Tuesday , December 18 2018
Vrindavan
বৃন্দাবনের কেশীঘাট ও যমুনা নদী, ছবি - সৌজন্যে – উইকিপিডিয়া

ঈশ্বরের দর্শন পেতে কঠিন ব্রত সাধুবাবার, জেনেনিন এক লোমহর্ষক ঘটনা

প্রথম যেবার বৃন্দাবনে গেছিলাম সে বারের কথা। কেশীঘাটের বাঁধানো চত্বরে রয়েছে একটা নিম আর বেশ বড় একটা অশ্বত্থগাছ। গাছের গোড়াটা শান বাঁধানো, পাশে মন্দির। কাছে যমুনা বয়ে চলেছে কুলকুল করে। তবে যমুনার যৌবনে কোনও উচ্ছলতা নেই এখানে। একেবারে কামশীতল। অনেকে চলেছেন স্নানে। পুরুষের সংখ্যা কম, মেয়েরাই বেশি। তার মধ্যে বৃদ্ধা আর মাঝবয়েসী অতিমাত্রায়। কেশীঘাটে এখন কোনও কোলাহল নেই। অনেকটা জায়গা জুড়ে অশ্বত্থগাছের শীতল ছায়া।


দূর থেকে দেখলাম, শান বাঁধানো গাছের গোড়ায় ডানহাতটা উপর দিকে তুলে অশ্বত্থগাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন। কাছে এগিয়ে যেতে দেখি সাধারণ লোক নয়, সাধুবাবা। মাথায় লম্বা লম্বা জটা পিছনে সটান নেমে গেছে প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি। গায়ের রং কালো। আমি কালো, সাধুবাবা আমার থেকেও কালো। কোনও হৃষ্টপুষ্ট দেহ দীর্ঘকালের অনাহার অনিদ্রায় শেষ পর্যন্ত যেমন এসে দাঁড়ায় ঠিক তেমন চেহারাটা বলেই মনে হল। নাকটা খাড়া। চোখদুটো বেশ বসে গেছে, তবে উজ্জ্বল। ভাঙা গালে মাঝারি লম্বা দাড়ি নেমে এসেছে বুক পর্যন্ত। তাতে কাঁচাও আছে, পাকাও আছে কিছু। একটা ছোট্ট ঝুলি পড়ে রয়েছে পায়ের কাছে। দেখে বোঝা যায় ভিতরে কিছু নেই। আর আছে জল পানের জন্য ছোট একটা পিতলের বালতি। পরনে এক টুকরো নেংটি।

একেবারে কাছে এগিয়ে গেলাম। প্রণাম করে মুখের দিকে তাকাতে দেখলাম, কেমন যেন একটা অস্বস্তিবোধ করলেন আমার আগমনে। বাঁধানো গাছের গোড়ায় বসলাম পা ঝুলিয়ে। হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাকই হলাম। এর আগে এমনভাবে আর কোনও সাধুবাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি কোথাও। বেশ কৌতূহল হল। এবার পা দুটো তুলে বসলাম বাবু হয়ে। বললাম,

– বাবা, বসুন না, দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন?

আমার কথার কোনও উত্তর দিলেন না। আনমনে তাকিয়ে রইলেন অন্যদিকে। কেটে গেল মিনিটপাঁচেক। আবার বললাম,

– বসুন না বাবা, একটু কথা বলি আপনার সঙ্গে।

কোনও আমল দিলেন না আমার কথায়। আগের ভাবেই রইলেন। বুঝলাম, সাধুবাবার মুখ খোলাতে মুশকিল হবে। বসে রইলাম তাঁর মুখ চেয়ে। প্রায় আধ ঘণ্টা কেটে গেল। একটা কথাও বললেন না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ডান হাত তুলে। এতটুকুও নড়ছেন না। স্পন্দনহীন দেহ যেন। দেখলে মনে হবে অনড় পাথরের মূর্তি। ভিতরে ভিতরে বেশ অস্থির হয়ে উঠলাম। ঘাড় তুলে আর কতক্ষণ এমনভাবে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়! তাই একবার সাধুবাবার মুখের দিকে তাকাচ্ছি আবার কখনও এদিক ওদিক, এইভাবে কাটতে লাগল সময়টা। স্নানার্থী বা দর্শনার্থীদের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই এদিকে। তারা আসছে আর যাচ্ছে।

এবার আমার সাধুদের কথা বলানোর কৌশলটা কাজে লাগালাম। প্রথমে দেখে নিলাম কাছাকাছি কোনও লোক আছে কি না। দেখলাম নেই। তারপর ঝপ করে পা দুটো ধরে বললাম,

– বাবা, আপনি কি মৌনী আছেন? আমার সঙ্গে কথা বলায় কি আপনার আপত্তি আছে? দয়া করে দু-চারটে কথা যদি বলেন তো খুশি হই।

সাধুবাবা বাঁহাত দিয়ে মাথাটা সরিয়ে দিলেন। মুখখানা আমার নিচু করা ছিল, ঠিক হামাগুড়ির মতো। মাথায় হাত দিতে তাকালাম মুখের দিকে। ইশারায় বসতে বললেন। বুঝলাম কৌশলটা কাজে লেগেছে। একটু সরে বসে মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথমে জিজ্ঞাসা করলাম,

– এইভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন বাবা, এটা কি ধরনের সাধনা?

একটু গম্ভীর সুরে হিন্দিতে বললেন,

– সেসব জেনে তোর কোনও লাভ নেই, আর কি বলবি বল?

সহজে ছাড়ছি না। বললাম,

– বাবা, অনেক জায়গা ঘুরেছি তবে আপনার মতো এমন তপস্বী দেখিনি কোথাও। আপনাকে দেখার পর আমার অসংখ্য প্রশ্ন এসেছে মাথায়। বেশি বিরক্ত করব না, যদি দু-চারটে কথার উত্তর দেন তো খুশি হব।

বলে সম্মতির জন্য মুখের দিকে তাকালাম। কোনো উত্তর দিলেন না। বুঝলাম প্রশ্নের উত্তর পেতে দেরি হবে না। জিজ্ঞাসা করলাম,

– আপনি কোন সম্প্রদায়ের সাধু?

সাধুবাবা বললেন,

– রামাৎ নিমৎ সম্প্রদায়ভুক্ত সাধু আমি।

মুহুর্ত দেরি না করে বললাম,

– ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন হাত তুলে, এটা কি ধরনের তপস্যা?

কোনও উত্তর দিলেন না সাধুবাবা। বুঝতে দেরি হল না, গোপন কথাটা তিনি বলতে চাইবেন না। অনুরোধের সুরে বললাম,

– বলুন না বাবা, এখানে তো আর কেউ নেই। তাছাড়া আপনার ক্ষতি তো কিছু হবে না। আমার জানাটা হবে। এই তো, আর কি?

মিনিট তিনেক কি যেন ভাবলেন মুখের ভাবটা দেখে মনে হল। এবার তিনি বললেন,

– বেটা, এটা আমার একটা ব্রত। এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকব উর্দ্ধবাহু হয়ে। হাত নামাব না, বসবও না ততদিন পর্যন্ত যতদিন না আমার ইষ্টলাভ হবে।

কথাটা শুনে মাথাটা আমার ঘুরে গেল। স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বলেন কি সাধুবাবা! হুট করে একটা কথাও বেরোল না মুখ থেকে। একটু ভেবে নিয়ে বললাম,

– এখন বয়স কত হল আপনার?

উত্তরে একটু আন্দাজ করে বললেন,

– পঞ্চাশ ষাট হবে। এর থেকে কিছু বেশি হতে পারে আবার ‘থোড়া’ কমও হতে পারে।

জানতে চাইলাম,

– বাবা, আপনার ডান হাতটা তো অনেক সরু হয়ে গেছে বাঁহাতের তুলনায়। এইভাবে আর কিছুকাল থাকলে তো হাতটাই অকেজো হয়ে পড়বে। এই ব্রত বা তপস্যা আপনার কতদিন ধরে চলছে?

ভুরু দুটো একটু কোঁচকালেন। দেহ কিন্তু স্থির। এতটুকুও নড়াচড়া নেই। একটু ভেবে নিয়ে বললেন,

– প্রায় বছর পনেরো হল এই ব্রত গ্রহণ করেছি। আর এ দেহটা যখন থাকবে না, তখন শুধু হাতটা নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।

ভাবলাম সাধুবাবার ইষ্টলাভ এখন হয়নি। এই কঠোর কঠিন ব্রত ইষ্টলাভের জন্য। তা হয়ে গেলে তো ব্রত ভঙ্গই করে ফেলতেন। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, গৃহত্যাগ করে সাধনজীবনে আসার পর থেকেই কি এই ব্রত গ্রহণ করেছেন, না তারও অনেক পরে?

সাধুবাবার দেহের কোনও অংশই নড়ছে না, একেবারে স্থির। শুধু মুখটুকু নড়ছে কথা বলার সময়। তিনি বললেন,

– না বেটা, ঘর ছাড়ার অনেক পরে ব্রত গ্রহণ করেছি। ঘর ছেড়েছি তো সেই ছোটবেলায়।

জানতে চাইলাম,

– ঘর ছাড়লেন কেন?

এবার সাধুবাবা একটু চটে গেলেন। বিরক্তির একটা ছাপ ফুটে উঠল সারা চোখেমুখে। সে ভাবটা কণ্ঠস্বরেও। বললেন,

– কেন এখানে বসে আমার ভজনে বিঘ্নের সৃষ্টি করছিস। নিজের কাজে যা না।

কথাটা বলে চোখদুটোকে নিবদ্ধ করলেন অশ্বত্থের একটা ডালে। সাধুদের এসব কথায় কোনও গুরুত্ব দিই না। ওসব কথা আগে বহু শোনা আছে। তবে বিরক্ত হয়েছেন দেখে চট করে আমার ওষুধটা প্রয়োগ করলাম। পা-দুটোতে হাত রেখে বললাম,

– রাগ করবেন না বাবা। আপনার মতো, আপনাদের মতো মহাত্মাদের জীবনকথা শুনতে আমার ভালো লাগে, সেইজন্য জিজ্ঞাসা করা। দয়া করে বলুন বাবা, আপনার দুটো পায়ে ধরছি।

মুহুর্তে মুখের ভাবের পরিবর্তন ঘটে গেল। ওষুধে কাজ হয়েছে। আগুনে জল পড়েছে। এবার প্রশান্ত কণ্ঠে বললেন,

– বেটা, সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে অতীত জানতে চাইতে নেই। তারা তো ওটা ফেলে এসেছে, আবার কেন! তবুও যখন জিজ্ঞাসা করলি তখন বলছি। আমি যখন মায়ের পেটে তিন মাস তখন বাবা গেল মরে। তারপর জন্ম হল। অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিয়ে বড় করে তুলল মা। যখন বয়েস আমার বছর পনেরো, তখন মাও চলে গেল হঠাৎ অসুখে। আমিই একমাত্র সন্তান। বাড়ি ছিল গোরক্ষপুর। মা মারা যাওয়ার পরে নিজের বলতে আর কেউ রইল না। একদিন কি মনে হল, বেরিয়ে পড়লাম ঘর ছেড়ে। তারপর আর ফিরে যাইনি ঘরে। পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এলাম গয়ায়। সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় বসেছিলাম বিষ্ণুপাদপদ্ম মন্দিরচত্বরে। তখন সন্ধ্যা লাগো লাগো। ক্লান্ত আর অবসন্ন দেহটা যে কখন এলিয়ে পড়েছে জানি না।

এই পর্যন্ত বলে একটু থামলেন। আমি মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম হাঁ করে। সাধুবাবা বললেন,

– বেটা, অনেক রাতে হঠাৎ কারও স্পর্শে ঘুমটা আমার ভেঙে গেল। উঠে বসলাম। দেখলাম এক সাধুবাবাকে। পাতায় কয়েকটা রুটি আর সবজি হাতে দিয়ে বললেন ‘খা লে বেটা, সারাদিন তো কিছু খাসনি, খা লে।’ কোনও কথা না বলে খেয়ে নিলাম গোগ্রাসে। তারপর সেই রাতে নিয়ে গেলেন ফল্গুনদীতে। আমাকে বললেন স্নান করে নিতে। অন্তঃসলিলা বলে পরিচিত ফল্গুর ক্ষীণস্রোতে স্নান করলাম কোনরকমে। এবার নিয়ে এলেন বিষ্ণুপাদপদ্ম মন্দিরে। দীক্ষা দিয়ে তিনি সেদিন আপন করে নিলেন আমাকে। এই সব কাজগুলি ঘটে গেল একের পর এক। আমার ইচ্ছাশক্তি তো কোনও কাজই করেনি, উপরন্তু এসব করলাম আমি বিবশভাবে। এরপর আমার সহায় হল, সঙ্গীও হল। গুরুজির সঙ্গে চলতে লাগল তীর্থ পরিক্রমা। দুঃখের দিনের চির অবসান হল।

সাধুবাবা চুপ করলেন। মাথা নড়ল না কিন্তু চোখদুটো ঘুরিয়ে দেখে নিলেন ডাইনে বাঁয়ে। এমন সময় কয়েকজন বৃদ্ধা যমুনায় স্নান সেরে আসার পথে এসে দাঁড়ালেন সামনে। আঁচল থেকে কয়েকজন খুচরো পয়সা বের করে ছুঁড়ে দিলেন সাধুবাবার পায়ের কাছে। প্রণাম করলেন তবে স্পর্শ করে নয়। দেখে মনে হল এরা প্রত্যেকে বাঙালি। সাধুবাবা তাকালেন তাদের মুখের দিকে। কোনও কথা বললেন না। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, এইভাবে বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে আছেন হাত তুলে। দাঁড়িয়ে পায়খানা, স্নান, খাওয়া সবই করতে হয় বুঝতে পারছি। কি অসম্ভব কঠিন ব্রতে লিপ্ত হয়েছেন আপনি! আমার জিজ্ঞাসা, রাতে বা দিনে ঘুম পেলে ঘুমোন কেমন করে?

এতক্ষণ পর এবার হাসি ফুটল সাধুবাবার মুখে। হাসি হাসি মুখ করে তিনি বললেন,

– বেটা, যখন যে কোনও তীর্থে যাই, তখন আশ্রয় করি কোনও গাছ কিংবা মন্দিরের দেয়াল। যখন ঘুম পায় তখন কোনও গাছে বা মন্দিরের দেয়ালে কপালটা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে নিই। অসুবিধে কিছু হয় না।

জানতে চাইলাম,

– ঘুমের ঘোরে হাতটা নিচে নেমে যায় না? দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পড়ে যাননি কখনও, ঘুমের ঘোরে পড়ে যান না?

হাসতে হাসতে বললেন,

– না বেটা, তা হয়নি কখনও। অভ্যাস হয়ে গেছে। এই ব্রত গ্রহণের পর প্রথম প্রথম কষ্ট হত খুবই। পরে ধীরেধীরে সব ঠিক হয়ে গেছে।

মনে মনে ভাবছি, বাপরে কি কঠিন জীবন, কি শারীরিক কষ্ট! এইভাবে তপস্যা করার কথা ভাবতেই পারছি না। এইসব ভাবছি, সাধুবাবা হয়ত মনের ভাবটা বুঝতে পেরেছেন। নিজে থেকেই বললেন,

– বেটা, আমার এ তপস্যা আর কঠিন কিরে, একটা হাত রেখেছি খাওয়া আর অন্য কাজকর্মের জন্যে আর একটা তুলে রেখেছি সংকল্প করে। আমাদের মধ্যে এমন অনেক তপস্বীও আছেন যাঁরা দুটো হাতই তুলে রেখেছেন উপরে। এবার তুই ভাব তাঁদের কথা। খাওয়াটা পর্যন্ত নিজের হাতে খেতে পারেন না কেউ না খাইয়ে দিলে। এঁরাও উর্দ্ধবাহু তপস্বী।

About Sibsankar Bharati

স্বাধীন পেশায় লেখক জ্যোতিষী। ১৯৫১ সালে কোলকাতায় জন্ম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। একুশ বছর বয়েস থেকে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে জ্যোতিষের প্রশ্নোত্তর বিভাগ, ছোট গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের ফিচার। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, আনন্দলোক, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, সকালবেলা সাপ্তাহিকী, নবকল্লোল, শুকতারা, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার নিবেদন 'আমার সময়' সহ অসংখ্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে অজস্র ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাধর্মী মনোজ্ঞ রচনা।

Check Also

Allahabad

ঈশ্বরের অপার করুণা লাভের গূঢ় পথ জানালেন সাধুবাবা, অবহেলা না করে পড়ুন

মনটা চায় শরীরের সুখ, হৃদয়ে বাসনা সন্তানলাভের অথচ সন্তানপ্রসবে কষ্ট ভোগ করব না, তা বললে কি আর মায়েদের সন্তান আপনা থেকে কোলে এসে যাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *