানচিত্রে প্রদর্শিত একালের অম্বিকা-কালনা হল ‘Ambowa’, বৃন্দাবন দাস তাঁর চৈতন্য ভাগবতে অম্বিকা কালনাকে উল্লেখ করেছেন –

‘এই মতে সপ্তগ্রামে অম্বয়া মুলুকে।
বিহরেন নিত্যানন্দ পরম কৌতুকে।।’

অম্বুয়া তথা শ্রীপাট অম্বিকা-কালনা গৌর-গৌরী দাসের মিলনস্থল রূপেই প্রসিদ্ধ। প্রাচীন তেঁতুল বৃক্ষটির অবস্থান কালনা শহরের দক্ষিণভাগে। এই বৃক্ষতলে একটি ফলকে লেখা আছে – ‘শ্রী শ্রী মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল, আমলিতলা। শ্রী শ্রী গৌর ও গৌরীদাস সম্মিলন। শ্রীপাট অম্বিকা।’ মোটের উপর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের পাদস্পর্শধন্য এই কালনায় দ্বাদশ গোপালের অন্যতম গৌরী দাস পণ্ডিতের শ্রীপাট। গৌরীদাস ছিলেন নিত্যানন্দ শাখার দ্বাদশ গোপালের একজন মহান্ত ও বিশিষ্ট চৈতন্য-উপাসক। তাঁর নেতৃত্বেই কালনায় গড়ে উঠেছিল বৈষ্ণব সমাজ। তিনি একটি চৈতন্যজীবনী রচনা করেছিলেন। সে কথা জানা যায় জয়ানন্দের ‘চৈতন্য মঙ্গল’ থেকে –

‘গৌরীদাস পণ্ডিতের কবিত্ব সুশ্রেণী
সঙ্গীত প্রবন্ধে তার পদে পদে ধ্বনি।’ (আদি – ১৬৭)

মহাপ্রভু ও গৌরীদাসের মিলনের বিস্তারিত বিবরণ আছে ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থে। শ্রী চৈতন্যদেব শান্তিপুর প্রত্যাবর্তনের পথে হরিনদী গ্রাম থেকে এলেন অম্বিকায়। উপস্থিত হন গৌরীদাস পণ্ডিতের বাড়িতে। নৌকার বৈঠা ও গীতা দিয়েছিলেন গৌরদাসকে, যা আজও আছে শ্রী গৌরাঙ্গ মন্দিরে। মহাপ্রভুর আদেশেই নবদ্বীপ থেকে নিমগাছ এনে গৌরীদাস নিতাই-গৌরের বিগ্রহ নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীমন্দিরে।

এবার রিকশা এসে দাঁড়াল গৌর-গৌরীদাসের মিলনস্থল তেঁতুলতলায়। বিশাল এই তেঁতুল গাছটির চারপাশ বাঁধানো। বয়েস পাঁচশো বছর। মহাপ্রভু এসেছিলেন এখানে। তাঁর অবস্থানের স্মারক হিসাবে তেঁতুল গাছের নীচে বেদী বানানো। জায়গাটির নাম হয়েছে মহাপ্রভুতলা। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত পবিত্র পাট এই অম্বিকা কালনা। এরই তলায় গৌরী দাস পণ্ডিতের পাথরে নির্মিত ভজন সিংহাসন। মহাপ্রভু চৈতন্যের বিশ্রামস্থলে রয়েছে তাঁর শ্রীচরণচিহ্ন।

পাঁচশো বছর আগের কথা। মুণ্ডিত মস্তক গৌড়কান্তি গৌরাঙ্গের সারা দেহ বেয়ে বয়ে যাচ্ছে স্বেদ-ধারা। সন্ন্যাস গ্রহণের তিন দিনের দিন মহাপ্রভু এসেছিলেন কালনার এই তেঁতুলতলায়। সারাদিনের পথশ্রমে ক্লান্ত অভুক্ত শ্রীচৈতন্যকে দু হাতে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন কীর্তনিয়া গৌরী দাস পণ্ডিত। উচ্চস্বরে বললেন রাধারমণ,  রাধারমণ! এই রাধা নাম শুনেই মহাপ্রভুর স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে জন্মান্তরের বৃন্দাবনের কথা –

“আচম্বিতে অচৈতন্য প্রেমাবেশে শ্রী চৈতন্য,
পড়িগেলা আমলীর মূলে।।”

কালনায় মহাপ্রভুর সঙ্গে মিলিত হলেন গৌরীদাস পণ্ডিত। কিন্তু কিছুতেই মহাপ্রভু চৈতন্যকে নীলাচলে যেতে দিতে রাজি হন না। অনন্যোপায় মহাপ্রভু গৌরীদাসকে সন্তুষ্ট করার জন্য নবদ্বীপে যে নিমগাছের তলায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, সেই গাছের কাঠ দিয়ে মহাপ্রভুর দারুবিগ্রহ তৈরি করে গৌরীদাসকে তাঁর শ্রীপাটে প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করলেন পণ্ডিত। প্রতিষ্ঠা করলেন নিত্যানন্দ ও শ্রী গৌরাঙ্গের দারুমূর্তি।

জনশ্রুতি, এই দারুময় শ্রীচৈতন্য বিগ্রহ একসময় জীবন্ত হয়ে উঠল। কথা বলতেন গৌরীদাসের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে মহাপ্রভু ইহলীলা সাঙ্গ করলে অসংখ্য ভক্তের সমাগম হতে লাগল গৌরীদাস পণ্ডিতের শ্রীপাটে।

একসময় অপ্রকট হলেন মহাপ্রভু। এরপর মহাপ্রভুর জীবন্ত দারুমূর্তি দর্শনের জন্য ভক্তরা আকুল হয়ে আসতেন গৌরীদাস মন্দিরে। অন্তরে অত্যন্ত ভীত হলেন গৌরীদাস। ভাবলেন, কোনও ভক্ত এই দারুবিগ্রহের প্রাণশক্তিকে ধরে নিয়ে যেতে পারে হদয়ে। তাই বন্ধ করে দিলেন বিগ্রহদর্শন। উপায়হীন ভক্তরা গেলেন শচীমার কাছে। জানালেন অন্তরের আকুতি ও আবেদন। শচীমার আদেশে মন্দিরের দরজা খুলে দিলেন গৌরীদাস। তবে শর্তসাপেক্ষ। কোনও ভক্ত চাইলে তিনি দর্শন করতে পারবেন কয়েক মুহূর্তমাত্র। সেই ঝলক দর্শনের প্রথা প্রচলিত আছে বিগত প্রায় পাঁচশো বছরে যেমনটা ছিল।

গৌরীদাসের শ্রীগৌরাঙ্গ মন্দিরে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রক্ষিত আছে মহাপ্রভুর নায়ের বৈঠা, পাদুকা আর নিজের হাতে লেখা কয়েকটি তালপাতা। ভাগবতের কয়েকটি শ্লোক লেখা আছে তালপাতা কয়েকটিতে। পরম্পরাগত কথা, এইগুলি মহাপ্রভু দান করেছিলেন তাঁর একান্ত আপন গৌরীদাসকে। মন্দিরে আরও কয়েকটি বিগ্রহের সঙ্গে সাদরে প্রতিষ্ঠিত আছে পুরুষোত্তম, বলরামসহ সীতারাম। চৈতন্যগতপ্রাণ অনাসক্ত গৌরীদাস বিবাহ করেননি। মন্দিরের সেবাপুজো করে আসছেন তাঁর শিষ্য বংশজরা।

মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের দ্বিতীয়দেহ সংসারে বীতরাগ নিত্যানন্দ(১৪৭৩-১৫৪৫) মাত্র বারো বছর বয়েসে জনৈক সন্ন্যাসীর (বিশ্বরূপের) সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন তীর্থ পর্যটনে। টানা কুড়িটা বছর পর্যটন করেন উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের অসংখ্য তীর্থ তারপর স্থিত হলেন মথুরায়। শ্রী গৌরসুন্দরের প্রকাশাবধি সেখানে অপেক্ষা করে নবদ্বীপে আসেন শ্রী নন্দনাচার্যের গৃহে। মিলিত হন গৌরাঙ্গের সঙ্গে। ধীরে ধীরে বাংলা আর শ্রীক্ষেত্র জুড়ে চলল কৃষ্ণনাম প্রচার। একসময় শ্রী চৈতন্যের অনুরোধে সংসারী হলেন অবধূত নিত্যানন্দ। বিবাহ করলেন কালনার গৌরীদাস পণ্ডিতের ভ্রাতা সূর্যদাস সরখেলের দুই কন্যা বসুধা ও জাহ্নবাকে।

গৌরীদাস মন্দির থেকে সামান্য দূরেই সূর্যদাস সরখেল প্রতিষ্ঠিত শ্রীমন্দির। মন্দিরটি ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে (১৮৩১ শকাব্দ) সংস্কার করেন তৎকালীন ত্রিপুরার রানি শ্রীমতি মনোমঞ্জরী দেবী। শ্যামসুন্দর ও নিতাই গৌরের সুদর্শন বিগ্রহে গর্ভমন্দির আলোকিত। প্রতিবছর এই মন্দিরে উৎসব হয় মাঘী পূর্ণিমার দিন। রাস ও দোল যাত্রায় হয় বিশেষ উৎসব।

সূর্যদাসের মন্দিরঅঙ্গনের ঠিক বিপরীতেই কুলতলা।  প্রায় পাঁচশো বছরের প্রাচীন এই কুলগাছটিত আজ দাঁড়িয়ে আছে প্রভু নিত্যানন্দের বিবাহের সাক্ষী হয়ে। এখানেই সূর্যদাস পণ্ডিতের কন্যা জাহ্নবার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন মহাপ্রভুর প্রিয়তম পার্ষদ নিত্যানন্দ অবধূত (বন্দ্যোপাধ্যায়)।

পণ্ডিতের শ্রীপাট থেকে সামান্য পথ চকবাজারের মন্দির পাড়া। হাঁটা পথে পাঁচ সাত মিনিট। একের পর এক অসংখ্য মন্দির রয়েছে মন্দির পাড়ার পিছনে। কালনায় দেখার মতো অত্যন্ত আকর্ষণীয় হল রাজবাড়ি। বর্গীদের হামলার সময় বর্ধমান রাজাদের দাঁইহাটের রাজবাড়ি ধ্বংস হয়। তারপরে গঙ্গাবাসের জন্য রাজারা এখানে নির্মাণ করেন প্রাসাদ, বিশাল অট্টালিকা আর অসংখ্য মন্দির।

১৭৪০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে শ্রীপাট অম্বিকা-কালনায় মন্দির নির্মাণের তেমন কোনও নিদর্শন পাওয়া যায়নি। ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে বর্গী হামলার সময়ে মারাঠারা দাঁইহাটের রাজপ্রাসাদ অধিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মহারাজা তেজচন্দ্রের আমলেই কালনায় বহু মন্দির নির্মিত হয়। মন্দিরগুলি স্থাপিত হয় সুবিশাল চত্বরের মধ্যে।

রাজবাড়ির পশ্চিমদিকের প্রবেশপথে স্থাপিত আছে একটি শিলালিপি। ১৭৩১ শকাব্দে (১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে) মহারাজা তেজচন্দ্রের সময়ে নির্মিত হয় রাজবাড়িটি। রাজবাড়ির পশ্চিমেই বিশাল শিবক্ষেত্র। বলতে গেলে রাজবাড়ির ফটকের ঠিক সামনেই একঝাঁক শিবমন্দির। সাধারণের কাছে এটি ১০৮ শিবমন্দির নামে পরিচিত হলেও এখানে মন্দিরের সংখ্যা ১০৯টি। যেকোনোও জপের মালায় যেমন ১০৮টা বীজ গাঁথা থাকে এবং সাক্ষী হিসাবে মাঝখানে সামান্য বড় একটা বীজ থাকে, এখানে মন্দির নির্মাণের  সময় সেই নিয়ম নীতিই মানা হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গে দুটি ক্ষেত্রে  ১০৯ টি শিবমন্দির আছে। একটি বর্ধমানের নবাবহাটে আর একটি কালনায়। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে (১৭৩১ শকাব্দ) কালনার ১০৯ টি শিবমন্দির নির্মাণ করেন মহারাজা তেজচন্দ্র বাহাদুর। এককেন্দ্রিক বৃত্তাকারেই সাজানো মন্দিরগুলি। এগুলির সংস্থান বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো। বিশাল বিস্তৃত গোল অঙ্গন ঘিরে চক্রাকারে প্রথম একসারি মন্দির, তারপর ভিতর দিকে আবার চক্রাকারে একসারি শিবমন্দির। বাইরের বৃত্তে সাদা ও কালোরঙের শিবলিঙ্গসহ ৬৬ টি এবং ভিতরের বৃত্তে রয়েছে ৪২ টি মন্দির। এগুলিতে স্থাপিত শিবলিঙ্গ গুলি সাদা। ১০৯-তম শিবমন্দিরটি অবস্থিত বৃত্তের বাইরে। একটি বিশেষ জ্যামিতিক ছন্দে দারুণ সুন্দরভাবে গাঁথা । সমস্ত মন্দিরগুলিই রাজবাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে নির্মিত। প্রত্যেকটি মন্দিরের ছাদই গম্বুজাকৃতি।

কালনার ১০৯ টি শিবমন্দির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এমন সুন্দর ভাবে আলাদা আলাদা সংস্কার করেছেন যা দেখলে পুরনো দিনের গন্ধ পাওয়া অনায়াসে। পুরাকীর্তির সংস্কার সঠিক ভাবে হয়নি বলেই এই রাজবংশে নির্মিত নবাবহাটে ১০৯ শিবমন্দিরে পুরনো দিনের গন্ধটা মরে গিয়েছে। কারণ নবাবহাটের শিবমন্দিরগুলি তাদের কৌলিন্য হারিয়েছে অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙের প্রলেপে।

মন্দিরময় কালনা ছোট বড় মিলিয়ে অজস্র মন্দির। বাংলায় বর্ধমান জেলার মতো এত মন্দির খুব কমই আছে অন্য জেলায়। ১০৯ শিবমন্দির ঘুরে ঘুরে দেখে এলাম প্রতাপেশ্বর শিবমন্দিরে। এই মন্দিরটি ১০৯ এর রাস্তার বিপরীতে বাঁদিকে। রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে রয়েছে আরও অনেক মন্দির কিন্তু সবচেয়ে বেশি নজর কারে প্রতাপেশ্বর। স্থাপত্য ও পোড়ামাটির টেরাকোটার অলঙ্করণে প্রতাপেশ্বর মন্দিরের জবাব নেই। ১২৫৬ সালে (১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে) মন্দিরটি নির্মাণ করেন প্যারিকুমারী দেবী। মহারাজা প্রতাপচাঁদের প্রথমা মহিষী ছিলেন তিনি গর্ভমন্দিরে স্থাপিত শিবলিঙ্গই প্রতাপেশ্বর নামে অভিহিত। মন্দিরের পাশেই রাসমঞ্চ।

প্রতাপেশ্বর শিবমন্দিরের বিপরীতেই রাজবাড়ির প্রাঙ্গণ সুশোভিত গোপেশ্বর শিব ও পঞ্চরত্ন শিবমন্দিরে। এইসব মন্দির ও নাটমন্দির পেরিয়ে এলেই রাজবাড়ি। বিগত প্রায় চারশো বছরের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে সদর্পে মাথা উঁচিয়ে। অতীতে একসময় এই মন্দিরগুলিতে আসতেন বর্ধমানের মহারানি বিষ্ণু কুমারী, রাজকুমারী সত্যবতী, মহারাজা কীর্তিচন্দ্র, চিত্রসেন বা তিলকচাঁদ প্রমুখ। এখানে নিরেট পাথরের অন্তরে লেখা অতীতের রসসন্ধানে রয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। তাঁদের হাত পড়েছে মন্দির সংস্কারে। অম্বিকা-কালনায় এসে এই রাজবাড়িপ্রাঙ্গন না দেখলে ভ্রমণপিয়াসীদের না দেখা সুন্দর জায়গার তালিকাটা বেড়েই যাবে।

মন্দিরময় প্রাসাদ অঙ্গন যেন কালনার রাজবাড়ি। প্রধান ফটকের মধ্যে দিয়ে ঢুকতে গেলে চোখে পড়ে রিভেট করা কাঠের দরজা। ভিতরে ঢুকে গোপেশ্বর মন্দির ছাড়ালে দু’ধারে দেখা যায় পঁচিশ চূড়াবিশিষ্ট বিশালাকার দুটি মন্দির। এর সামনে ছোট ছোট মন্দিরগুলি শিবমন্দির। বিশালাকার মন্দির দুটির বাঁদিকের মন্দিরটি লালজির মন্দির, ডানদিকেরটি কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির। মন্দির দুটির চারপাশ উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। বড় মন্দির দুটি প্রকাণ্ডতায় মুগ্ধ হওয়ার মতো।

বাংলায় পঁচিশ শিখরযুক্ত বহুচূড়া সুবিশাল মন্দির সংখ্যায় মোট পাঁচটি। তার মধ্যে তিনটিই কালনায়, একটি বাঁকুড়া জেলায় সোনামুখীতে, আর একটি হুগলী জেলার সুখড়িয়ায়।

শহর কালনায় বর্ধমান মহারাজাদের নির্মিত মন্দিরগুলির মধ্যে রাজবাড়ি অঙ্গনে লালজি মন্দির সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। এর স্থাপত্য শৈলী চমকে দেওয়ার মতো। পঁচিশরত্ন বা চুড়াবিশিষ্ট মন্দির। পোড়ামাটির অনুপম টেরাকোটার কাজে সুশোভিত বাংলার মন্দির শিল্পে এক অনবদ্য সংযোজন। মন্দির স্থাপত্যে বিরল গোষ্ঠীর মন্দিরের মধ্যে লালজি মন্দির অন্যতম। ১৭৩৯-৪০ খ্রিস্টাব্দে (১৬৬১ শকাব্দ) মহারাজা কীর্তিচাঁদ (১৭০২-১৭৪০) তাঁর মা ব্রজকিশোরী  দেবীর অনুরোধে নির্মাণ করেন লালজি মন্দির। টেরাকোটা অলঙ্করণে লালজি মন্দিরের তুলনায় অনেক বেশি উন্নতমানের কৃষ্ণ চন্দ্র মন্দির। তবে স্থাপত্যশৈলীতে পঁচিশরত্ন লালজি মন্দির এই বাংলায় সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং সুপ্রসিদ্ধ।

মন্দিরে স্থাপিত শ্রীকৃষ্ণ লালজির বিগ্রহ নিয়ে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে আজও। একদিন মহারাজা কীর্তিচাঁদের মাতা ব্রজকিশোরী দেবী গঙ্গাস্নান সেরে উঠে ঘাটে দেখলেন, একজন বাউল তথা বৈষ্ণব সাধক তাঁর ভিক্ষালব্ধ চালের কিছুটা স্থান পরিভ্রমণ করতে করতেই সেই সময় এসেছিলেন কালনায়।

রাজমাতা ব্রজকুমারী দেবী এসে দাঁড়ালেন সাধকের সামনে। বললেন, ‘সামান্য এই ভোগের অন্নে লালজির কি পেট ভরবে? এক কাজ করো। আমি রাজমাতা। তুমি বরং লালজিকে দাও আমায়। আমি তোমায় কথাদিচ্ছি, পুরুষোত্তমে প্রভু জগন্নাথ দেবের মতো আমিও প্রতিদিন বাহান্নভোগ নিবেদন করব লালজিকে।’

একথা শুনে হালকা হাসিতে ভরে উঠল বৈষ্ণব সাধকের মুখমণ্ডল। বললেন,’মা, ভোগ-প্রাচুর্যে কি ভগবান কখনও তুষ্ট হন? একমুঠো ভোগান্নে তিনি তুষ্ট হন, আবার কখনও ইচ্ছে না হলে কিছুই গ্রহণ করেন না। ভক্তের নিবেদিত অন্তরের একান্ত আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ আকুতিভোগই যে গ্রহণ করেন তিনি।’

যাইহোক, বৈষ্ণব সাধক শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন বিগ্রহটি অর্পণ করলেন রাজমাতা ব্রজকুমারী দেবীকে। চলে গেলেন তাঁর অভিষ্ট পথে। বর্তমান মন্দিরে সেই বিগ্রহ আজও নিত্যসেবা পুজো পেয়ে আসছে। পরে অবশ্য শ্রীরাধিকার বিগ্রহ স্থাপন করা হয় শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের পাশে। তবে কালের বিধানে এখন আর সেই ভোগপ্রাচুর্য  নেই।

রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে লালজি মন্দিরের ডান দিকেই কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। রাধাকৃষ্ণের সুদর্শন যুগলবিগ্রহে মন্দির জমজমাট, আলোকিত। সুন্দর সাবলীল বলিষ্ঠ শিল্পকলার এক অনবদ্য নিদর্শন কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। এই মন্দিরটিও পঁচিশরত্ন শৈলীতে নির্মিত। লালজি মন্দিরের তুলনায় অনেক উন্নতমানের টেরাকোটা অলঙ্করণ। চোখ জুড়ানো অলঙ্করণ। চোখ জুড়ানো অলঙ্করণ চোখে না দেখে বিশ্বাস করা যায় না, বোঝানো যায়না কালিকলমের আঁচড়ে।
মন্দিরে খোদাই করা পাথরলিপি থেকে জানা যায় মন্দির নির্মাণের প্রতিষ্ঠাকাল –

‘শ্রী হরিচরণ সরোজ গুণমুনি
ষোড়শ সংখ্যকে শকে-অব্দে।
মন্দিরম্ অর্পিতমেতদ্রাজা
শ্রী ত্রিলোকচন্দ্র মাতা।। ১৭৫২ সন ১১৫৯ সাল।’

১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজা ত্রিলোকচন্দ্র বাহাদুর (১৭৩৩-১৭৭০) নির্মাণ করেন কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। মন্দিরটি অর্পণ করেন রাজমাতা লক্ষীকুমারী দেবীর উদ্দেশ্যে।

‘বিজয় বৈদ্য’ নামে একটি বিশাল শিবমন্দির রয়েছে কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির অঙ্গনের পূর্বভাগে। অনুপম স্থাপত্য শিল্পকলায় এই মন্দিরের আকর্ষণে ঘাটতি নেই এতটুকুও। মহারাজা ত্রিলোকচন্দ্র মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন পিতা কুমার মিত্রসেন রায় ও মাতা লক্ষীকুমারী দেবীর প্রীতার্থে।

প্রসঙ্গক্রমে বলি, পঁচিশ চূড়ার আরও একটি চমকপ্রদ মন্দির আছে এই কালনায়। গোপালজি মন্দির নামেই এর প্রসিদ্ধি। মহারাজা ত্রিলোকচাঁদের একান্ত অনুগত ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র বর্মণ। তিনি মন্দিরটি নির্মাণ করেন ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে (১৬৮৮ শকাব্দে), পরে মন্দিরে গোপালের সুদর্শন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে কৃষ্ণচন্দ্রই।

কালনায় সমস্ত মন্দিরগুলি ঘুরছি আমি সাইকেল রিকশায়। সমস্ত রাস্তা সুন্দর বাঁধানো। সারিসারি দোকানপাট বাজার। আগে হোটেল বা লজ ছিলনা। এখন যাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। রিকশা এসে দাঁড়াল প্রায় গঙ্গার কাছাকাছি সিদ্ধেশ্বরী পাড়ায় সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের দোরগোড়ায়।

অতীতের কথা। কীর্তিচন্দের পুত্র ছিলেন চিত্রসেন রায়। দক্ষ প্রশাসক ও প্রশাসন গুণে বাংলা সুবার নবাব ও দিল্লীশ্বরের অত্যন্ত প্রীত ছিলেন তিনি। চিত্রসেনই সর্বপ্রথম দিল্লীর বাদশা মোঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে।

সেই আমলে গভীর জঙ্গলে ভরা ছিল আজকের ব্যান্ডেল-নবদ্বীপ রেলপথের অম্বিকা-কালনা। একদিন রাজা চিত্রসেন রায় যাচ্ছিলেন ঘোড়ায় চেপে। হঠাৎ কানে এল ঘন্টা বাদ্যের ধ্বনি। রাজা তা লক্ষ্য করেই ঢুকে পড়লেন জঙ্গলের আরও গভীরে। দেখলেন জনহীন একটি প্রাচীন ভাঙা মন্দির। গর্ভমন্দিরে দেবী কালিকা বিগ্রহের সামনে সাজানো রয়েছে পুজোর নানা উপকরণ। রাজা ফিরে এলেন প্রাসাদে। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরক্ষেত্রেই নতুন মন্দির নির্মাণ করে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা ছিলেন রাজা চিত্রসেন রায়।

কালনায় যতগুলি মন্দির আছে তার মধ্যে  সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের স্থাপত্যরীতি একেবারেই অনন্যসাধারণ। মন্দিরটি বেশ উঁচু ভিতের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। একজোড়া দোচালা খড়ের ঘরের মতো দেখতে অর্থাৎ জোড়বাংলা রীতিতেই নির্মিত। গায়ে পোড়া মাটির কাজ।

মন্দিরঅঙ্গন ছেড়ে পায়ে পায়ে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠে এলাম মূলমন্দিরের দরজায়। দরজাটি আকারে বিশাল নয়। প্রাচীন মন্দিরের গর্ভগৃহ একেবারে জমজমাট। জাঁকালো প্রসন্নময়ী দেবী কালিকা চতুর্ভুজা। বসনে ভূষণে সুসজ্জিতা। মাথায় মুকুট। নাকে নথ। করুণাঘন আকর্ণ ফালাফালা চোখ। মাধুর্যে ভরা মুখমণ্ডল। উচ্চতায় আন্দাজ চার থেকে পাঁচ ফুট। মৃন্ময়ী বিগ্রহ মতান্তরে নিমকাঠে নির্মিত। দেখলে মনে হয় যেন কষ্টিপাথরের। পদতলে শায়িত সুদর্শন মহাদেবের মাথা দেবীর বামদিকে। বামহাতে খাঁড়া, ছিন্নমুণ্ড। যোগী অম্বঋষি প্রতিষ্ঠিত পঞ্চমুণ্ডের আসনে প্রাচীন ঘটতি ডানদিকে। যোগীবরই প্রতিষ্ঠা করেন দেবীকে। অম্বঋষির নামানুসারেই তাঁর আরাধ্য অম্বিকাই দেবী সিদ্ধেশ্বরী। দেবীর নামেই ‘সিদ্ধেশ্বরী পাড়া’, গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী স্বয়ং সিদ্ধেশ্বরীই।

কার্তিকী দীপান্বিতা কালীপুজোয় দেবীর পুজো হয় বিশেষ জাঁকজমকে। ভক্তের মানসিক করা পাঁঠা বলির ব্যবস্থা আছে। আগে যোগাযোগ করে বলে রাখলে দুপুরে দেবীর অন্নভোগও পাওয়া যায়।

পোড়ামাটির কারুমণ্ডিত ঘর ছেড়ে মন্দিরের বাইরের অংশে এর প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে শিলালিপির কথায় –

“শুভমস্তু শকাব্দ ১৬৬১|২|২৬|৬|
শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী দেবী
শ্রীযুত মহারাজা চিত্রসেন রায়সা।
মিস্ত্রি শ্রী রামচন্দ্র।”

১১৪৬ বঙ্গাব্দের ২৬ জ্যৈষ্ঠ মন্দিরটি নির্মাণ করেন রাজা চিত্রসেন রায়। মন্দির নির্মাণশিল্পী ছিলেন শ্রীরামচন্দ্র মিস্ত্রি। বর্তমান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা চিত্রসেন হলেও তার বহুপূর্ব থেকেই দেবী সিদ্ধেশ্বরী স্বয়ং অধিষ্ঠিতা অম্বিকা-কালনায়। চিত্রসেনের একশো বছর আগে ‘ধর্মমঙ্গল’ লিখেছিলেন রূপরাম চক্রবর্তী। তাঁর গ্রন্থে দেবী সিদ্ধেশ্বরীর প্রসিদ্ধির কথা উল্লিখিত হয়েছে এইভাবে –

“তোমার মহিমা মাতা কি বলিতে পারি।
অম্বুয়ার ঘাটে বন্দো কালিকা ঈশ্বরী।।”

আরও পাঁচটি শিবমন্দির আছে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরপ্রাঙ্গণে। এগুলিরও কৌলিন্যে এতটুকু মরচে ধরেনি। এরমধ্যে একটি ১৭৬৪খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন রাজা ত্রিলোকচাঁদের মাতা লক্ষীকুমারী দেবী। বর্ধমান রাজার অমাত্য ছিলেন রামচন্দ্র নাগ। ১৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনিও একটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন মন্দির অঙ্গনে। এছাড়াও আর একটি আটচালা মন্দির আছে এখানে।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরঅঙ্গন ছেড়ে একটু পূর্বমুখে এগোলেই অনন্তবাসুদেব মন্দির। টেরাকোটার অপূর্ব অলঙ্করণে সুসজ্জিত আটচালা মন্দির। গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত পাথরে নির্মিত বদ্রিনারায়ণের সুদর্শন বিগ্রহ। ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে (১৬৭৬ শকাব্দ) মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন রাজা ত্রিলোকচাঁদ। উৎসর্গ করেন পিতামহী ব্রজকিশোরী দেবীর নামে।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের সামনে দিয়েই চলে গিয়েছে রাস্তা। মন্দিরের বিপরীতে এলাম কুবেরেশ্বর মহাদেব  মন্দিরে। গর্ভগৃহে স্থাপিত বিগ্রহ কুবেরেশ্বর শিবলিঙ্গ। সাদামাটা অনাড়ম্বর মন্দির। নিত্যপুজো আর সারাবছরের বিভিন্ন তিথি উৎসবে যাত্রী সমাগমে ঘাটতি নেই সদাজাগ্রত গঙ্গাসংলগ্ন অম্বিকা-কালনার সিদ্ধেশ্বরী  মায়ের মন্দিরে।
সিদ্ধেশ্বরী মন্দির দর্শন করে এসে বসলাম রিকশায়। আমি যখন দর্শন ও তথ্য সংগ্রহে যাই, রিকশাওয়ালা বসে থাকে। ফিরে এলে তার আবার শুরু হয় চলা। আমাকে বলতে হয় না কিছু। নিজেই এদিক ওদিক সেদিক করে নিয়ে পৌঁছে যায় ঠিকঠিক দর্শনীয় জায়গায়।

এবার রিকশা এল ভারতবরেণ্য মহাপুরুষ ভগবানদাস বাবাজি মহারাজের আশ্রমের সামনে। একেবারেই অনাড়ম্বর আশ্রমটি কালনায় ‘নামব্রহ্ম বাড়ি’ নামেই পরিচিত, প্রসিদ্ধও বটে। নামব্রহ্ম বাড়ি ভগবানদাস বাবাজির সাধনপীঠ। চকবাজারে সাইনবোর্ডে লেখা ‘সিদ্ধসাধক ভগবানদাস বাবাজি মহারাজ প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রী নামব্রহ্ম শ্রী মন্দির।’

সাদামাটা মন্দিরে স্থাপিত রাধাকান্ত জিউর সুদর্শন বিগ্রহ। রাধাকান্তের বিগ্রহ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন হিরুবাবু। ভগবানদাসজির শিষ্য ছিলেন তিনি। বাঁধানো একটি তুলসীমঞ্চ রয়েছে মন্দিরঅঙ্গনে। মন্দিরের পিছনেই বাবাজিমহারাজের পুষ্পসমাধি।

বিখ্যাত বৈষ্ণব আচার্য সিদ্ধ মহাপুরুষ ছিলেন কৃষ্ণদাস বাবাজি। তখন তিনি বৃন্দাবনের গিরিগোবর্ধনে ভজন নিরত। উৎকল দেশীয় এই মহাবৈষ্ণবের চরণাশ্রিত ছিলেন ওড়িশাবাসী তরুণ বৈষ্ণব ভগবানদাস। গুরুদেবের আশ্রয়ে দীর্ঘদিন থেকে রাগানুগা সাধনের নিগুঢ় নির্দেশ পেলেন, বিভিন্ন ভক্তিশাস্ত্রেও জন্মাল শ্রদ্ধা বিশ্বাস ভালোবাসা আর প্রচুর অধিকার। তারপর একসময়  গুরুদেবেরই আদেশে ভগবানদাস এসে বসবাস করতে থাকেন অম্বিকা-কালনায়। প্রসিদ্ধ শ্রীশ্রী নামব্রহ্ম বিগ্রহের সেবা প্রকট হয় শক্তিমান এই বৈষ্ণবের অন্তরঙ্গ সাধনার মধ্যে দিয়ে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় পাদের কথা। তখন  নামব্রহ্ম বিগ্রহের মাহাত্ম্য প্রচারিত হয়ে উঠেছে দিকে দিকে। এই মূর্তির সেবা প্রবর্তন করেছেন পরমবৈষ্ণব মহাসাধক। ভগবানদাস বাবাজি মহারাজ। তাঁরই ভক্তিবলে জাগ্রত হয়ে উঠেছে নামব্রহ্ম বিগ্রহ। সেই সময় সেইজন্যই অগণিত ভক্ত ও বৈষ্ণবজনের ঢল নেমেছে কালনার শ্রীপাটে।
একদিন কালনায় আপন আশ্রমে ঠাকুরজির উপলভোগ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। স্তিমিত হয়ে এসেছে কাঁসর ও ঘন্টাধ্বনি। ঝুলি আর জপের মালা নিয়ে ভগবান দাসজি ধীর পায়ে প্রবেশ করলেন কাছেই তাঁর ভজন কুটিরে। জপ ও  নামব্রহ্মের অনুধ্যানের পর ধীরে ধীরে একসময় দেখা দিল গভীর ভজনাবেশ। ক্রমে মহাসাধকের চোখদুটি হয়ে এল অর্ধনিমীলিত। হাতের জপমালাগাছটিও ঘুরতে ঘুরতে যেন কখন থেমে গিয়েছে।

ঠিক এমন সময়েই একজন বিশিষ্ট দর্শনার্থী এলেন বাবাজির ভজনকুটিরে প্রণাম করতে। তিনি আর কেউই নন, ওই অঞ্চলে মহাপ্রতাপশালী বর্ধমানের মহারাজা। অপ্রত্যাশিতভাবে কোথা থেকে কি ঘটে গেল, হাতের মালাটি মাটিতে রেখে ভগবানদাসজি চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওরে, মার্ মার্ ওকে, তাড়িয়ে দে, তাড়িয়ে দে।’
দর্শনার্থী মহারাজা তখন ভজনকুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে। একথা শুনে বিস্মিত ও একেবারে মুষড়ে পড়লেন তিনি। ভাবলেন, তিনি বিষয়ী মানুষ। তাই তাঁর সংস্পর্শ এড়াতেই সিদ্ধ মহাত্মার এই আচরণ।

এরপর সিদ্ধসাধু বাবাজি মহারাজ হঠাৎ একেবারেই নীরব হয়ে গেলেন। নিস্পন্দ দেহে  আগের মতোই চোখদুটি হয়ে রইল অর্ধনিমীলিত। বাহ্যজ্ঞান বিরহিত বৈষ্ণব মহাপুরুষের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বর্ধমানের মহারাজা। ভাবলেন, বাবাজি মহারাজের সম্বিত ফিরে এলেই জানতে চাইবেন তাঁর প্রতি আকস্মিক ক্রোধ প্রকাশের কারণটা কি? কি অপরাধই বা করেছেন তিনি? একথা জেনে তবেই তিনি ফিরবেন তাঁর প্রসাদে।

খানিকটা সময় কেটে গেল এইভাবে। বাহ্যজ্ঞান ফিরে এল বাবাজি মহারাজের। মালাগাছটি কুড়িয়ে নিয়ে সামনের দিকে  তাকালেন। দেখলেন, তাঁরই পরিচিত বিশিষ্ট অতিথি দাঁড়িয়ে। অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলেন ‘কখন আসা হয়েছে বাবা? ঠাকুরজি আনন্দে রেখেছেন তো আপনাকে? এখানে কি শ্রীশ্রীনামব্রহ্মের প্রসাদ পেয়েছেন?’
বিস্ময়ের আর অন্ত রইল না মহারাজের। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বাবাজির মুখের দিকে। ভাবলেন, কিছুক্ষণ আগেই যিনি তাঁকে তাড়িয়ে দিতে উদ্যত হয়েছিলেন, সামান্য সময়ের মধ্যেই তাঁর একি অদ্ভুত রূপান্তর! কেনই বা এমন করে এত সমাদর?

এবার অন্তরে সাহস সঞ্চয় করে মহারাজ জানতে চাইলেন বাবাজি মহারাজের কাছে, বাবা, একটু আগেই আমি ভজনকুটিরে ঢুকবার সঙ্গেসঙ্গেই আপনি মারমুখি হয়ে উঠলেন। তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন আমাকে। বিষয়ে আমার আসক্তি আছে অস্বীকার করিনা, কিন্তু শ্রীশ্রীনামব্রহ্মের দর্শনার্থী তো বটে। তবে এমন কটু কথা বললেন কেন, কি অপরাধ আমার?

বিস্মিত মহারাজ। ততোধিক বিস্মিত বাবাজি মহারাজ। বললেন, ‘সে কি গো বাবা! অভ্যাগত ব্যক্তিমাত্রই যে দীনবৈষ্ণবের কাছে একান্ত পরমারাধ্য। বাবা, অভ্যাগত অতিথিকে কটু কথা বললে যে শ্রীভগবানকেই অসম্মান করা হয়। আপনাকে ওসব কথা কখন বললাম আমি?’

একথা শুনে আরও বিস্মিত হয়ে মহারাজ বললেন, ‘বাবা, আপনার শ্রীচরণ দর্শন করতে আসামাত্রই তো, মার্ মার্ ওকে, তাড়িয়ে দে বলে একরাশ রোষ প্রকাশ করেছিলেন আমার উপরে।’

এবার বড় লজ্জায় পড়লেন বাবাজি মহারাজ। মধুমাখা সহানুভূতিভরা কোমল কন্ঠে ভগবানদাসজি বললেন, না বাবা, আপনি এতটুকুও মনে দুঃখ করবেন না। আপনাকে উদ্দেশ্য করে ওসব কথা বলিনি আমি। আপনি যে কখন এসেছেন তাও এই স্থূল চোখে দেখিনি। সেইসময় দেখছিলাম শ্রীবৃন্দাবনে গোবিন্দমন্দিরের তুলসীমঞ্চে উঠে একটা ছাগল তুলসীপাতা খাচ্ছিল। প্রভুর সেবায় বিঘ্ন হবে ভেবে তখন তাড়িয়ে দিচ্ছিলাম ওটাকে। ওই ছাগলকে লক্ষ্য করেই বলছিলাম তাড়িয়ে দে, তাড়িয়ে দে।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন মহারাজা। বর্ধমানের কালনা গ্রাম। বৈষ্ণব মহাপুরুষ ভগবানদাস বাবাজি বসে আছেন আশ্রমে আর স্থূলদেহে উপস্থিত হলেন বৃন্দাবনে। সেখানে তাড়ালেন ছাগল, ব্যাপারটা কিছুতেই বোধগম্য হলনা মহারাজার। সঙ্গে সঙ্গেই কি যেন একটা ভেবে নিলেন। পকেট ঘড়িটা বের করে দেখে নিলেন সময়টা। এরপর খানিক সময় ধরে নানান কথা বললেন বাবাজি মহারাজের সঙ্গে। পরে প্রণাম সেরে বিদায় নিলেন আশ্রম থেকে।

এবার বর্ধমানের মহারাজা ভাবলেন, বৃন্দাবনে এই সময় গোবিন্দ মন্দিরে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে কিনা, সেটা জানা দরকার। আর দেরি করলেন না। তার পাঠালেন বৃন্দাবনে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে। উত্তর সংবাদ এল, মহারাজার ঘড়িতে দেখে স্মরণে রাখা সময়ে সত্যি সত্যিই গোবিন্দজির তুলসীমঞ্চে ছাগল উঠে তুলসী গাছটি খাচ্ছিল। কালনা নিবাসী ভগবানদাস বাবাজি সেইসময় কোথা থেকে হঠাৎ ছুটে এলেন মন্দিরঅঙ্গনে। লাঠি হাতে চিৎকার করে তাড়িয়ে দিলেন ছাগলটিকে।

বিস্ময়কর এই অলৌকিক ঘটনার কথা জেনে বর্ধমানের মহারাজার মতো বিস্ময়ের আর সীমা পরিসীমা রইল না স্থানীয়দেরও। বুঝতে কারও বাকি রইল না, শক্তিধর এই মহাপুরুষ ভগবানদাস বাবাজি মহারাজ ভজনাবেশের মধ্যে দিয়ে স্থূলদেহেই গিয়েছিলেন শ্রীধাম বৃন্দাবনে।

নিরভিমানতা ও শ্রদ্ধাভক্তি অতুলনীয় ছিল ভগবানদাস বাবাজি মহারাজের। একবার বাবাজি মহারাজকে কালনায় দর্শন করতে এলেন ভারতবরেণ্য মহাপুরুষ প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। তখন ব্রাহ্মসমাজে একজন বিশিষ্ট আচার্যরূপে সুখ্যাত গোস্বামীপ্রভু। প্রভুপাদের পরিচয় পাওয়ামাত্রই তাঁর চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হলেন সিদ্ধ বাবাজি মহারাজ, গোঁসাই যে তাঁর পরমারাধ্য শ্রীঅদ্বৈতের বংশোদ্ভব। সেদিন শত চেষ্টা করেও প্রণামরত ভগবানদাসজিকে কিছুতেই নিরস্ত করতে পারেননি প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী।

কালনায় বাজারের কাছে সিদ্ধ মহাপুরুষ ভগবানদাস বাবাজি মহারাজের অনাড়ম্বর আশ্রম। ওড়িশার অখ্যাত কোনও এক গ্রামেই তাঁর জন্ম। বাল্যকালেই বৈরাগ্যময় জীবনের শুরু। হেঁটে চলে যান সুদূর বৃন্দাবনে। বৃন্দাবনেই দীক্ষা। একসময় গুরুর আদেশে চলে আসেন এ বাংলার কালনায়। হরিনামকে তিনি বলতেন নামব্রহ্ম। এই নামব্রহ্ম জপ করেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন তিনি। কালনার আশ্রমপ্রাঙ্গনেই সমাধি দেওয়া হয় বাবাজি মহারাজকে।

১৮৭০ সালের কথা। মথুরবাবুর সঙ্গে বজরায় করে নবদ্বীপ যাচ্ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। পথে বজরা নোঙর করল কালনার ঘাটে। সকাল হল। ভাগ্নে হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ উপস্থিত হলেন বাবাজি মহারাজের আশ্রমে। অনুমান,বাবাজি মহারাজের বয়েস সেই সময় পার হয়ে গিয়েছে।

লীলাপ্রসঙ্গকার লিখেছেন (লীলাপ্রসঙ্গ, গুরুভাব-উত্তরার্ধ, পৃষ্ঠা ১৪৫-৪৬), ‘শুনিয়াছি একস্থানে একভাবে বসিয়া দিবারাত্র জপ,তপ,ধ্যান ধারণাদি করায় শেষ দশায় তাঁহার পদদ্বয় অসাড় ও অবশ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু অশীতি বর্ষেরও অধিকবয়স্ক হইয়া শরীর অপটু ও প্রায় উত্থান শক্তি রহিত হইলেও বৃদ্ধ বাবাজীর হরিনামে উদ্দাম উৎসাহ, ভগবৎপ্রেমে অজস্র অশ্রুবর্ষণ ও আনন্দ কিছুমাত্র না কমিয়া বরং দিন দিন বর্দ্ধিতই হইয়াছিল।’

কলুটোলার চৈতন্যসভায় একবার চৈতন্য-আসন অধিকার করেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। একসময় ভগবানদাস বাবাজির কানে উঠল একথা। রুষ্ট হলেন তিনি। নানান কটুবাক্য বললেন ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে। নাম শুনেছিলেন তবে তখনও বাবাজি মহারাজ দেখেননি ঠাকুরকে। তাঁর কটুবাক্যের কথা জেনেও ঠাকুর স্বয়ং এলেন ভগবানদাসজির সঙ্গে দেখা করতে। নিরভিমানীর এর থেকে বড় উদাহরণ যেন আর হয়না!

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের জীবনবৃত্তান্ত (পৃষ্ঠা ৬৬-৭৭) গ্রন্থে রামচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘পরমহংসদেব তাঁহার আশ্রমে উপস্থিত হইবামাত্র বাবাজী বলিয়া উঠিলেন, “কোন মহাপুরুষ দীনের প্রতি দয়া করিয়া কুটিরে চরণধূলি প্রদান করিলেন?”

এই কথা বলিতেছেন, এমন সময় পরমহংসদেব তাঁহার সম্মুখে যাইয়া দণ্ডায়মান হইলেন! বাবাজী তখনই তাঁহার চরণধারণপূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন, “আজ আমি কৃতার্থ হইলাম! প্রভু! আমায় হীন শক্তিবিহীন কাঙ্গাল জানিয়া দয়া পরবশে নিজ উদারতাগুনে দর্শন দিয়া চির আশা সম্পূর্ণ করিলেন।”…

বাবাজী পরমহংসদেবের মহাভাবের অবস্থা দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলেন। মহাভাব কথার কথা নহে, সহজে সাধনসাপেক্ষ নহে। …তিনি পর্যায়ক্রমে তাহা দেখিতে পাইলেন এবং শাস্ত্রের সহিত তৎসমুদয় লক্ষণ মিলাইয়া পাইয়া হর্ষোৎফুল্লচিত্তে জয়ধ্বনি দিয়া উঠিলেন। তদনন্তর তিনি জানিতে পারিলেন যে, এই মহাত্মাই কলুটোলার চৈতন্য-আসন অধিকার করিয়াছিলেন। তাহাঁর পূর্ব্ব অপরাধ স্মরণ হইল এবং তিনি আপনাকে অশেষ প্রকার ধিক্কার দিয়া অনজ্ঞানকৃত অপরাধের জন্য বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিলেন।”

মথুরবাবু বাবাজি মহারাজের আশ্রমের সেবাপুজো ও একদিন মহোৎসবের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ভগবানদাসজির উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থার অনেক প্রশংসাও করেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গ মথুরবাবুর কাছে। একথা লীলাপ্রসঙ্গ, গুরুভাব-উত্তরার্ধে, ১৫৭-৫৮ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত হয়েছে।

ব্যান্ডেল-কাটোয়া রেলপথেই পড়ে বাঘনাপাড়া। হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল হয়ে অম্বিকা-কালনার পরের স্টেশনই বাঘনাপাড়া। হাওড়া থেকে ৮৬ কিলোমিটার। বর্ধমান থেকে বাসপথে কালনা যাওয়ার পথেও পড়ে বাঘনাপাড়া।

আমার যাত্রাপথ শিয়ালদা থেকে। সকালের কাটোয়া লোকাল ধরে ব্যান্ডেল হয়ে এলাম বাঘনাপাড়া। স্টেশনের বাইরেই রিকশার ছড়াছড়ি। উঠে বসলাম একটায়। স্টেশন থেকে পশ্চিমমুখী রাস্তা। প্রায় ৩ কিলোমিটার চলে এল শ্রীপাট বাঘনার বলদেব মন্দির ও গোপীশ্বর শিবমন্দিরের সামনে।

ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ের পূর্বপর্যন্ত ঘন অরণ্যে ভরা ছিল বাঘনাপাড়া। প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ গ্রাম হিসাবে এর প্রসিদ্ধি ছিল বহুকাল ধরেই। তবে বল্লুকা নদীর তীরে নতুন করে গ্রাম পত্তন হয়েছিল ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে। এই নদীর কথা উল্লিখিত হয়েছে একাধিক পুরাণ ও কাব্যে। জনশ্রুতি, বল্লুকা ওরফে বেহুলা নদী বেয়ে সুদূর অতীতে সর্পাঘাতে মৃত স্বামী লখিন্দরকে ভেলায় করে ভেসে গিয়েছিলেন সতী বেহুলা। বৈষ্ণব  ধর্মপ্রচারকদের আগমনের পর থেকেই শ্রীপাট বাঘনাপাড়া পরিচিত ও প্রসিদ্ধ হল ধর্মকেন্দ্ররূপে।

প্রভু নিত্যানন্দ তখন দেহে। তাঁরই আদেশে বৈষ্ণব সাধক বংশীবদন গোস্বামী এলেন নবদ্বীপ থেকে। বসতি স্থাপন করলেন বাঘনাপাড়ায়। উদ্দেশ্য বৈষ্ণবধর্মের প্রচার। সাতকুলিয়ার এক কৃষ্ণভক্ত সাধক ছিলেন, ‘মাধবদাস’ তথা ছ’কড়ি চট্টোপাধ্যায়। তাঁরই পুত্র বংশীবদন। মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের অন্যতম আশ্বচর ছিলেন তিনি। ১৫০৯ খ্রিস্টাব্দের মাঘমাসে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন মহাপ্রভু। তারপর সপার্ষদ চলে গেলেন পুরুষোত্তমক্ষেত্রে। শচীমা ও বিষ্ণুপ্রিয়ার দেখাশোনা করতে বংশীবদন রয়ে গেলেন নবদ্বীপে। যতদিন এঁরা দুজনে বেঁচে ছিলেন ততদিন পর্যন্ত নবদ্বীপেই অবস্থান করেছিলেন বংশীবদন। মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের তিরোভাবের পর প্রভু নিত্যানন্দ তখনও দেহে। তাঁরই আদেশে বৈষ্ণব সাধক বংশীবদন গোস্বামী এলেন নবদ্বীপ থেকে। বসতি স্থাপন করলেন বাঘনাপাড়ায়। বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে।

গোস্বামী বংশীবদনের পুত্র ছিলেন চৈতন্যদাস। তাঁর দুটি পুত্র রামচন্দ্র ও শচীনন্দন। চিরকুমার ছিলেন রামচন্দ্র গোস্বামী। প্রভু নিত্যানন্দের সহধর্মিণী জাহ্নবাদেবী দীক্ষা দিয়েছিলেন তাঁকে। ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে জাহ্নবাদেবীকে সঙ্গে নিয়ে সেকালের দুর্গম পথ অতিক্রম ও বহু তীর্থ পর্যটন করে বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন রামচন্দ্র।

টানা পাঁচটা বছর অবস্থান করলেন সেখানে। আসার সময় বৃন্দাবনের প্রস্কন্দন তীর্থ থেকে দারুময় শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামের (কানাই বলাই) বিগ্রহ নিয়ে আসেন। প্রতিষ্ঠা করেন বাঘনাপাড়ার শ্রীপাটে। যে মন্দিরের বিগ্রহদ্বয় প্রতিষ্ঠিত আছে তা নির্মিত হয়েছিল ১৫৯১ খ্রিস্টাব্দে রামচন্দ্রের সময়ে। রামাই প্রভু নামেই তিনি বৈষ্ণব সমাজে সুপরিচিত। অনাড়ম্বর মন্দিরেই দেবতাদের অধিষ্ঠান। পরবর্তীকালে শ্রীরাধা ও শ্রীরেবতীর অষ্টধাতুর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয় আর একটি মন্দিরে। বিগ্রহ দুটিও আনা হয় বৃন্দাবন থেকে।

তখন এই অঞ্চল ছিল ঘন অরণ্যময় ও শ্বাপদে ভরা। বৈষ্ণবদের পরম বিশ্বাস, রামচন্দ্রের তপস্যার প্রভাবে ব্যাঘ্রশূন্য হয়ে যায় ওই অঞ্চল। যার জন্য এই স্থানের নাম হয় বাঘ-নাপাড়া।

এছাড়াও আরও কয়েকটি মন্দির ও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা আর একটি দালানে। গর্ভগৃহের বেদী অলঙ্কৃত নানান বিগ্রহে। রামচন্দ্র গোস্বামীর পিতৃব্য ছিলেন বৈষ্ণব পদকর্তা নিত্যানন্দদাস। তাঁরই ১০৮টি শালগ্রাম শিলাসহ রাজরাজেশ্বর, নিতাই, গৌর, লক্ষ্মী, গোপাল, গোকুল চাঁদ এবং ছোট ছোট ১০৮টি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত আছে মন্দির বেদীতে। এছাড়াও আছে পুরীর আদলে তৈরি জগন্নাথদেবের তিনটি দারুবিগ্রহ। জগন্নাথদেবের মন্দিরটি দুর্গামণ্ডপের মতো একচালা। এটি নির্মিত অষ্টাদশ শতকে।
মন্দির অঙ্গনে রয়েছে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি গুন্ডিচাঘর, দোলমঞ্চ, দোতলা নহবৎখানা, প্রশস্ত নাটমন্দির, আটকোণা ঘড়িঘর, গাজন মন্দির, দুর্গামণ্ডপ এবং দেবতাদের ভোগ রান্নাঘর। ঠাকুরবাড়ির সিংহদ্বারটি আকারে বেশ বড়।

মন্দিরের প্রত্যেকটি বিগ্রহের সেবাপুজো হয় প্রতিদিনই। প্রভু নিত্যানন্দের পুত্র ছিলেন বীরভদ্র। তিনি শচীনন্দের দুই পুত্র রাজবল্লভ ও শ্রীবল্লভকে নিয়ে আসেন বাঘনাপাড়ায়। মন্দিরের প্রতিদিনের দেবসেবায় রয়েছেন এঁদেরই বংশধরেরা।

এবার শ্রীপাট বাঘনাপাড়ায় গোস্বামীবাড়ির প্রাঙ্গণে গোপীশ্বর শিব ও মন্দিরের কথা। পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ালাম একেবারে মন্দিরের সামনে। আকারে বিশাল নয়। বাংলার চারচালা মন্দির নির্মাণের আদলেই ইটের তৈরি গোপীশ্বর শিব মন্দির। মূলমন্দির সংলগ্ন নাটমন্দির। এর ছাদ একেবারে  সাদামাটা সাধারণ বাড়ির মতো। মন্দিরের উত্তরদিকে প্রবেশ দ্বারটি ত্রিপত্রাকৃতি খিলানযুক্ত। উপরটা টেরাকোটার অলঙ্করণে ভরা। নাটমন্দিরের সামনেই শিবের বাহন নন্দী। এটি নির্মিত কষ্টি পাথরে। আজকের  মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত। মন্দির বিশেষজ্ঞ-এর মতে মন্দিরটি নির্মিত হয় সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে।

বলরাম-কৃষ্ণ মন্দিরের পাশেই গোপীশ্বর শিব মন্দির। প্রত্নতত্ত্বের এক অমূল্য সম্পদ এই শিবলিঙ্গ। বড়ই বিচিত্র ধরনের এর ভাস্কর্য। মূর্তিশিল্পে এমন ভাস্কর্য অত্যন্ত বিরল বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অভিমত। গোপীশ্বর শিবলিঙ্গের রুদ্রভাগে ক্ষোদিত আছে দশভুজামূর্তি। মূর্তিটি বদ্ধপদ্মাসন ভঙ্গীতে আসীন এবং দশপ্রহরণধারিণী। দেবীমূর্তির নীচেই উৎকীর্ণ সদাশিবের বিগ্রহ। কালো কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গটি উচ্চতায় ৬ফুট। গোস্বামী প্রধান বৈষ্ণব শ্রীপাট বাঘনাপাড়ায় গোপীশ্বর শিব পূজিত হচ্ছেন বিগত পাঁচশো বছর ধরে।

প্রেম ও ভক্তিরাজ্যে অন্তহীন আহ্বান আছে, নেই শুধু বিসর্জন। সেইজন্য পুরাণের কথায়, একসময় মহাদেব এসেছিলেন বৃন্দাবনবিহারীজির রাজ্যে, এখানে তিনি সদাসর্বদাই যেন মেতে আছেন কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে।

একদা ব্রজবালাদের সঙ্গে মহারাস লীলায় মত্ত ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর আদেশ ছিল কোনও পুরুষ যেন এই লীলা দর্শন এবং লীলাক্ষেত্রে প্রবেশ না করে। কিন্তু ব্রজলীলার এই আকর্ষণ কোন ভাবেই উপেক্ষা করতে পারলেন না মহাদেব। দেবাদিদেবের একান্ত বাসনা হল শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাদর্শনের। অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে গোপিনীর বেশ ধারণ করলেন তিনি। কিন্তু স্বয়ং মায়াময়ই  যে শ্রীকৃষ্ণ তাই তাঁর কাছে ধরা পড়ে যায় মহাদেবের মায়া। কাছে ডেকে শ্রীকৃষ্ণ তাঁরই লীলাক্ষেত্র বৃন্দাবনে স্থান দিলেন মহাদেবকে। সেই পুরাণের অজ্ঞাত কোনও কাল থেকে মহাদেব এখানে প্রতিষ্ঠিত হলেন গোপীরূপ ধারণ করার জন্য গোপীশ্বর নামে।

বৃন্দাবনের গোপীশ্বরের আদলে বাঘনাপাড়ায় নাম হয়েছে গোপীশ্বর শিব। বৃন্দাবনে গোপীবেশ ধারণ করিয়ে রাখা হয় শিবকে, সাজিয়ে রাখা হয় শাড়ি ওড়না ও নানান ভূষণে। বাঘনাপাড়ায় গোপীবেশে সাজানো হয়না।

সেন রাজাদের কয়েকটি তাম্রশাসনে উৎকীর্ণ আছে সদাশিবের মূর্তি। অনুমান, সদাশিব সেনবংশের কুলদেবতা। গবেষকদের ধারণা সেনবংশের কোন রাজা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই বিগ্রহ। পরবর্তীকালে কোনও কারণে পরিত্যক্ত হয় স্থানটি। পরিণত হয় গভীর জঙ্গলে। আবার নতুন করে গ্রামের পত্তন হয় ষোড়শ শতকে। সদাশিবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয় গোপীশ্বর জ্ঞানে। এক মুখলিঙ্গ এই শিবলিঙ্গ বাঘনাপাড়ায় সুপ্রাচীন ইতিহাসের অনবদ্য স্মারকও বটে।

গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় আছে ইটের তৈরি চারচালা মন্দির। নিত্য পুজো হয় মনসা, শীতলা ও জগৎগৌরীর। দোলমঞ্চের পূর্বে টেরাকোটার অলঙ্করণে নির্মিত মন্দিরে কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ। এছাড়াও বিভিন্ন বর্ধিষ্ণু পরিবারের অনেকগুলি মন্দির হয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

শিবক্ষেত্র রূপেই আদি পরিচিতি বাঘনাপাড়ার। বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে একসময় ধীরে ধীরে সে পরিচিত ম্লান হয়ে প্রসিদ্ধি পায় বৈষ্ণবধর্ম কেন্দ্র রূপে। স্থানীয় বৈষ্ণব পরিবারের উদার মানসিকতায় শিব দুর্গা কালী জগদ্ধাত্রী রাধাকৃষ্ণ প্রভৃতি দেবদেবীর পুজো চলে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। সারা বছর উৎসব লেগে রয়েছে এখানে। শিবরাত্রিতে গোপীশ্বর মন্দিরে, বৈশাখী পূর্ণিমায় কৃষ্ণ বলরামের ফুলদোল উৎসব, দোলযাত্রা, চৈত্রমাসে গোপীশ্বর শিবের গাজন, আষাঢ়ে জগন্নাথদেবের স্নান ও রথযাত্রা এমন অসংখ্য উৎসবে সারাবছরই মুখরিত বাঘনাপাড়া।

(ছবি – শিবশংকর ভারতী)

About Sibsankar Bharati

স্বাধীন পেশায় লেখক জ্যোতিষী। ১৯৫১ সালে কোলকাতায় জন্ম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। একুশ বছর বয়েস থেকে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে জ্যোতিষের প্রশ্নোত্তর বিভাগ, ছোট গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের ফিচার। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, আনন্দলোক, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, সকালবেলা সাপ্তাহিকী, নবকল্লোল, শুকতারা, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার নিবেদন 'আমার সময়' সহ অসংখ্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে অজস্র ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাধর্মী মনোজ্ঞ রচনা।

Check Also

Shakti Peeth Shakumbari

শিবালিকে শাকম্ভরী

হাওড়া থেকে ধরেছি কুম্ভ এক্সপ্রেস। ভাড়া বেশি। সারাটা পথে ট্রেনে জল নেই, পথে খাওয়া পাওয়া …

2 comments

  1. সত্রাজিৎ সেনগুপ্ত

    খুব ভালো লেখা। শিবশঙ্কর ভারতীর লেখা সবসময় ভালো ও এবং সম্পূর্ণ অন্য় ধরনের হয়।

  2. শিবশঙ্কর ভারতীর লেখা খুব সুন্দর এবং অসাধারণ তথ্য-সমৃদ্ধ। ভারতীয় সাধু-সন্ন্যাসিদের জ্ঞান ও সর্বকল্যানকর সমাজচিন্তার বেশিরভাগটাই শিবশঙ্কর ভারতীর লেখার মধ্যে প্রস্ফুটিত এবং প্রকাশিত। এক কথায় excellent. শ্রদ্ধা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *