বাংলার হস্তশিল্পীরা কি প্রাপ্য কদর পাচ্ছেন, আগামীর আলো দেখাতে পারে বৃহত্তর আঙিনা
বাংলার মাটি বাংলার জলে সমৃদ্ধ বঙ্গের শিল্পকলা। যা বাংলার নিজস্ব হস্তশিল্প বলেই পরিচিত। বিশ্বজোড়া যার খ্যাতি। কিন্তু বঙ্গের হস্তশিল্পীরা কি প্রাপ্য কদর পাচ্ছেন?
মৌসুমি গুহ মান্না, কলকাতা : বঙ্গভূমির যেদিকেই তাকানো যায় বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজের সমারোহ দেখা যায়। যেখানে কাঠ, বাঁশ, বেত, মাটি, পাথর, কাগজ, কাপড় ইত্যাদি সব প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি কাজ চোখে পড়ে। বংশপরম্পরায় বহু মানুষ শুধুমাত্র হস্তশিল্পকে আশ্রয় করেই জীবিকানির্বাহ করে চলেছেন।
বাংলার হস্তশিল্পের ইতিহাস আজকের নয়। কয়েকশো বছর, এমনকি কয়েক হাজার বছরের পুরনো শিল্পও এখানে রয়েছে। এতদিন শিল্পীরা নিজেদের কাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়েও সেভাবে প্রচারের আলোয় আসতে পারেননি। ক্রেতারাও সরাসরি শিল্পীদের কাছ থেকে তাঁদের কাজ দেখে কিনতে পারেননি। কোনও না কোনও ভাবে বঞ্চিত হয়েছেন উভয়পক্ষই।
বিগত কয়েক বছর ধরে শিল্পীরা একটা মাধ্যম পেয়েছেন। মাধ্যম বলতে আসলে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত মেলার কথাই বলা হচ্ছে। যেখানে কারিগররা সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছেন। কেনাবেচার পাশাপাশি আলাপচারিতাও চলছে। এক জায়গায় মিলিত হচ্ছে দিঘা থেকে দার্জিলিং। শিল্পীদের মতে এ এক দারুণ সুযোগ।
এর ফলে ক্রেতারা যেমন খাঁটি জিনিসটা সঠিক দামে পাচ্ছেন, তেমনই কারিগররাও তাঁদের হাতের কাজের দাম পাচ্ছেন। দেশ বিদেশে তাঁদের পরিচিতি তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে রোজগারের পরিসর।
বসিরহাটের মিতালী ঘোষ বাড়িতে তৈরি ঘি, গুড়, বাদাম চাক, চিঁড়ের বিস্কুট নিয়ে প্রতিটা মেলায় পসরা সাজিয়ে বসেন। কোচবিহারের শীতলপাটির কারিগর শঙ্করী অধিকারীও নিজের ব্যাগ বানানোর দক্ষতা দেখাতে উপস্থিত হন বিভিন্ন মেলায়। মেলা থেকেই তৈরি হয় যোগাযোগ। ক্রেতাদের চাহিদা মত বছরভর অর্ডার সাপ্লাই করে জীবিকা নির্বাহ করেন শঙ্করী। আবার কচুরিপানা, কাঠ, বাঁশ, সুপুরি পাতা দিয়ে হাতের কাজ করে বিভিন্ন মেলায় বিক্রি করেন ছন্দাদেবী।
শোলাশিল্পী অমিতা মিশ্র, ঝুড়ির কারিগর পূর্ণিমা শীল, পটশিল্পী হাসিনা কিংবা সেরামিক শিল্পী ইন্দ্রাণী সাহার মত মানুষদের এক জায়গায় পাওয়া সম্ভব হচ্ছে মেলাগুলির কারণেই। যা শুধুমাত্র আনন্দদায়ক নয়, বহু মানুষের জীবনযাত্রায় সহায়তা করছে। ক্রেতা এবং কারিগরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হওয়ার কারণে দাপট কমেছে মধ্যস্বত্বভোগীদেরও।
সবলা থেকে সরস, এমন নানা মেলায় সাধারণ মানুষ হাতে নিয়ে দেখছেন শিল্পীদের কাজ। কিনছেন পছন্দ মত। দরকারে ফোন নম্বর নিয়ে রাখছেন শিল্পীদের। বছরের অন্য সময়ও অর্ডার দিচ্ছেন। যা শিল্পীদের শিল্পকে যেমন বাঁচার পথ খুলে দিচ্ছে, তেমনই তাঁদের আগামী প্রজন্মকে এই পারম্পরিক শিল্পকর্ম বিমুখ হতে দিচ্ছেনা।
এতে শিল্প বাঁচছে। বাঁচছে বাংলার ঐতিহ্য। তবে কেবল শীতকালে নয়, এইসব শিল্পীদের শিল্পকর্মকে সকলের সামনে তুলে ধরতে প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি রাজ্যে যদি সারা বছরের জন্য এমন কোনও আয়োজন সম্ভব হয়, তাহলে বাংলার শিল্প তার অর্থকরী দিককে যেমন শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে, তেমনই শিল্পীরা বৃহত্তর আঙিনা পাবেন। তাঁদের শিল্প পাবে আরও বেশি কদর। পৌঁছবে আরও বেশি মানুষের কাছে।













