Tuesday , September 25 2018
Varanasi

মানুষ সাধু হয় কেমন করে – নেশাতেই নাশ – শিবশংকর ভারতী

খানিক থেমে বলতে শুরু করলেন,

– বেটা এমন কঠোরতা সাধুজীবনে নেই। সংযমে থেকে সৎভাবে জীবনযাপন করে যিনি নিষ্ঠার সঙ্গে ভগবানের ভজনা করেন, যিনি তাঁর শরণাগত, একথায় বলতে পারিস তিনিই সাধু। সে সংসারে থাকুক কিংবা সংসার ছেড়েই থাকুক তাকে সাধু বলেই জানবি। তবে প্রকৃত সাধুকে বাইরের মূর্তি দেখে না তুই চিনতে পারবি, না আমি। সাধুকে চিনতে হলে, সাধুকে জানতে হলে নিজেকেও সাধু হতে হবে। নদীর উপরটা দেখলে বোঝা যাবে না কতটা গভীর আর তলদেশটা কেমন? তা জানতে হলে ডুবুরি হতে হবে, বুঝলি?

সাধুবাবা আরও বললেন,

– বেটা, আমি তো সাধুপদবাচ্যই নই। তবুও গুরু কৃপায় এই বয়সে বিভিন্ন তীর্থ ভ্রমণকালীন এমন সব শক্তিধর মহাত্মা দেখেছি, যাদের শক্তি ত্যাগ তিতিক্ষা ও সংযমের কথা তুই কল্পনাও করতে পারবি না। দেখে তাদের বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই নিজেরা ধরা না দিলে, অথচ তারা শাস্ত্রীয় নিয়মমানা সন্ন্যাসী নয় কেউ। এরা সব ‘আচ্ছা আচ্ছা’ মহাত্মা। সর্ববোধ ও বন্ধনের উর্দ্ধে উঠে গেছেন। বলতে পারিস, সাধুসন্ন্যাসী এসব কোনও সংজ্ঞাই খাটে না এদের জীবনে।

মহাত্মার কথা বলতে আমার কৌতূহল হল। বললাম,

– বাবা শক্তিধর কয়েকজন মহাত্মার কথা বলুন না, যাদের শক্তির পরিচয় পেয়েছেন আপনি নিজে।

বেশ খুশি খুশি ভাব নিয়ে বললেন,

– শুনবি? শুনলে বলতে পারি তবে তোর বিশ্বাস হবে না। মনে হবে এসব ‘ঝুট বাত’।

কোনও উত্তর দিলাম না। সাধুবাবা নড়ে চড়ে বসলেন। গভীর ভাবে দেখলেন আমার মুখের দিকে। এ দৃষ্টি যেন সমস্ত কিছু ভেদ করে অন্তরে গিয়ে আঘাত করল বলে মনে হল। স্থির হয়ে বসে রইলাম। বললেন,

– বলি শোন, একবার তীর্থভ্রমণ করতে করতে গেছি কাশীতে। সেটাই আমার জীবনে প্রথম কাশী যাওয়া। কিছুদিন ছিলামও সেখানে। তৈলঙ্গস্বামীর আশ্রম আছে মণিকর্ণিকা ঘাটের পাশে। একদিন সেই আশ্রম দর্শন করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম ঘাটে, তখনও সন্ধ্যে হয়নি। একটু বাকি আছে। হালকা অন্ধকার এসেছে চারিদিকে। ভ্রমণকারীদের অনেকে গঙ্গা ঘুরছে নৌকায় করে। ঘাটের পাশে শ্মশান। ঘাটের পাড় ধরে ধরেই চলে আসব দশাশ্বমেধ ঘাটে। অনেকটা সময় বাঁচবে, তাড়াতাড়িও হবে। এইভেবে চলতে গিয়ে দেখলাম, একজন বৃদ্ধ সাধুবাবা বসে আছেন শ্মশানের একধারে। শতচ্ছিন্ন একটা ন্যাকড়া পরা। গায়ে ভর্তি ময়লা। চুলগুলো উস্কো খুস্কো। কালো দোহারা চেহারা। পাগল বলেই মনে হল আমার। বিড়বিড় করে কি যেন বকছে, অনেক পাগল যেমন বকে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকালাম বৃদ্ধের মুখের দিকে। তাকালেন তিনিও। একেবারে চোখাচুখি হয়ে গেল। ইশারায় বৃদ্ধ কাছে ডাকলেন। প্রায় নির্জন শ্মশান। কোন শ্মশানযাত্রী নেই। কয়েকটা নিভে যাওয়া চিতে থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে। বোঝা গেল, কিছুক্ষণ আগে কেউ স্বজনকে ছাই করে চলে গেছে জলে ঢেলে। কয়েকজন বসে আছে শ্মশান থেকে কিছুটা দূরে। বৃদ্ধ ডাকতে এগিয়ে গেলাম কাছে। তাকালেন মুখের দিকে। বসতে বললেন ইশারায়। কথা না বলে বসলাম উবু হয়ে। বললেন,

– তোর কাছে একটু গাঁজা হবে?

বৃদ্ধকে দেখে আমার ভক্তি হলো না। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও বললাম, আছে। তখন বৃদ্ধ একটু অনুরোধের সুরে বললেন,

– আমাকে একটু সেজে দেনা, অনেকক্ষণ খাইনি। দে, তোর ভাল হবে। সাধু হয়েছিস তোর সিদ্ধিলাভ হবে। স্বামীজীর আশ্রম দর্শন করে এলি বুঝি?

এবার আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– বেটা, মাত্র কয়েকটা কথায় একেবারে চমকে উঠলাম। বৃদ্ধ বসে রয়েছেন শ্মশানে আর আমি যে তৈলঙ্গস্বামীজির আশ্রম দর্শনে গেছিলাম তা ইনি জানলেন কি করে? আবার একটু আনন্দও হল সিদ্ধিলাভের কথা শুনে। এসব কথা আমার মনকে একটু ধাক্কা দিলেও মনটাই কেমন যেন গুরুত্ব দিল না কথাটার। ঝুলি থেকে গাঁজার কল্কেটা বের করলাম । তা সাজতে লাগলাম ধীরে ধীরে।

বৃদ্ধ বললেন,

– বেটা, মানুষকে কখনো অবহেলা করতে নেই। সাধু জীবনে এসে মানুষকে অবহেলা করলে তো ভগবানের সান্নিধ্যেই পৌঁছতে পারবি না। ‘মেরা প্যারে’ বেটা, তুই এতো বোকা কেন? ভগবান কি মন্দিরে বসে থাকে ফল মিষ্টি খাওয়ার জন্যে? তিনি তো রয়েছেন তোর, আমার আর সকল মানুষের সঙ্গে।

বৃদ্ধের কথা শুনে মনে হল, এসব জ্ঞানের কথা আমার আগে শোনা আছে তাই আর পাত্তা দিলাম না তার কথায়। গাঁজা সেজে কল্কেটা দিলাম বৃদ্ধের হাতে। তিনি বললেন,

– বেটা, তুই আগুনটা একটু দিয়ে দে।

কল্কেটা ধরলেন মুখে। চারিদিকে অন্ধকার হয়ে গেলেও কাছাকাছি বসে আছি দুজনে। দেখতে পাচ্ছি একে অপরকে। আমি গাঁজায় আগুন ধরিয়ে দিলাম। তিনি কয়েকটি লম্বা টান দিয়ে কল্কেটা ফিরিয়ে দিলেন আমার হাতে। আমি সেটা নিতেই বৃদ্ধ এবার ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন মুখ থেকে।

এই পর্যন্ত বলে থামলেন। কেটে গেল মিনিটখানেক। আর কোনও কথা বলছেন না দেখে কৌতূহলী হয়ে বললাম,

– তারপর কি হলো বাবা?

একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

– যেটা হলো সেটা শুনলে তোর বিশ্বাস হবে না। নিজের চোখদুটোকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারিনা আজও। তবু বলি শোন। তারপর সেই ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তিনি ধোঁয়ার সঙ্গেই মিলিয়ে গেলেন আমার চোখের সামনে। আমি আর ভাববো কি, বোকার মতো হাঁ করে একাই বসে রইলাম শ্মশানে। কিছুক্ষণ থাকার পর যখন হুঁশ এল তখন দেখলাম চারিদিক অন্ধকারে ডুবে গেছে। উঠে গেলাম শ্মশান থেকে। আমার উপর সেই মহাত্মার অযাচিত কৃপা ও সিদ্ধিলাভের আশীর্বাদ কথা ভাবতে ভাবতে চলে এলাম দশাশ্বমেধঘাটে।

অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা এটা কিভাবে ও কেমন করে সম্ভব হল?

সাধুবাবা প্রসন্ন মনে বললেন,

– বেটা, সাধারণ মানুষের জীবনে কখনও কখনও এমন অযাচিত কৃপা মেলে অনেক বড় বড় মহাত্মার। ওই বৃদ্ধ এত বড় মহাত্মা ছিলেন তা প্রথমে আমি কল্পনা করতে পারিনি। যত্নের অভাবে হারানোর পর যেমন খোঁজ পড়ে হারানো মানিকের, তেমন দশাই আমার হল। আর এটা করা সম্ভব হয়েছে ইটযোগের মাধ্যমে। এই যোগে সিদ্ধ সাধক চিন্তামাত্র যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারেন। খুব খু-উ-ব কঠিন এ সাধনা। এমন মহাত্মার দর্শন এ যুগে খুব কমই পাওয়া যায়।

এই পর্যন্ত কথার পর আমরা দুজনে চুপ করে বসে রইলাম। মিনিট পাঁচেক পর প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম,

– সাধুজীবনে আসার পর এমন কোনও আনন্দ বা দুঃখদায়ক ঘটনা কি কখনও ঘটেছে যা সারাজীবন আপনার মনে রাখার মতো?

কথাটা শোনামাত্র মুখখানা একেবারে অন্ধকার হয়ে এলো সাধুবাবার। আগের ভাবটা মিলিয়ে গেল পলকে। এদিক ওদিক চোখদুটো একবার ঘোরালেন। শূন্যদৃষ্টি। মুখ দেখে মনে হল, এতটুকু না ভেবেই বলতে শুরু করলেন মাথা নাড়িয়ে,

– হাঁ বেটা, একটা দুঃখদায়ক ঘটনার কথা মনে থাকবে আমার সারাজীবনই। তখন সবে ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়েছি। কিছুদিন এ তীর্থ সে তীর্থ করে পরে সোজা গেলাম কেদার বদরী যমুনোত্রী গঙ্গোত্রী ও গোমুখ দর্শন করতে। এসব তীর্থ আমি হরিদ্বার থেকে পায়ে হেঁটেই করেছি। উত্তরাখণ্ডের তীর্থে যখন যাই তখন একটা সংকল্প করছিলাম মনে মনে। সেই মতো দুটো তামার ছোট ঘট কিনে নিয়ে যাই হরিদ্বার থেকে। ফেরার সময় গোমুখ থেকে গঙ্গাজল ভরে মুখটা ভালো করে এঁটে দিলাম। এবার ঘট দুটোর গলায় দড়ি বেঁধে কাঁধের উপর দিয়ে ফেলে একটা পিছনে আর একটা সামনে, এইভাবে গোমুখ থেকে অন্যান্য ধামগুলো দর্শন করে শুরু করলাম যাত্রা। সংকল্প ছিল পায়ে হেঁটে গোমুখ থেকে জল নিয়ে যাব রামেশ্বরে, চড়াবো রামেশ্বর মহাদেবের মাথায়। শুরু হলো পথ চলা।

পথে যখন যেখানে যা পেতাম তাই খেতাম। যেখানে রাত হত সেখানেই এলিয়ে দিতাম দেহটাকে। কোনও কোনও দিন আধপেটা, কোনও দিন ভরপেট আহার জুটতো। কারো কাছে ভিক্ষা চাইতাম না। এইভাবে চলতে লাগলাম গোমুখ থেকে রামেশ্বরের পথে।

এক নিঃশ্বাসেই কথাগুলো বললেন। থামলেন কিছুক্ষণ। তারপর আবার বলতে লাগলেন,

– এইভাবে দিনের পর দিন চলতে চলতে একদিন চলে এলাম মাদ্রাজে। চলছি আপন-মনে শহরের পথ ধরে। হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এল একটা পুলিশ। কোনও কথা নেই মুখে। হাতের লম্বা বাঁশের লাঠিটা দিয়ে সামনে মারতে শুরু করল আমাকে। সে যে কি মার তা তোর ধারণাতেই আসবে না। গায়ের সমস্ত শক্তি উজাড় করে মারতে লাগল। মারের চোটে গঙ্গাজলের ঘটদুটো নিয়ে আমি লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। তবুও মারের বিরাম নেই। এই মার ও আর্তনাদ শুনে ছুটে এল পথচারীরা। সকলে মিলে ঠেকালো পুলিশকে। তখন আমি ওঠার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। কয়েকজন ধরে তুলল আমাকে। জিজ্ঞাসা করল আমার অপরাধটা কি? হিন্দিতে বললাম, কোনও অপরাধ আমি করিনি। গোমুখ থেকে গঙ্গাজল নিয়ে পায়ে হেঁটে যাচ্ছি রামেশ্বরে। হঠাৎ পুলিশটা আমাকে দেখতে পেয়ে ছুটে এল। তারপর যা হলো তা তো আপনারা নিজের চোখেই দেখলেন। আমার হিন্দি কথা বুঝল একজনই। কারণ ওখানে আর যারা ছিল তারা কেউ হিন্দি জানে না। এবার হিন্দি জানা লোকটি মাদ্রাজি ভাষায় পুলিশ ও অন্যান্যদের বলল আমার কথা। সকলে শোনার পর পুলিশটাকে জিজ্ঞাসা করল আমার অপরাধ কি এবং কেন মারা হল আমাকে? তাতে পুলিশ যা বলেছিল তার মূল কথা হল, আমার মত দেখতে একটা চোর আছে ওই এলাকায়। প্রায়ই সে চুরি করে। পুলিশ তাকে ধরতে পারছে না। আমাকে সেই চোর ভেবেই সে মেরেছে। বিনা অপরাধে এইভাবে মারার জন্য ক্ষমাটুকু পর্যন্ত চাইল না। তারপর আমার সেই পীড়িত দেহটাকে বয়ে নিয়ে একদিন পৌঁছে গেলাম রামেশ্বর মন্দিরে।

এই পর্যন্ত বলে থামলেন। এমন অত্যাচারের কথা শুনে আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগল। সাধুবাবাও কেমন যেন একটু গুম মেরে বসে রইলেন। মুখ দেখে মনে হল, অতীতের সেই মারের ব্যথা যেন এই মুহূর্তে কাতর করে দিয়েছে সারা দেহটাকে। খানিক পরে বললেন,

– গোমুখের জল চড়ালাম রামেশ্বরজির মাথায়। মন্দিরে দাঁড়িয়ে আমার কষ্টের কথা জানিয়ে শুধু বললাম, ‘বাবা কি অপরাধ করেছি আমি যে পথে এমন করে তুমি মারলে’ তোমার কাছে আসাটাই কি অপরাধ হয়েছে? এইভাবে কষ্টের কথা জানালাম ভগবানকে।

এবারে অদ্ভুত স্বরে উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বললেন,

– বেটা, ভগবান যদি সত্যি হয় তাহলে এতদিনে ওই পুলিশের বংশে বাতি দেয়ার মতো আর কেউ আছে বলে মনে হয় না।

কথাটা শুনে একেবারে চমকে উঠলাম। ভাবলাম, এতবড় একটা অভিশাপ দিলেন সাধুবাবা। এটুকু ভাবামাত্রই বললেন,

– বেটা, অভিশাপ আমি কাউকে দিই না, দিইনি কখনও। আমার দেহমন গুরুতে নিবেদিত। বিনা অপরাধে যে আঘাত ও আমাকে করেছে তাতে এই ক্ষুদ্র সাজাটুকু ওর প্রাপ্য হওয়া উচিত বলে মনে হয় বলেই ওই কথাটা বললাম।

এরপর আমি আর ওই প্রসঙ্গে গেলাম না। এই ভাবটা কাটিয়ে উঠতে সময় কেটে গেল অনেকটা। জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা এখন আপনার বয়স কত? এ পথে এলেনই বা কেমন করে?

এই প্রশ্নে বিব্রত হলেন বলে মনে হল না। সহজ স্বাভাবিকভাবে বললেন,

– বেটা, যে জীবনটার মৃত্যু হয়েছে সেই জীবনের কথা এই জীবনে বলা নিষিদ্ধ বলে সাধু-সন্ন্যাসীদের পুর্বাশ্রমের কথা বলতে নেই। এতে মনের ভাব নষ্ট হয়। চিত্তের চাঞ্চল্য বাড়ে। ভজনে বিঘ্ন হয়। সংসারের সুখ-দুঃখের কথা বলা মাত্র তা মন ও বৃদ্ধির উপর ক্রিয়া করে তাই বলতে নেই।

সঙ্গে সঙ্গে বললাম,

– আমি তো আপনার কাছে ফেলে আসা সংসারের সব সুখ-দুঃখের কোন কথা জানতে চাইছি না। জানতে চাই এ পথে এলেন কেমন করে?

কথাটা এবার ধরতে পেরেছেন। সাধুবাবা সামান্য কোঁচকালেন তার ভ্রুদুটো। বললেন,

– বেটা, অল্প বয়স থেকেই আমার নেশা ছিল তাসখেলা। দেশে থাকতে দিনের বেলায় খেতমজুরের দেখাশোনা করতাম। সন্ধ্যের পর কয়েকজন বন্ধু মিলে তাস খেলতাম। এই খেলায় যত ভালই খেলতাম আমি, জিততাম খুব কম। খেলায় তো হারজিত হয়ই তাই কিছু মনে করতাম না। তখন আমার বয়েস ২২/২৩ হবে। দিনটা রামনবমী। ক্ষেতে যাইনি। দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া সেরে তাস খেলতে বসেছি চার বন্ধুতে। দুপুর বিকেল হল। এই সময়ে খেলায় একবারও জিততে পারলাম না। বারবার হেরে গেলাম। ফলে আমাকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলতে লাগল বন্ধুরা মিলে। হেরে গেলে ইয়ার্কির ছলে এমনটা সবাই করে, আমিও করেছি অনেকের সঙ্গে। সেদিন হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগল মনে। ভাবলাম, শালা যতবার খেলি ততবারই হেরে যাই। আর খেলব না। হাতের তাসগুলো রাগ করে ফেলে দিয়ে মনে মনে ভাবলাম, এ হার জিতে কোনো লাভ নেই। আমি ভগবান বিষয়ে বা সাধনভজনে কোনদিন আকর্ষণ অনুভব করিনি। এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র কিছু ভাবলামও না। সেদিন হঠাৎ মাথায় এল, যখনই কোনও আশায় বঞ্চিত হব তখনই সৃষ্টি হবে এক অসহ্য মানসিক যন্ত্রণা। এসব কথা মুহূর্তে মধ্যে আমার মনকে গ্রাস করে ফেলল। উঠে দাঁড়ালাম খেলা ছেড়ে। ভাবলাম তাস খেলায় নয়, যদি জিততে হয়তো ভগবানকেই জিতব। ভাবামাত্র কাউকে কিছু বললাম না। চুপচাপ বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি ছেড়ে। ব্যস, আর ফিরে যাইনি ঘরে। সেই থেকে পথ আমার পরমানন্দ আশ্রয়, অযাচিত অন্নই রক্ষা করে চলেছে দেহটাকে।

সাধুবাবার গৃহত্যাগের কাহিনী শুনে বিস্মিত হয়ে গেলাম। ভাবলাম, মনের কখন যে কার কি অবস্থা হয় তা বোঝার বা ভাবার অবকাশ থাকে না কারও। সামান্য ব্যাপার বা কথা থেকে মানুষের জীবনপথের সাধারণ গতির পরিবর্তন হয়ে চলতে থাকে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে। এ যে কি করে হয়, কেমন করে হয় তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। তবে যে হয়, তা তো দেখতে পাচ্ছি অবিশ্বাস্যভাবে। দেখেছি আগেও, অনেকেই। তাই এসব কথা মুহূর্তে ভেবে অকারণ সময় নষ্ট করলাম না। তাহলে অন্য কথা বাদ পড়ে যাবে। জানতে চাইলাম,

– বাড়িতে আপনার কে কে আছেন, এখন বয়সেই বা চলছে কত?

উত্তর দিলেন সহজভাবে,

– গৃহত্যাগের সময় বাড়িতে মা বাবা ভাই বোন সকলেই ছিল। ‘সাধি উধি’ করিনি কিছু। এখন বয়েস আমার ৪৫ থেকে ৪৮ হবে, এই রকমই। ঠিক ঠিক বলতে পারব না বেটা।

আবার প্রশ্ন করতে যাব, হাতের ইশারায় বাধা দিয়ে বললেন,

– বেটা, সংসারে যতদিন থাকবি ততদিন কোনও বিষয়ে হা-হুতাশ করবি না। আমাদের কি এমন উপাদান আছে যে আফসোস করতে হবে বা ঠকার ভয় আছে। একটু ভেবে দ্যাখ, তোর আমার কিছুই নেই। তুই যখন দেখবি তোর একটা কিছু গুণ বা কোনও কিছু আছে, তখন একটু খোঁজ নিলে দেখতে পাবি, তোর যা আছে তার চেয়ে অনেক বেশি আছে আর একজনের। এবার তার যা আছে খোঁজ করলে দেখবি তার থেকে অনেক অ-নে-ক বেশি আছে আরে একজনের। এইভাবে তুই যদি দেখতে দেখতে যাস তাহলে এক সময় দেখতে পাবি, অন্যের যা আছে তাদের তুলনায় তোর যা আছে তা ছিটেফোঁটাও নয়। তার মানে বলতে পারিস তোর কিছুই নেই। তাই যখন নেই তখন আফসোস বা অহংকারের কি আছে আর হারিয়ে যাওয়া বা হেরে যাওয়ার ভয়টাই বা করবি কেন? মনে রাখবি, মানুষের অতি মূল্যবান সময় নষ্ট করে দেয় নেশা। যে কোন নেশা সবসময় পরিত্যাগ করবি। অতিমাত্রায় ধর্মের প্রতিও নেশা ভাল নয় বেটা। সেটা তামসিক ধর্মের পর্যায়ে পড়ে। ঠিক ঠিক ভাবে এগোনো যায় নিয়মে চললে।

পৃথিবীতে একটা জিনিস বড়ই দুর্লভ, তা হল মানুষের কাছে মানুষের উৎকৃষ্ট বাক্য পাওয়া। এই দুর্লভ বস্তু লাভের জন্যে ভালো মানুষের সঙ্গ করবি। জীবনে এমন কোনও দিন তো তাঁর কৃপায় আসতে পারে। একটা বাক্যের জন্য জগতে সমস্ত বন্ধন তোর মুহূর্তে ছিন্ন হয়, পরমগতি লাভ হতে পারে, মানুষ সারাদিন তাঁকে ব্যতিরেকে যেসব কথা বলে, তা জানবি সব কু-কথা। তাঁর কথাই হল সু-কথা।

এখন চোখদুটো বুজে বলতে লাগলেন আবেগভরা সুরে,

– বেটা, স্ত্রী বশে না থাকলে সংসার জীবন যেমন সুখের হয় না, তেমনিই কাম ও ভোগবাসনা বশে না এলে ঈশ্বরলাভ হয় না। সংসারে আছিস দানটা করে যাস। সকলের প্রতি, সকল জীবনের প্রতি বিরুদ্ধাচরণ ত্যাগ হল একমাত্র উৎকৃষ্ট দান। এ দানে অর্থ খরচ হয় না। এ দানে মন পবিত্র হয়। বেটা নিয়মের স্বভাবকে জয় করতে পারলে সংসার বাসনা ত্যাগ হবে।

সাধুবাবার কথা গুলো শুনতে লাগলাম মোহিত হয়ে। কথায় কোনও কথা বলে অযথা কথা বাড়ালাম না। বললেন,

– বেটা, আমাদের এই দেহটা জানবি বিষেভরা একটা বড় পাত্র। গুরু হলেন অনন্তকালের অমৃতে ভরা খনি। শুধু মাথাটা যদি দিলে গুরু পাওয়া যায় জানবি অমৃতের খনি পেয়েছিস। বেটা, ইহকাল পরকাল সব পেয়েছিস একেবারে বিনা খাটনিতে।

এবার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক রকমের অথচ আস্তে করে কানের কাছে মুখখানা এনে বললেন,

– আর জানবি, খুব সস্তায়ই তা পেয়েছিস।

একটু থেমে তাড়া দিয়ে বললেন বেশ আদরের সুরে,

– যা বেটা, যা যা, অনেক কথা হয়েছে কাজে যা। এখন আমি উঠব।

কোনও কথা বললাম না। নির্বাক হয়ে প্রণাম করলাম। মাথায় হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। মুখে কিছু বললেন না। সোজা উঠে এসে দাঁড়ালাম অটোরিকশার সামনে, যেখানে এসে নেমেছিলাম। ভাবতে লাগলাম সাধুবাবার কথা, দেখতে লাগলাম বিরক্তি ভরা কয়েকজন সহযাত্রীর মুখ। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।



Advertisements

About Sibsankar Bharati

স্বাধীন পেশায় লেখক জ্যোতিষী। ১৯৫১ সালে কোলকাতায় জন্ম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। একুশ বছর বয়েস থেকে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে জ্যোতিষের প্রশ্নোত্তর বিভাগ, ছোট গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের ফিচার। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, আনন্দলোক, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, সকালবেলা সাপ্তাহিকী, নবকল্লোল, শুকতারা, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার নিবেদন 'আমার সময়' সহ অসংখ্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে অজস্র ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাধর্মী মনোজ্ঞ রচনা।

Check Also

Ganesha

পঞ্চ দেবতার প্রধান দেবতা গণেশ, অন্যরা কারা জানেন?

গণেশজি হলেন এক মহাশক্তি ও সাফল্যের দেবতা। তিনি মানুষের জাগতিক ও পারমার্থিক পথের বাধা ও বিপত্তিনাশক।

One comment

  1. BAIDYA NATH BISWAS , SHYAM ROAD .NAIHATI,

    SIBU KAKU TOMAR LAKHA KHUBU KHUBU BHALO LAGA TOMAR NATUN LAKHA PARAR
    APAYKHAY RAYLAM
    BHALO THAKO. GURU DEB TOMAY BHALO RAKHUN

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.