Saturday , June 23 2018
Bengali New Year

পয়লা বৈশাখ কি সত্যিই শুভ দিন? – শিবশংকর ভারতী

বছরের পর বছর ধরে পয়লা বৈশাখকে শুভ অভিহিত করে ব্যবসা-বাণিজ্যে লক্ষ্মী-গণেশ পুজো ও নতুন খাতা লেখার একটা প্রথা প্রচলিত আছে। এটা বলা যায় বাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোনও তিথি নক্ষত্র ইত্যাদি বিচার নেই। পয়লা বৈশাখ হল মানে এই নিয়মটা পালন করতে হবে, এটাই যেন দস্তুর।

পয়লা বৈশাখ শুভদিন বা বিশেষ কোনও কারণে শুভ, শাস্ত্রে এমন কোনও কথার কোথাও উল্লেখ আছে বলে আমার জানা নেই কিন্তু অনুষ্ঠানটা বছরের পর বছর ধরে হয়ে আসছে।

বাংলা ১২ মাস বহুকাল আগের থেকেই পালিত হত হিন্দু সৌরপঞ্জিকা অনুসারে। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই পঞ্জিকার শুরু হত গিরির পঞ্জিকায়। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছর সূচনার জন্য একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এমনটা কিন্তু একসময় ছিল না। তখন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ ছিল আর্তব উৎসব অর্থাৎ ঋতুধর্মী উৎসব হিসাবেই পালিত হত দিনটি। সেকালে এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। কারণ তখন কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োগ ছিল না। ফলে ঋতুর ওপরেই নির্ভর করতে হত কৃষকদের।

ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা কৃষিজাত পণ্যের খাজনা আদায় করতেন হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরি সন ছিল চাঁদের উপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হত কৃষকদের। এই অস্বস্তিকর অবস্থার হাত থেকে কৃষকদের মুক্ত করতে অর্থাৎ খাজনা আদায়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে বাংলা সনের প্রবর্তন করলেন মোঘল সম্রাট আকবর। তিনি মূলত সংস্কার আনার আদেশ দেন প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে। তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ছিলেন ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। আকবর বাদশার আদেশ অনুসারে তিনি নতুন করে বাংলা সনে নিয়ম নির্মাণ প্রচলন করেন সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে। বাংলা সন গণনা শুরু হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবর বাদশার সিংহাসন আরোহণের সময় ৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ থেকে (মতান্তর আছে)। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে।

পয়লা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয় সম্রাট আকবরের আমল থেকে। তখন প্রত্যেকে বাধ্য থাকত বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সমস্ত খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে। এরপর দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে জমির মালিকরা মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন করতেন তাঁদের নিজের নিজের অঞ্চলের অধিবাসীদের। বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত এই উপলক্ষে। তারপর ধীরে ধীরে এই অনুষ্ঠানটি একসময় সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে রূপ পরিবর্তন হয়ে।

সেকালে এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি হিসাব হালনাগাদ করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। মোটের ওপর পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পূজা হোম কীর্তনের ব্যবস্থা করা হয় সে বছর পয়লা বৈশাখে। এরপর অনুরূপ কর্মের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯৩৮ সালে। পরবর্তীকালে, ১৯৬৭ সালের আগে আজকের মতো ঘটা করে পয়লা বৈশাখ পালনের রীতি খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি।

সংক্ষেপে এই হল অথ পয়লা বৈশাখ কথা। এখন প্রশ্ন হল, যে কোনও মাঙ্গলিক কর্ম শুরুর জন্য পঞ্জিকাতে সারা বছরের শুভ কর্মের লম্বা একটা ফর্দ দেওয়া থাকে শুভ দিনের নির্ঘণ্টে। সেখানে ব্যবসায় উন্নতিতে পয়লা বৈশাখ-এর কোনও উল্লেখ শুভ দিন হিসাবে নেই বাদশা আকবরের আমল থেকেই। একশ্রেণির ব্যবসায়ী ‘শুভ পহেলা বৈশাখ’ লেখেন নিমন্ত্রণের কার্ডে। ব্যবসার প্রথম দিনটা শুরু করেন মানুষজন জড়ো করে। এই প্রথা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে।

যদি কোনও শাস্ত্র বা পুরাণের কোনও বিশেষ শুভ ঘটনার সঙ্গে পয়লা বৈশাখ মহিমান্বিত হত তাহলে শুভ প্রবৃত্ত পুণ্য ইত্যাদি যোগ করলে বলার কিছু ছিল না। তবে সেরকম কিছুর উল্লেখ না পাওয়া যাওযায় এটা বলাই যায় একটা সাধারণ দিনের সঙ্গে পয়লা বৈশাখের এতটুকুও পার্থক্য নেই।



About Sibsankar Bharati

স্বাধীন পেশায় লেখক জ্যোতিষী। ১৯৫১ সালে কোলকাতায় জন্ম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। একুশ বছর বয়েস থেকে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে জ্যোতিষের প্রশ্নোত্তর বিভাগ, ছোট গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের ফিচার। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, আনন্দলোক, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, সকালবেলা সাপ্তাহিকী, নবকল্লোল, শুকতারা, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার নিবেদন 'আমার সময়' সহ অসংখ্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে অজস্র ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাধর্মী মনোজ্ঞ রচনা।

Check Also

Chausath Yogini Temple

মানুষ সাধু হয় কেমন করে – সংসারে নিত্য অশান্তি থেকে মুক্তির উপায় – শিবশংকর ভারতী

এমন কোনও বাড়ি নেই যে বাড়িতে অশান্তি নেই অথচ তাদের অভাব অনটন কিছুই নেই। কেন এমনটা হয়, এটা কি কোনও গ্রহের জন্য হয়? এ থেকে মুক্তির উপায় কি?

2 comments

  1. Suryanshu Mitra

    এটা উনি আগে ও জানিয়েছেন

  2. Parantap Rana Mandal

    লক্ষী গনেশ দিওয়ালিতে পূজা করা উচিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.