রামবাগানের ওপেন ক্যানভাস

Bengali Festivals

চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে রঙ, বিভিন্ন মাপের তুলি, বালতি, মাটির সরা, লেই, পাটের দড়ি, পেরেক, কাটারি। পাশে এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে সাদা কাগজ সাঁটা অতিকায় ক্যানভাস। কি ভাবছেন, কোনও শিল্পীর অগোছালো স্টুডিওতে ঢুকে পড়েছি? আপনার ভাবনায় একটু ভুল হয়ে গেল। আমি দাঁড়িয়ে আছি পিচ ঢালা একটা রাস্তার উপর। বাস – ট্রাম চলার রাস্তা নয়। গলি। একেবারে সাদামাটা দিবানিদ্রা দেওয়া গলি। দুর্গাপুজোর মাস চারেক আগে থেকেই এখানে সাজোসাজো রব। গোটা পাড়াটাই তখন এক স্টুডিওর রূপ নেয়। আর আদুর গায়ে গামছা বা ছোট বারমুডা গোছের পরিধানে যাঁদের কাজ করতে দেখা যায় তাঁরাই শিল্পী। বাঁশ-চ্যাঁচারি শিল্পী।

গিরিশ পার্ক থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে বিডন স্ট্রিটের দিকে হাঁটতে থাকলে রাস্তায় পড়ে লিবার্টি সিনেমা হল। এই সিনেমা হলের গা দিয়ে ঢুকে গেছে একটা গলি। অদ্বৈত মল্লিক লেন। সাকুল্যে খান কুড়ি বাড়ি। সব ঘরেই মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস। এই গলি যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু রামবাগান এলাকা। এই রামবাগানের বাঁশ চ্যাঁচারি শিল্পীরাই পুজোর চারমাস আগে থেকে অদ্বৈত মল্লিক লেনের রাস্তাটার দখন নেন। চলে জোর কদমে পুজোর কাজ। তৈরি হয় প্রতিমার পিছনের চালচিত্র বা প্যান্ডেল সাজানোর জন্য বিভিন্ন মডেল।

অসমের এক বিশেষ ধরণের বাঁশকে ছুলে তার থেকে বের করা হয় বাঁশের সরু মোটা বিভিন্ন ধরণের চ্যাঁচারি। কাটারি দিয়ে ছুলে ছুলে চ্যাঁচারির গায়ের চোঁচ সাফ করে তকে মসৃণ করা হয়। এবার রাস্তার উপর ভাঁড়ের টুকরো বা সাদা চক দিয়ে ছবি এঁকে, সেই ছবির উপর শুরু হয় কাঠামো বানানোর কাজ। বিভিন্ন ধরণের চ্যাঁচারিকে প্রয়োজনমত বেঁকিয়ে সেগুলো পেরেক আর পাটের দড়ি দিয়ে একটা আকৃতি দেওয়া হয়। কাঠামো তৈরি হয়ে গেলে তার উপর লেই দিয়ে সাদা কাগজ সাঁটা হয়। এর উপর ফের সাদা রঙ করা হয়। রঙ শুকোলে তার উপর শুরু হয় কারুকার্য। কল্কা জাতীয় কাজগুলো বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। তাই সেগুলোর জন্য ফুটো ফুটো করা রেডিমেড কল্কা রয়েছে। বসিয়ে ফাঁকগুলো রঙে ভরে দিলেই কল্কা রেডি। তারপর কল্কায় বর্ডার দিয়ে দিলে মোটামুটি কাজ শেষ। কিন্তু গড়পড়তা এই শিল্পকর্মের বাইরেও এখানে চলে নানা কাজ। গোটা একটা প্যান্ডেলের পুরো ফেসিয়াল এখানে তৈরি হয়। তৈরি হয় প্যান্ডেলের ইন্টিরিয়র। কোথাও কোনও ছবি বৃহদাকারে সাজতে চাইলে সেই  আঁকাও এরা অক্লেশে এঁকে ফেলেন। তবে এই চিত্রশিল্প সবার কম্ম নয়। এঁদের মধ্যে কয়েকজনই এই বিশাল ক্যানভাসে আঁকার কাজটা করে থাকেন।

না, তথাকথিত কোনও আর্ট স্কুলে এরা পড়েনি। রামবাগানের মানুষজন এলাকায় বস্তিবাসী হিসাবেই পরিচিত। আগে ছিল বিশাল বস্তি। রামকৃষ্ণ মিশন সেই বস্তি ভেঙে সেখানে ফ্ল্যাট তৈরি করে এদের পরিবারগুলোর মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে। ফলে বংশ পরম্পরায় পেটের দায়ে এদের এই চ্যাঁচারি শিল্পের তালিম। রাস্তায় বাপ-দাদার সঙ্গে কাজ করেই এঁরা কবে যে শিল্পী হয়ে ওঠেন তা এরা বোধহয় নিজেরাও জানেন না। দুর্গাপুজোর আগে থেকে শুরু করে সরস্বতী পুজো পর্যন্ত এদের কাজ থাকে। বকি ছ‍‍‍’মাস নেহাতই বসা। টুকটাক কিছু কাজ জুটে গেলেও এর কোনও নিশ্চয়তা নেই।

ক্রমাগত কলকাতার পুজো বদলাচ্ছে। ঢুকে পড়ছে অনেক টাকা। নামিদামি শিল্পীদের মোটা টাকা দিয়ে নবতম ভাবনায় সাজিয়ে তোলা হচ্ছে প্যান্ডেল। যা আপাতত থিম পুজো নামে বেশ খ্যাতিও পেয়েছে। মানুষও ভিড় জমাচ্ছেন এসব বহুমূল্য প্যান্ডেল দেখতে। ফলে সাবেকি শিল্পে এখন ভাটার টান। তার উপর সব জিনিষের দাম বেড়েছে। অসমের জটিল পরিস্থিতির জেরে বাঁশ আসছে কম। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তার বিশাল দাম। ফলে কাঁচা মালে মোটা টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে এঁদের। সব মিলিয়ে চ্যাঁচারি শিল্পীদের মোটা টাকা দর হাঁকতে হচ্ছে। পুজো কমিটিগুলো ভেবে দেখছে ওই টাকায় আধুনিক থিম পুজো হয়ে যাবে। এখানে এই পুরনো ধারণার শিল্পে টাকা ঢালবে কেন? আর এই টানাপোড়নে মার খাচ্ছে বাঁশ চ্যাঁচারি শিল্প। তবু, এই থিম পুজোর বাজারে এখনও পুজোর আগে দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না এই চ্যাঁচারি শিল্পীরা। রাত দিন একাকার করে চলছে ঠিক সময়ে বারোয়ারিকে ডেলিভারি দেওয়ার তোড়জোড়। এদের দাবি, যতই থিম আসুক, তদের শিল্প ছিল-আছে-থাকবে।

অবশ্যই। আমরাও চাই এই শিল্প বেঁচে থাকুক। এই একটা কাজ অসংখ্য পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে। তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু পেটের দায়টাই কি সব। শিল্পীর কদর কি এরা কোনও দিনই পাবে না। এই হতভাগ্য মানুষগুলো বাইরের জগতটাকে জানে না। নামিদামি আর্ট গ্যালারিতে এদের কাজ প্রদর্শিত হয়না। এদের নামও কেউ জানেন না। কিন্তু রাস্তার উপর রোদ, জল, বৃষ্টিতে ভিজে এরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে অনন্য শিল্প গড়ে তোলেন তা কি এভাবেই চিরকাল শুধু দুগার্পুজোর প্যান্ডেল সাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে? বৃহত্তর জগতে পরিচিতি পাওয়ার যোগ্যতা এদের কিছু কম নেই। সরকার বোধহয় এদিকটা একটু ভেবে দেখতে পারে। কারণ এরা আমাদের রাজ্যের তথা দেশের গর্ব হতে পারেন। দয়া ক‌রে বলবেন, বিশ্বে এমন আর কোন দেশ আছে যেখানে শিল্পকীর্তি রাস্তায় শুরু হয়ে রাস্তায় শেষ হয়ে যায়! কথায় বলে গেঁয়ো যোগী ভিখ পায়না। এদেরও সেই দশা। সরকার একটু দৃষ্টিপাত করলে কিন্তু শুধু এরাই সম্মান পাবেন এমন নয়, এদের শিল্পকীর্তি ঠিকঠাক বিক্রির বন্দোবস্ত করলে তার একটা বিরাট অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও থেকে ‌যাচ্ছে বই কি!

(চিত্রণ – সংযুক্তা)

About Rajarshi Chakraborty

স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর। ফ্রিলান্সার হিসাবে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। তবে লেখালিখির নেশাটা স্কুল জীবন থেকেই। স্কটিশ চার্চ স্কুলে পড়তে দেওয়াল পত্রিকা দিয়ে লেখা শুরু। কলেজ জীবন থেকেই বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হতে থা‌কে। সাংবাদিক হিসাবে প্রথম চাকরি মিঠুন চক্রবর্তীর ‘সিগনাস’-এ। এখানে টিভি নিউজ ‘আজকের খবর’ ও দৈনিক সংবাদপত্র ‘খবরের কাগজ’-এ চুটিয়ে সাংবাদিকতা। এ সময়েই সাংবাদিকতা জগতে পরিচিতি। এরপর ‘বাংলা এখন’ চ্যানেলে কাজ। পরে কলকাতার সারা জাগানো ‘কলকাতা টিভি’-তে সাংবাদিক হিসাবে যোগদান। গল্প, কবিতা থেকে প্রবন্ধ, সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর লেখায় বরাবরই সাবলীল। বাংলাদেশের খেলার পত্রিকা, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রকাশিত বাংলা ম্যাগাজিন ‘উৎসব’ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত কিশোর ভারতী ও সাফল্য পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা নজর কেড়েছে।

Check Also

Chaltabagan

চালতাবাগান

বাড়িতে পশু-পাখিকে পোষ্য করে রাখার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদই এই পুজোর থিম। মানিকতলার অদূরে চালতাবাগানের লোহাপট্টির পুজো কলকাতার নামীদামী পুজোর একটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *