Thursday , November 23 2017
My Wild India

জঙ্গলের ডাক মানেই কাঁধে হ্যাভারস্যাক!

নদীর দু’পাশ জুড়ে বিস্তীর্ণ সাদা বালিয়াড়ি। আর সেই বালিয়াড়ির ওপর ঝলমলে রোদে খেলা করে বেড়ায় নানান রংবাহারি পাখির দল। আপন খেয়ালে তারা কখনও ডানা মেলে নীল আকাশে। কখনও বা জলের ওপর মেতে ওঠে খুনসুটিতে। নদী ঘেরা যে সাদা বালিয়াড়ি, সেখানে রাজত্ব করে হাজারো প্রজাতির উদ্ভিদ। কতক চেনা আর অধিকাংশই অচেনা। নদীর চর ঘেঁষে অরণ্য ক্রমশ গহন হয়েছে। সেখানে অনেক জায়গায় ভরদুপুরের চড়া রোদেও অন্ধকার বিরাজ করে। ছমছম করে গা। কানে ভেসে আসে পাখির আওয়াজ আর কিছু জন্তু জানোয়ারের ডাক। এ জঙ্গলে আনন্দ আর আতঙ্ক একসঙ্গে মানুষের সঙ্গী সেজে ঘোরে। যাঁরা আমাজনের ভয়াল জঙ্গল চাক্ষুষ করেছেন বা ছবিতে দেখেছেন, এই জঙ্গলে ঢুকলে সেই আমাজন ভ্রম তাঁকে পেয়ে বসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভারতের বুকে আমাজনের ভয়ংকর সৌন্দর্য যদি উপভোগ করতে হয় এই জঙ্গলই তার একমাত্র ঠিকানা। ডিব্রু শইখোয়া। অসমের তিনসুকিয়া জেলায় অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ নদী দ্বীপ জাতীয় উদ্যান। বিশ্বের বৃহত্তম নদী সংগমস্থলও বটে। ৩৪০ বর্গ কিলোমিটারের এই ভারতীয় আমাজনের  উত্তরে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ ও লোহিত নদী। আর দক্ষিণপ্রান্তে ডিব্রু নদী। তিন নদ-নদী দিয়ে ঘেরা দেশের এই সর্ববৃহৎ পক্ষী পর্যবেক্ষণ স্থলের মজাই হল এর গাছগাছালির বিভিন্নতা। গুয়াহাটি থেকে সড়কপথে ৫০০ কিলোমিটার আর ট্রেনে সাড়ে ৪৫০ কিলোমিটার পথ পার করলেই ইট কাঠের জঙ্গল থেকে বহু দূরে আদিম প্রকৃতি জড়িয়ে ধরবে আপনাকে। স্থানীয় বুলিতে ‘ডিব্রু ছৈখোয়া’-র আর এক আকর্ষণ এখানকার বুনো ঘোড়া। ৩৪০ বর্গকিলোমিটার অভয়ারণ্য জুড়ে তাঁদের দোর্দণ্ড প্রতাপ। যাদের চাক্ষুষ করতে বহু দেশ থেকে পর্যটকরা ভিড় জমান এখানে। ডিব্রু শইখোয়া আর এক আকর্ষণ ডলফিন বা গাং শুশুক। দেশের জাতীয় জলচর প্রাণীটির দেখা পেতে ডিব্রু শইখোয়া না এসে উপায় নেই। ১৯৯৯ সালে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পর এখানকার জঙ্গলে বসবাসকারী গ্রামগুলি খালি করতে বলে সরকার। কিন্তু গ্রামবাসীরা রাজি হননি। তাই এখনও ডিব্রুর গহন জঙ্গলে দেখা মেলে ছোট ছোট গ্রামের। প্রকৃতির বুকে ছোট্ট কুঁড়েতে হেসেখেলে দিন কাটায় গ্রামের মানুষগুলো। নদী দিয়ে ঘেরা এই জঙ্গলে পৌঁছতে নদী পার করতেই হয়। সেও এক অন্য মজা। নদীর বুকে নৌকা ভ্রমণ নিজেই একটা মন ভাল করা জলবিহার।

অসম, উত্তরবঙ্গ ঘুরতে চাইলে ডিব্রু শইখোয়া থেকে ভ্রমণ শুরু করাই বিচক্ষণ পর্যটকের কাজ হবে। একটু অন্যধারার অজানা রুটে যাঁরা চেনা জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে পছন্দ করেন। বেড়ানোর পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারের রোমহর্ষণ থেকে যাঁরা নিজেদের বঞ্চিত করতে চাননা। তাঁদের জন্য সবসময় তৈরি ‘মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়া’। ডিব্রু শইখোয়া থেকে বেড়ানো শুরু করার পরিকল্পনাটার কথা জানিয়েছিলেন মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়া নামে ট্যুর অপারেটর সংস্থার বিশেষজ্ঞরা। হেমন্তের হিমেল পরশ গায়ে মেখে যাঁরা কাঁধে হ্যাভারস্যাক ঝুলিয়ে পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চাইছেন তাঁদের জন্য চেনা জায়গাগুলোকে একটু অন্য রুটে, অন্য চোখে দেখার খোরাক খুঁজতেই এসেছিলাম ‘মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়া’-র মানিকতলার দফতরে। আর এসে এখানকার বিশেষজ্ঞ ট্যুর ম্যানেজারদের কাছ থেকে যা শুনলাম তাতে বেশ বুঝলাম ভুল করিনি। ঘোরা শুরু করুন ডিব্রু শইখোয়া থেকে। কতক পরামর্শের সুরেই জানালেন তাঁরা। কেন বলে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেই পারতাম। কিন্তু করিনি। কারণ জানতাম যে ট্যুরটা সম্বন্ধে কথা বলতে শুরু করেছি তার প্রতিটি জায়গা হাতের তালুর মত চেনেন এঁরা। অভিজ্ঞতার ঝুলি তাঁদের টইটম্বুর। ওখানকার স্থানীয় লোকজনও যা জানেন না তা এঁদের বিলক্ষণ জানা। আগামী নভেম্বরের শেষেই কলকাতা ছাড়বেন এঁরা। ২১ দিনের দুর্দান্ত প্যাকেজ নিয়ে এঁরা পর্যটকদের সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়বেন অরণ্যের ডাকে। বুকিং চলছে বলে অনেক অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ দেখলাম খোঁজখবর নিতে আসছেন। বুকিং করে রাখছেন। চেনা সাফারি নয়, বেড়ানো হবে একদম অচেনা, অপ্রচলিত রুটে। যেখানে প্রতি পদে অ্যাডভেঞ্চারের টানটান উত্তেজনাটা আছে। আর আছে সবকটি স্পটেই কিছু বাড়তি প্রাপ্তির সুযোগ। যা সম্ভবত কেবল মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়ার পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। ফলে দেরি না করে শুরু হল কথা।

মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়ার ট্যুর রুট ধরেই এগোল আলোচনা। ডিব্রু শইখোয়া ঘোরা সেরে সোজা অসমের জোরহাটে অবস্থিত হোলোঙ্গাপার গিবন অভয়ারণ্যে। ছোট অভয়ারণ্য। মাত্র ২১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হোলোঙ্গ গাছের জঙ্গল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আর রয়েছে নাহার বলে এক ধরণে ছোট গাছ। এই ঘন জঙ্গলের যাঁরা আদি বাসিন্দা। মানে যাঁদের দেখতে এখানে মানুষের ছুটে আসা, সেই ভারতীয় বনমানুষ বা হুলক গিবনদের এখানে ভরা সংসার। দিব্যি গাছে গাছে গোল গোল বিস্ফারিত চোখ নিয়ে খেলে বেড়ায় এই বনমানুষকুল। খাতায় কলমে লুপ্তপ্রায়দের দলে পড়লেও এই অভয়ারণ্যে ঢুকলে তা মনে হয়না। গিবন অভয়ারণ্যের আর এক মজা এখানে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানোর সুবিধা। অনেক জঙ্গলেই যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাতির ভয় আছে ঠিকই, তবে সঙ্গে থাকে মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের সব জানা। ফলে হাতি থেকে কোনও হানির ভয় থাকেনা। বরং পায়ে হেঁটে সাফারির এক অনাবিল আনন্দ চেটেপুটে উপভোগ করা যায়।

যেহেতু ডিসেম্বরের শুরুটা পাওয়া যাচ্ছে তাই গিবনে দুটো দিন কাটিয়ে এঁরা সকলকে নিয়ে সোজা পাড়ি দেবেন নাগাল্যান্ড। গিবন থেকে বেশি দূর নয়। নাগাল্যান্ডে হর্নবিল উৎসবের সাক্ষী হওয়া এক অন্য অভিজ্ঞতা। নাগাদের বাৎসরিক উৎসব। নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন জনজাতি এখানে হাজির হন তাঁদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, নাচ-গান-বাজনা নিয়ে। দেখা যায় নানা ধরণের বাহারি পোশাক। কত রং, কত যে তাদের অবাক করা ধরণ, তা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। তাক লাগিয়ে দেয় পুরুষ বা মহিলাদের অঙ্গে থাকা অলঙ্কারও। সোনাদানার বালাই নেই। কিন্তু সে অলঙ্কারের রঙের ছটা চোখ ধাঁধিয়ে দিতেই পারে। এখানে যেসব স্থানীয় বাদ্য ব্যবহার হয় তার অধিকাংশই অচেনা মনে হতে পারে। তাদের আওয়াজও ভিন্ন। কিন্তু বাজতে শুরু করলে সুরের যাদুর মাদকতা নামীদামী বাদ্যযন্ত্রের চেয়ে কোনও অংশে কম যায়না। তাই হর্নবিল দেখার সুযোগ পেলে ছাড়াটা বোকামিই হবে।

হর্নবিল দেখে সেখান থেকে সোজা কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যানে। অসমের গোলাঘাট ও নগাঁও জেলা জুড়ে এর বিস্তৃতি। ১৯০৮ সালে জন্ম নেওয়া এই অভয়ারণ্যকে ১৯৮৫ সালে বিশ্বের অন্যতম হেরিটেজ ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত করে ইউনেসকো। জঙ্গল একটাই। কিন্তু এখানেই একাধারে লালিত হচ্ছে একশৃঙ্গ গণ্ডার আর বাঘ। বিশ্বে বাঘেদের যত অভয়ারণ্য রয়েছে তার মধ্যে কাজিরাঙ্গাতেই বাঘের ঘনত্ব সর্বাধিক। এই জঙ্গল আবার হাতি, জলহস্তী আর হরিণের নিশ্চিন্ত আবাসস্থল। আর কী আছে এখানে? হিমালয়ের কোলে হওয়ায় পাহাড় ঘেরা জঙ্গলে রয়েছে অনেক জলাভূমি। বহ্মপুত্র নদ বয়ে গেছে পাশ দিয়েই। এমন এক জায়গায় যে পাখিরা নিজেদের নিশ্চিন্ত ঠিকানা খুঁজে নেবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই এই অভয়ারণ্যে বছরভর হাজারো রকমের পাখির দেখা মেলে। ৩৭৮ বর্গ কিলোমিটার জঙ্গলের নামকরণের ইতিহাস এখানে লোকমুখে ঘোরে। স্থানীয়দের মতে, এখানেই একটি গ্রামে কোনও এক সময়ে একটি মেয়ে থাকত। নাম ছিল রাঙা। কার্বি আংলং-এর বাসিন্দা কাজি নামে একটি ছেলের সঙ্গে রাঙার ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সমাজ তাদের এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। কিন্তু তারা একে অপরকে ছেড়ে থাকতেও পারবেনা। অগত্যা ওরা ঠিক করে পালাবে। কিন্তু কোথায়? কথিত আছে একদিন সকলের চোখ এড়িয়ে কাজি আর রাঙা এই হাতি ঘাসে ভরা গহন জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। তারপর থেকে তাদের আর কেউ কখনও দেখতে পায়নি। কাজি আর রাঙার সেই অমর প্রেম গাথা থেকেই পরবর্তীকালে এই জঙ্গলের নাম হয় ‘কাজিরাঙ্গা’। এখানকার বিশেষত্বই হল এখানকার জলা জমি আর হাতি ঘাস। যে হাতি ঘাসে দিব্যি ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ে আস্ত বাঘ। মানুষের চেয়েও বড়বড় ঘাসের মধ্যে কোথায় যে বাঘ লুকিয়ে আছে তা খুঁজে পাওয়া মানুষের সাধ্য নয়। তাই এ জঙ্গলে একটু অন্য রুটে না ঘুরলে, চর্ম চক্ষে উপভোগ না করলে, বেড়ানোটাই বৃথা হয়ে যাবে। এখানকার আরও এক আকর্ষণ ‘হগ ব্যাজার’। প্রাণিটিকে দেখলে মনে হবে শূকর আর বেঁজির কোনও শঙ্কর সংস্করণ। তবে জঙ্গলে ঢুকলেই যে সব প্রাণির দেখা মিলবে তা কিন্তু নয়। কেবল যেসব বিশেষজ্ঞ পর্যটকদের কাজিরাঙ্গাকে একটু অন্যভাবে ঘোরাতে পছন্দ করেন, তাঁরাই জানেন কিভাবে, কোন সময়ে এবং জঙ্গলের কোথায় হাজির হলে বাঘ, গণ্ডার থেকে শুরু করে হগ ব্যাজারের দেখা মেলা সম্ভব।

কাজিরাঙ্গা দর্শন শেষ করে এখান থেকে পাড়ি দেওয়া হবে পবিতরা  অভয়ারণ্যের দিকে। গুয়াহাটির খুব কাছে হলেও অসমের মরিগাঁও জেলায় অবস্থিত এই গহন জঙ্গলের ৩৮ বর্গ কিলোমিটার অভয়ারণ্য হিসাবে চিহ্নিত। তবে এর মাত্র ১৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়েই বহাল তবিয়তে বেড়ে চলেছে একশৃঙ্গ গণ্ডারের দল। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক একশৃঙ্গ গণ্ডারের নিশ্চিন্ত আশ্রয় পবিতরার ঘন জঙ্গল। ঘুরতে যাবেন আর ছবি তুলবেন না তা কী হয়? তবে সব অভয়ারণ্যেই যে ছবি তোলার মত যুতসই জায়গা পাওয়া যায় তা কিন্তু নয়। পবিতরার এই এক বাড়তি সুবিধা। এখানে ২৫ ফুট উঁচু একটি বাঁধ দেওয়ায় পর্যটকদের উপর থেকে ছবি পেতে অর্থাৎ এরিয়াল ভিউ পেতে সুবিধা হয়। পবিতরার একটা বড় আকর্ষণ এখানকার বুনো মোষ। লম্বা লম্বা বিশালাকায় শিংয়ের এসব বুনো মোষ ঘাস জমিতে বেজায় আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। এমনিতে নিরীহ। তবে এদের না খোঁচানোই ভাল। কারণ ক্ষেপে গেলে বুনো মোষের চেয়ে ভয়ংকর খুব কম প্রাণিই আছে। পবিতরা অভয়ারণ্যকে ঘিরে রেখেছে একটি ক্যানাল। জঙ্গলে ঢুকতে পার করতে হয় একটি ঝুলন্ত সেতু। হাদুগ হ্যাঙ্গিং ব্রিজ। ব্রিজ থেকেই দেখা যায় হাতির পাল। জলে নিজেদের খেয়ালে স্নান করতে ব্যস্ত বড় থেকে ছোট সব সাইজের হাতি। পবিতরায় রাত কাটানোর মজাই আলাদা। আর তা যদি চাঁদনি রাত হয় তাহলে তো কথাই নেই। চুপ করে কটেজের বারান্দায় বসে থাকলে দূর থেকে কখনও ভেসে আসে হাতির আওয়াজ। কখনও অচেনা সুরের ডাক। গোটা জঙ্গলটা যেন রাতের আলো আঁধারিতে নিজেদের মধ্যে চুটিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠে। আর সেই না ভোলা পরিবেশে পেট পুজোর জন্য সুস্বাদু অর্গানিক ফুডের সম্ভার মানে তো সোনায় সোহাগা।

পবিতরায় কাটিয়ে অসম ছেড়ে মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞেরা পর্যটকদের সঙ্গে করে ঢুকে পড়বেন পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলা যেখানে ভুটানের সঙ্গে সীমান্ত ভাগাভাগি করে নিয়েছে সেখানেই বক্সা পাহাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বক্সা জাতীয় উদ্যান। ব্যাঘ্র সংরক্ষণের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই অভয়ারণ্যে যেমন রয়েছে নদী, তেমন রয়েছে হিমালয়ের পাদদেশের জঙ্গলঘেরা অপার সৌন্দর্য। এ জঙ্গলের একটা মজা আছে। যা অন্য জঙ্গলগুলো থেকে একে কিছুটা আলাদা করেছে। অন্যান্য জঙ্গলে সকালে জন্তুজানোয়ার হৈহৈ করে ঘোরে। কিন্তু বক্সায় সকাল কাটে নিঃশব্দে। জয়ন্তী নদীর ধার ঘেঁষে লেপ্টে থাকা গোটা জঙ্গলটাই যেন দিনের আলোয় ঘুমিয়ে থাকে। জঙ্গলের ঘুম ভাঙে সূয্যিমামা পাটে গেলে। এ জঙ্গলে যত রাত নামে ততই আদিম আনন্দে মেতে ওঠে বন্য জীবন। শুরু হয় কথা। ডাকাডাকি। সেই অকৃত্রিম মাদকতার স্বাদ পেতে শব্দ করতে নেই। জ্বালাতে নেই আলো। রাতের জঙ্গলে শুধু কান পেতে থাকা। আর আলো-আঁধারিতে চোখ রাখা। রাত গভীর হতে থাকে। কখনও জঙ্গলের গ্রামগুলো থেকে ভেসে আসে হৈহৈ দুমদাম আওয়াজ। হাতি তাড়ানোর দেহাতি কৌশল। কখনও খুব কাছেই ডেকে ওঠে দামাল দাঁতাল। যে মাঠে সকালে গ্রামের ছেলেছোকরার দল ফুটবল খেলে, রাত বাড়লে সে মাঠের দখল নেয় দাঁতাল বাহিনী। হাতিদের ফুটবল কিনা জানা নেই, তবে মাঠ জুড়ে শুরু হয় ভারী পায়ের দাপাদাপি। কখনও বা আবার জঙ্গলের অন্যপ্রান্ত থেকে ভেসে আসে আজব শব্দ। ‘টোকে গ্রেকো’ ডাকছে। কী বার্তা দিতে চাইছে সে? সে বোঝা সাধারণ মানুষের কম্ম নয়। তবে উত্তর আসে। উত্তর আসে জঙ্গলের অন্য আর এক প্রান্ত থেকে। শুরু হয় কথাবার্তা। এ আলাপে যোগ দেওয়ার উপায় নেই ঠিকই। তবে শ্রোতা হওয়াও রোমাঞ্চ আছে বৈকি।

বক্সার মোহ কাটিয়ে ব্যাগ কাঁধে এবার গন্তব্য গরুমারা গাছবাড়ি। গাছবাড়ি বা ধূপঝোরা এলিফ্যান্ট ক্যাম্প। ডুয়ার্সের গরুমারা অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া মূর্তি নদীর ধারে এই গাছবাড়ি এলাকা হাতির জন্য বিখ্যাত। নদীর জলে হাতির স্নান পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। পর্যটকরা চাইলে এখানে হাতিদের নদীর জলে স্নান করিয়েও দিতে পারেন। হাতিদের আস্তাবল বলে পরিচিত হলেও গরুমারার জঙ্গলে রয়েছে বাইসন, গণ্ডার সহ নানা জন্তু। গাছবাড়ির বারান্দা থেকে সামনের ফাঁকা ঘাসজমিতে অনেক প্রাণিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে। গরুমারার আর একটা সুবিধা পায়ে হেঁটে ঘোরা। জঙ্গলের মধ্যে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলার মধ্যে একটা অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ তো আছেই। গরুমারায় মূর্তি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখাও একটা না ভুলতে পারা অভিজ্ঞতা। পড়ন্ত বিকেলের সেই রূপের ছটা কিছুক্ষণের জন্য সব ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাছাড়া গরুমারা গাছবাড়িতে রাত কাটানো বা ওয়াচ টাওয়ার থেকে বহু দূর বিস্তৃত চা বাগান, ঘন জঙ্গল, মূর্তি নদী আর বিশাল ঘাস জমি দেখতে পাওয়া যায়। এককথায় যাকে বলে ‘প্যানারমিক ভিউ’।  সব মিলিয়ে গরুমারা গাছবাড়ি ডুয়ার্সের এক অনন্য প্রাপ্তি।

গরুমারা থেকে মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়ার সর্বশেষ গন্তব্য থুঙ্গসং। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে একটি ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা বাংলো। যেখানে এখনও সাহেবি কেতায় থাকার সুযোগ পান পর্যটকেরা। আর টি এস্টেটের মধ্যে ঝর্না, পিকনিক স্পট এসব তো রয়েইছে। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘোরার পর থুঙ্গসং দিয়ে এই ট্যুরে ইতি টানাই ভাল। জানালেন মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞেরা। কারণ তাঁদের মতে, অনেক ঘোরাঘুরির পর ফের শহরে ফিরে জনারণ্যে কর্মব্যস্ত জীবনে প্রবেশের আগে একটা সুন্দর বিশ্রামের নাম বোধহয় থুঙ্গসাং। যেখানে রাজার হালে থাকা আছে, দারুণ দারুণ খাওয়া আছে, ক্লান্তি দূর করার জন্য হিমালয় আছে, আরাম কেদারা আছে, চা বাগান আছে, বুক ভরা অক্সিজেন আছে, আর আছে দিনভর আলস্যকে আশকারা দিয়ে শেষ কদিনের বেড়ানোটার একটা রোমন্থনের সুযোগ। যা আপনাকে কাজে ফেরার আগে বুক ভরা অক্সিজেনে ভরিয়ে তুলবেই তুলবে।

(ছবি – সৌজন্যে – মাই ওয়াইল্ড ইন্ডিয়া)

About Rajarshi Chakraborty

স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর। ফ্রিলান্সার হিসাবে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। তবে লেখালিখির নেশাটা স্কুল জীবন থেকেই। স্কটিশ চার্চ স্কুলে পড়তে দেওয়াল পত্রিকা দিয়ে লেখা শুরু। কলেজ জীবন থেকেই বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হতে থা‌কে। সাংবাদিক হিসাবে প্রথম চাকরি মিঠুন চক্রবর্তীর ‘সিগনাস’-এ। এখানে টিভি নিউজ ‘আজকের খবর’ ও দৈনিক সংবাদপত্র ‘খবরের কাগজ’-এ চুটিয়ে সাংবাদিকতা। এ সময়েই সাংবাদিকতা জগতে পরিচিতি। এরপর ‘বাংলা এখন’ চ্যানেলে কাজ। পরে কলকাতার সারা জাগানো ‘কলকাতা টিভি’-তে সাংবাদিক হিসাবে যোগদান। গল্প, কবিতা থেকে প্রবন্ধ, সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর লেখায় বরাবরই সাবলীল। বাংলাদেশের খেলার পত্রিকা, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রকাশিত বাংলা ম্যাগাজিন ‘উৎসব’ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত কিশোর ভারতী ও সাফল্য পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা নজর কেড়েছে।

Check Also

Hafiz Muhammad Saeed

মুম্বই হামলার মাস্টারমাইন্ড হাফিজ সঈদকে মুক্তি দিল পাক জুডিশিয়াল রিভিউ বোর্ড

মুম্বই হামলার মাস্টারমাইন্ডকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের জুডিশিয়াল রিভিউ বোর্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *