Friday , October 20 2017
Bengali Feature

সুর তাল ছন্দ, স্নানঘর বন্ধ!

মেয়েটির নাম জেনি আইকো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জেনি পেশায় একজন গায়িকা। পাশাপাশি তিনি গানও লেখেন। তরুণী জেনি সম্প্রতি এমন একটি কাণ্ড করেছেন, যার জেরে তাঁকে নিয়ে আমেরিকা জুড়ে হইহই করছেন ওঁর অগুনতি ভক্ত। কী করেছেন জেনি? নিজের ফ্ল্যাটের বাথরুমে বসে জেনি মনের সুখে একটি গান গেয়েছেন। গানটির কথা হল, মাই লাভ, মাই লাভ, মাই ওয়ান অ্যান্ড ওনলি লাভ। টয়লেটে বসে এই গানটি গাওয়ার সময়ে জেনি তাঁর মোবাইলের ক্যামেরা অন করে রেখেছিলেন। সেই ছবিই পরে ছড়িয়ে দিয়েছেন। প্রখ্যাত গায়িকা জেনির এই অভিনব কাণ্ডে রীতিমতো অভিভূত তাঁর মার্কিন ভক্তেরা।

বাথরুমে বসে জেনির গাইবার ছবি দেখে অনেকেই ইতিমধ্যে জেনিকে আরও এগিয়ে চলার শুভেচ্ছা জানিয়ে ট্যুইট করেছেন। কোনও কোনও অত্যুৎসাহী জেনিকে ট্যুইট করে এ পরামর্শও দিয়েছেন, জেনির এবার উচিত টয়লেটে বসে গান গেয়ে নিজের একটি অ্যালবাম অবিলম্বে প্রকাশ করে ফেলা। জেনিও তাঁর ভক্তকুলকে পাল্টা ট্যুইট করে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখেছেন, আপনাদের ভালো লেগেছে বলে ধন্যবাদ জানাই। আসলে আমার ভিতর একজন পাগল বসবাস করে। সেই আমায় দিয়ে এই পাগলাটে কাণ্ডখানা করিয়েছে।

কিন্তু বাথরুমে গান গাওয়া কি পাগলামি? জেনির মতো পেশাদার বিখ্যাত গায়ক বা গায়িকা হওয়ার মতো প্রতিভা তো সকলের থাকেনা। কিন্তু তাবলে কী কেউ বাথরুমে থাকাকালীন দু-এক কলি গান গুনগুনিয়ে গান না? কেউ কেউ আবার গায়ে জল পড়লে গলা ছেড়েই গেয়ে উঠেন। সে গানের তালিকায় থাকতে পারে স্বর্ণযুগের বাংলা গান থেকে শুরু করে, সাম্প্রতিককালের ব্যান্ডের গান অথবা মনে ঘোর লাগা জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার গান।

হ্যাঁ, বাথরুমটা অনেকের কাছেই গান গাওয়ার পক্ষে একটা আদর্শ জায়গাও বটে। কেন বাথরুমে মানুষ গান গায়, গায়ক বা গায়িকার সুর থাকুক বা নাই থাকুক – তিনি কতরকমভাবে গান গেয়ে, কেনই বা নিজেকে উপস্থাপন করেন, তা নিয়েও কিন্তু বিস্তর চিন্তাভাবনা করা হয়েছে। আজব এই গবেষণায় জানা গিয়েছে, মানুষের মানসিকতা ও প্রবণতা সম্পর্কে নানান বিচিত্র তথ্য।

মানব সভ্যতার অন্যতম চিহ্ন হল তার ব্যবহারের শৌচাগারটি। স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইতে সকলেই সিন্ধু সভ্যতার স্নানাগারের ছবি দেখেছেন। সে সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরও পরীক্ষার হলে বসে লিখতে হয়েছে। ঐতিহাসিক ইবন খালদুন ১৩৭৭ খ্রিষ্টাব্দে একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ‘মুকাদ্দিমা’। আরব ঐতিহাসিক ইবন লিখতেন সমাজতত্ত্ব নিয়ে। এছাড়া, মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কাজ রয়েছে। মুকাদ্দিমাতেই ইবন উল্লেখ করেছেন সে কালের মানুষের কিছু সাংস্কৃতিক অভ্যাসের প্রসঙ্গ। দেখা যাচ্ছে, সেই প্রাচীন সময়েও মানুষ শৌচাগারে থাকাকালীন গান গাইতে ভালোবাসতেন। এটা সেকালের সমাজের অনেক বাসিন্দার কাছে ছিল একটি প্রাত্যহিক অভ্যাসের মতন।

ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল নবীন সঙ্গীত প্রতিভার সন্ধানে একটি রিয়্যালিটি শোয়ের আয়োজন করেছিল। ওই রিয়্যালিটি শোটি কয়েক বছর আগে প্রতি রবিবার রাত ন’টার সময় টিভি খুললেই দেখা যেত। নবীন গায়ক-গায়িকারা বাথরুমের আদলে নির্মিত সেটে গান শোনাতেন। ওই প্রতিযোগীদের ভিতর থেকেই যথাযোগ্য প্রতিভার বিচার করতেন রবি কিষাণ ও শিবানী কাশ্যপ। আর দর্শকরা টেলিভিশনের পর্দায় তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগও করতেন। ফলে এ কথা বলাই যায়, জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা!

তবে সাম্প্রতিককালে ঘরবাড়ি ছোট হয়ে যাচ্ছে। পুরনো আমলের বাড়ি-ঘরদোর ভাঙা পড়ছে। মধ্যবিত্ত এখন ফ্ল্যাটমুখী। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানুষজন যে পরিসরের ফ্ল্যাটগুলি কিনছেন, পুরনো বাড়িগুলির তুলনায় ওই ঘরদোরগুলি সাধারণত বেশ ছোটমাপের। বলাবাহুল্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাথরুমটির পরিসর আরও সংক্ষিপ্ত।

তাহলে কি এখন আর মানুষজন বাথরুমে একলা থাকাকালীন নিজের মনে কিংবা সোচ্চারে ভালোলাগার গানের কলি গেয়ে উঠবেন না? সেলসের পেশায় থাকা রীতা নাগ নামে এক তরুণীর দাবি গান গাইবার বা গান শোনার মতো সময়ই তো নেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠামাত্রই ব্যস্ততার শুরু। বাথরুমে থাকাকালীনও মোবাইলটি সঙ্গে রাখতে হয়। কখন বস বা অফিস থেকে কোনও জরুরি ফোন আসবে, তা তো আর আগেভাগে গুণে বলা যায় না। রীতার মতো আরও নানান পেশা যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে শুরু করে ছোটখাটো ব্যবসা করা তরুণ-তরুণী পর্যন্ত, ওঁদের অধিকাংশই জানালেন, অনেক সময়ই বাথরুমে থাকাকালীনও মোবাইলে কল রিসিভ করতে হয়। প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সাঙ্গ করতে হয়।

বাথরুমে গান গাওয়ার মতো নিষ্পাপ আনন্দটুকু পাওয়ার অবসর কেড়ে নিয়েছে আমাদের জীবনের অতি ব্যস্ততা। হয়তো সেই কারণেই তরুণী মার্কিন গায়িকা জেনি বাথরুমে গান গেয়ে তাঁর ফুটেজ বিলিয়ে দিয়েছেন। ভেবে দেখলে এও একরকম বিদ্রোহই! সময়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

কিন্তু এত জায়গা থাকতে কেনই বা বাথরুমে গান গাইতে ভালোবাসে মানুষ? বাথরুম যে শিল্পচর্চার পক্ষে খুব একটা উপযুক্ত স্থান নয়, তা তো বলাইবাহুল্য। তা হলে?

তন্নতন্ন করে এই কৌতূহলের নিরসন ঘটাতে গিয়ে পাওয়া গেল এ ব্যাপারে আরও আজব কিছু তথ্য। সেটা হল, কী কী কারণে আর কেনই বা বাথরুমকে নিজের সঙ্গীতচর্চার পক্ষে একটি আদর্শ জায়গা হিসাবে বেছে নেওয়া হয়। একঝলক দেখে নেওয়া যাক সেই কারণগুলি ঠিক কী কী :

কারণ এক – যেমন ধরুন কেউ হয়তো গায়ক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর গলায় মোটেও সুর নেই। বাথরুমে গান গেয়ে সেক্ষেত্রে তিনি তাঁর অবদমিত আকাঙ্ক্ষা মেটান।

কারণ দুই – বাথরুম হল একটি নিভৃত ও গোপন স্থান। এখানে যা খুশি করা চলে। সেই ইচ্ছা থেকেও মানুষ বাথরুমে নিজের সঙ্গে খেয়ালখুশি মতো খানিকটা সময় কাটানোর জন্যে খোলা গলায় গান গাইতে পারেন।

কারণ তিন – কেউ কেউ আবার বাথরুমের মেঝেটিকে স্টেজ হিসাবে ভেবে নিয়ে গান গাইতে গাইতে নিজেকে একজন বিশিষ্ট শিল্পী হিসাবে কল্পনা করতে ভালোবাসেন।

কারণ চার – কেউ কেউ আবার গানটাই গান না। বাথরুমে থাকাকালীন মুখ দিয়ে নানারকম বাজনার আওয়াজ বের করার চেষ্টা করেন।

কারণ পাঁচ – বাথরুমে যখন কেউ ঢোকেন তিনি বেশ খানিকটা সময়ের জন্যে একাই থাকেন। একা থাকার এই সময়টুকু তিনি কেবল নিজেকেই উপভোগ করতে চান। সেই ইচ্ছা থেকেও বাথরুমে কিছুক্ষণ সময় গানবাজনা করে নেন।

কারণ ছয় – অনেকে আবার এত জোরে গান গাইতে থাকেন যে বাইরে থেকে শ্রোতারা তাঁকে বলবেনই, এবার তোমার গানটা থামাও হে। এই কথাটা শোনার জন্যেও অনেকে বাথরুমে গলা ছেড়ে গান গেয়ে থাকেন।

কারণ সাত – কেউ কেউ আবার লোকজনকে হাসাতে ভালোবাসেন। সেই মানুষটি নিশ্চিতভাবে জানেন, তাঁর মোটেও গানের গলা নেই। কিন্তু লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান তিনি। সেই বাসনা থেকেই বাথরুমে তাঁর নাচন-কোঁদন চলে দিনের কিছুটা সময়।

এরকম আরও অনেক আজব কারণ পাওয়া যাবে। তবে বাথরুমটিই হল মানুষের চরম প্রাইভেসির জায়গা। তাছাড়া, বাথরুমের পরিবেশে গান গাইলে অনেক সময়ই চারপাশ বন্ধ থাকার দরুন প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে। এতেও অনেকে মজা পান। বিশেষত কিশোর-কিশোরীরা।

প্রাচীন কালেও তো ছিল বাথরুম সিঙ্গার। আবার এ যুগের প্রখ্যাত শিল্পীরা বাথরুমে গান গেয়ে সেই তথ্য প্রকাশ করে দিচ্ছেন ভক্তদের। সুতরাং, ধরে নেওয়া যায়, বাথরুমে ঠিকঠাক গান গাইতে পারলেও এ যুগে রীতিমতো পাবলিসিটি মিলবে। স্বীকৃতি পাবে শিল্পী হিসাবে আপনার চিন্তাভাবনার অভিনবত্ব।

অতএব, বাথরুম জিন্দাবাদ!

(চিত্রণ – বিশ্বজিৎ)

About Arnab Dutta

স্কুলের গণ্ডি পার করেই ফ্রিলান্সার হিসাবে লেখালেখি শুরু আনন্দমেলা, জনমন জনমত, সানন্দা পত্রিকা, আকাশবাণীতে। ১৯৯৩ সালে প্রথম চাকরি মিত্র প্রকাশনীতে। স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে দৈনিক কাগজের চাকরিতে হাতেখড়ি ওভারল্যান্ডে। এরপর আনন্দবাজার, আজকাল, সকালবেলা-সহ কয়েকটি বাংলা কাগজের নিউজ ডেস্কে চাকরি। কলকাতার কয়েকটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলেও কাজ করার অভিজ্ঞতা। প্রথম লেখা ছোটগল্পটি ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় আনন্দমেলায়। ইতিমধ্যে প্রায় তিন ডজন বাংলা ছোটগল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আপাতত লেখাকেই পেশা করেছেন লেখক-সাংবাদিক অর্ণব দত্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *