Tuesday , June 19 2018
Gangasagar

সাগরমেলার মহাসঙ্গমে – শিবশংকর ভারতী

তখন মহাভারতীয় যুগ। এ কথা মহাভারতের। প্রসঙ্গক্রমে এক সময় ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির জানতে চাইছেন দেবর্ষি নারদের কাছে,

“যে লোক তীর্থ পর্যটনে ব্যাপৃত হইয়া সমগ্র পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে, তাহার কি ফল হয়,তাহা আপনি সমস্ত বলুন।”

এ জিজ্ঞাসার উত্তরে দেবর্ষি বললেন, “রাজা! মনোযোগী হইয়া শ্রবণ করুন- যেমন বুদ্ধিমান্ ভীষ্ম পুলস্ত্যের নিকট এই সকল শ্রবণ করিয়াছিলেন।”

আনুমানিক ৪৪৫০ বছর আগের কথা। নানা তীর্থের মাহাত্ম্য কথা হরিদ্বারে বসেই ঋষি পুলস্ত্য বলেছিলেন গঙ্গানন্দন মহামতি ভীষ্মকে,

“রাজশ্রেষ্ঠ! জ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন যে, মানুষ গঙ্গাসাগরসঙ্গমে স্নান করিয়া অশ্বমেধযজ্ঞের দশগুণ ফল লাভ করে।” (মহাভারত, বনপর্ব্ব, সপ্ততিতমোহধ্যায়)

সেই প্রাচীন ও পরম পবিত্র তীর্থ গঙ্গাসাগরসঙ্গমে এমন মাহাত্ম্যপূর্ণ স্নানের আকর্ষণে অগণিত তীর্থকামী অতীতে এসেছেন, আসছেন আজও, আসবেন অনাগত ভবিষ্যতেও।

এবার আসি লর্ড ওয়েলেসলির শাসনকালে (১৭৯৮-১৮০৫) গঙ্গাসাগর কথায়। এই সময়, তার আগেও হয়তো ছিল, পুত্র বা কন্যাকে ভাসিয়ে দেওয়ার একটা কথা প্রচলিত ছিল গঙ্গাসাগরসঙ্গম তীর্থে। এটা সীমাবদ্ধ ছিল যাদের বন্ধ্যাত্ব দোষের জন্য সন্তান হত না। কিংবা যাদের সন্তান হয়ে মারা যেত। এদের অনেকেই মানসিক করত সন্তান হলে প্রথম শিশু সন্তান, সে পুত্র বা কন্যা যাই হোক না কেন, ভাসিয়ে দেবে সঙ্গম তীর্থের জলে। এই মানতের কারণে সেকালে অনেকেই নবজাত শিশুকে নিয়ে যেত সাগরমেলায়। সেখানে থাকত পুরোহিত। জানাত তাদের উদ্দেশ্য। কিছু মন্ত্রাদি পাঠ করতেন তিনি। তারপর নির্দয় পিতামাতা নিষ্পাপ শিশুকে বিসর্জন দিতেন সাগরসঙ্গমে। ফিরে আসতেন শূন্য হাতে।

মমতাশূন্য এই নিষ্ঠুর প্রথার কথা কানে গেল লর্ড ওয়েলেসলির। তিনি এই নির্মম প্রথা রোধ করতে এক ঘোষণাপত্র প্রচার করলেন ১৮০২ সালে খ্রিস্টাব্দের ২০ আগস্ট মতান্তরে ২২ আগস্ট। তারপর একদল সিপাই পাঠালেন গঙ্গাসাগরে। এই প্রথা রোধের প্রতিবাদে খানিক ঝড় উঠল সেকালের হিন্দুসমাজে। সে ঝড়ও থেমে গেল একসময় প্রকৃতিরই নিয়মে।

মহাকালের নিয়মে যে কোনও তীর্থে পরিবর্তন হয় পরিবেশের, কিন্তু তীর্থ মাহাত্ম্য কখনও লুপ্ত হয় না। গঙ্গাসাগরসঙ্গম তীর্থও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই তো শত শত বছর ধরে সাগরসঙ্গমে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তপ্রাণ পুণ্যার্থী, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধুসন্ন্যাসীরা ছুটে আসেন অনাবিল পারমার্থিক পরমানন্দ লাভের আশায়। তীর্থরাজ প্রয়াগ কিংবা মোক্ষভূমি হরিদ্বারের কুম্ভের মতোই অতি সাধারণ বেশে আসা আত্মজ্ঞানী শত সহস্র মহাপুরুষের চরণধূলিতে ধন্য হয়েছে গঙ্গাসাগরসঙ্গম, সাগরমেলা অঙ্গনও। সেইজন্যেই তো সাগরমেলার প্রসিদ্ধি মহামতি ভীষ্মের কাল থেকে আজও সারা ভারতে জুড়ে।

আজ থেকে প্রায় ১৮১ বছর আগের কথা। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি ১২৪৩ বঙ্গাব্দের ২৩ মাঘ। সেকালে গঙ্গাসাগরমেলা প্রসঙ্গে ‘হরকরা’ পত্রিকায় পরিবেশিত সমাচারটি ছিল এই রকম–

“গঙ্গাসাগর মেলা।– প্রতি বৎসর প্রায় দিসেম্বর মাসের মধ্য সময়ে অনেক নৌকা ও মাড় সাগর উপদ্বীপের এক টেঁকে একত্র হইতে আরম্ভ হয়। ঐ স্থানে যে এক মন্দির আছে তাহা লোকে কহে যে ১৪০০ বৎসর হইল গ্রথিত হইয়াছে, ঐ মন্দিরে কপিল মুনি নামে প্রসিদ্ধ দেবরূপ এর সিদ্ধ সুপ্রতিষ্ঠিত আছেন। রামায়ত্ত বৈরাগি ও সন্ন্যাসিরদের মধ্যে অন্যান্য জাতীয়েরা তাঁহাকে অতিপূজ্য করিয়া মানেন। ইঙ্গরেজী ৪৩৭ সালে ঐ মন্দির গ্রথিত হইলে জয়পুর রাজ্যস্থ গুরুসংপ্রদায়কর্তৃক উক্ত সিদ্ধর্ষি প্রতিষ্ঠিত হন। এবং উক্ত মন্দিরে ৪০ বৎসরে দর্শনীয় যত টাকা পড়ে তাহা পর্য্যায়ক্রমে জয়পুরস্থ রামানন্দনামক এক ব্যক্তি গুরুর অধিকৃত ছিল তাঁহার মৃত্যুর পরে ঐ অধিকার রাজগুরু শিবানন্দের হইল। তিনি বাঙ্গালা ১২৩৩ সালে ঐ মন্দির দর্শন করিতে আইসেন। এবং মেলার যোগের পরে কলিকাতায় আসিয়া একটা বন্দোবস্ত করতে মেলার বার্ষিক উৎপন্ন টাকা সাত আকড়া অর্থাৎ দিগম্বর ও খাকি ও সন্তুকি ও নির্মহী ও নির্ব্বাণী ও মহানির্ব্বাণী এবং নিরালম্বীতে এক২ শত করিয়া বিভাগ করিয়া দেন।….

বর্ত্তমান বৎসরের গত দিসেম্বর মাসের শেষে উক্ত তীর্থ মেলারম্ভ হইয়া ১৬ জানুআরী পর্য্যন্ত ছিল। ঐ যাত্রাতে যত পিনিস ও ভাউলিয়া ও ক্ষুদ্র২ মাড় ইত্যাদি একত্র হইয়াছিল তৎসংখ্যা ৬০ হাজারের নূন্য নহে এমত অনুমান হইয়াছে। এবং ভারতবর্ষের অতিদূরে দেশ অর্থাৎ লাহোর দিল্লী অয্যোধ্যা ও শ্রীরামপটন ও বোম্বাই হইতে যে বহুতর যাত্রী সমাগত হইয়াছিল তৎসংখ্যা ৫ লক্ষের ন্যূন নহে এবং এই তীর্থযাত্রাতে ব্রহ্মদেশ হইতে অধিতর লোক আসিয়াছিল। ভারতবর্ষের চতুর্দিক্ হইতে বাণিজ্যকারি সওদাগর ও ক্ষুদ্র২ দোকানদারেরা যে ভুরি২ বিক্রেয় দ্রব্য আনয়ন করিয়াছিল তাহা লক্ষ টাকারো অধিক হইবে।

ঐ মাসের ১৫ তারিখে যাত্রি লোকেরা স্নানপূজা ও দানাদি স্থান সঙ্কীর্ণতাপ্রযুক্ত অতিকষ্টে সম্পন্ন করিয়া প্রস্থান আরম্ভ করিল। এত জনতাতেও কোন প্রকার উৎপাত ও দাঙ্গা হঙ্গাম হয় নাই। যাত্রিরা সকলই বোধ করিল যে অতি দুষ্প্রাপ্য ধর্ম্ম লাভ করিয়া এইক্ষণে আমরা স্ব২ গৃহে প্রত্যাগমন করি। কিন্তু ঐ মাসের ১৬ তারিখে ঐ দেবালয়ে প্রাণিমাত্র রহিল না তাঁহার একাকী পড়িয়া থাকিতে হইল।”

সে যুগে গঙ্গাসাগরের পথ ছিল প্রকৃতই দুর্গম। সরাসরি পায়ে হেঁটে আজকের কাকদ্বীপ বা হার্ডউড পয়েন্ট হয়ে সঙ্গমে যাওয়ার কোনও রাস্তা ছিল কি না, জানা নেই। তবে সাগরযাত্রায় গঙ্গা হয়ে সাগর পথে যে নৌকাই ভরসা ছিল তার সাক্ষী সেকালের সংবাদপত্র। কিন্তু নৌকা নদী বা সাগরে উলটে কত লোকের সলিল সমাধি হয়েছে, তা আজও রয়ে গিয়েছে অজ্ঞাত। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি ১২৪৪ বঙ্গাব্দের ২৯ মাঘ ‘হরকরা’ পত্রিকা সাগরমেলায় নৌকার সমাগম প্রসঙ্গে জানিয়েছে এক বিস্ময়কর সংবাদ–

“গঙ্গাসাগর মেলা। –প্রতি বৎসরে গঙ্গাসাগরে যেমন মেলা হইয়া থাকে তদপেক্ষা এই বৎসরে অতি হইয়াছিল। ঐ স্থানে ন্যূনধিক ৭০ হাজার নৌকা জমা হয় এবং কথিত আছে ৬ লক্ষ লোক হইয়াছিল কিন্তু আমরা বোধ করি ইহা প্রকৃত না হইবে। এ বিষয়ে আমারদের এতদ্দেশীয় একজন পত্রপ্রেরকের এক পত্র আমরা এই সপ্তাহের প্রকাশ করিলাম তিনি লেখেন ঐ মেলাতে প্রায় ২ লক্ষ লোক হইয়াছিল ইহা সম্ভব বটে। এবং এমত কথিত আছে যে ঐ স্থানে এতদ্দেশীয় বাণিজ্যদ্রব্য ১২ লক্ষ টাকার ন্যূন নহে বিক্রয় হইয়াছে। নানা দূর২ দেশ অর্থাৎ বোম্বাই অয্যোধ্যা শ্রীরামপটন লাহোর দিল্লী ও বঙ্গাদি প্রদেশ এবং নেপাল ও ব্রহ্মদেশ হইতে বহুতর লোক আসিয়াছিল।”

সে যুগের মতো তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে যে যাত্রীদের আকর্ষণ করার চেষ্টা হত, তা আজ ভাবতেও ভাল লাগে। সেকালে সাগরমেলা উপলক্ষে ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটি ছিল এমনই –

৬ পৌষ ১২৬৫। ২০ ডিসেম্বর১৮৫৮
বিজ্ঞাপন
গঙ্গাসাগর সঙ্গম।

এই বিজ্ঞাপন পত্র দ্বারা সর্ব্ব সাধারণকে অবগত করা যাইতেছে, যে সকল ব্যক্তি সাগরে স্নান করিতে যাইবার নিমিত্ত ষ্টিমার অর্থাৎ বাষ্পীয় তরি যোগে যাত্রা করিতে ব্যাঞ্ছিত হয়েন, এবং সেই অগ্রে টিকিট লইতে ইচ্ছা করেন, তাঁহারা মাষ্টার ডবলিউ উইলিয়মস্ সাহেবের মিলিটারি ডির্পাটমেন্ট অফিস চৌরঙ্গি ১৪ নম্বর ভবনে অথবা তাঁহার নিজালয়ে, ফ্রি স্কুলের উত্তর গেটের ১৮ নম্বর বাড়ীতে আপনাপন আবেদন পত্র অর্পণ করিবেন।

প্রত্যেক টিকিটের মূল্য ৮ অষ্ট মুদ্রা নিদ্দিষ্ট করা হইয়াছে এবং প্রত্যেক টিকিটে মাষ্টার ডবলিউ উইলিয়মস্ সাহেবের সিল মোহর এবং নাম স্বাক্ষর থাকিবেক।

পৌরাণিক গাথায় সাগর উপাখ্যান ও গঙ্গা মাহাত্ম্য

সাগরে গঙ্গার সঙ্গমের পিছনে রয়েছে রাজা সগর বংশের উপাখ্যান এবং গঙ্গাবতরণের পৌরাণিক গাথা। ব্যাসপুত্র শুকদেব শ্রীমদ্ ভাগবতে অষ্টম ও নবম অধ্যায়ে রাজা পরীক্ষিৎকে সে কাহিনীর বর্ণনা করেছেন এইভাবে–

“শুকদেব বললেন, মহারাজ হরিত রোহিতের পুত্র। হরিতের পুত্র চম্প চম্পাপুরী প্রতিষ্ঠা করেন। চম্পের পুত্র সুদেব, সুদেবের পুত্র বিজয়। বিজয়ের পুত্র ভরুক। তাঁর পুত্র বৃক। বৃকের পুত্র বাহুক। শত্রুরা তাঁর রাজ্য হরণ করে, তাই পত্নীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বনে আশ্রয় নেন। বাহুক বৃদ্ধ বয়সে দেহত্যাগ করেন। তখন তাঁর মহিষী সহমরণের চেষ্টা করলে ঔর্ব তাঁকে বিরত করেন, কারণ তিনি গর্ভবতী ছিলেন। এই মহিষীর সপত্নীগণ তাঁর গর্ভের কথা জানতে পেরে তাঁর খাবারের মধ্যে ‘গর’ অর্থাৎ বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। সেই বিষ নিয়েই পুত্র ভূমিষ্ট হয়ে সগর নামে বিখ্যাত হন। তিনি সম্রাট হয়ে ছিলেন। তাঁর ছেলেরা সাগর সৃষ্টি করেন।…..

মহর্ষি ঔর্বের উপদেশে বহু অশ্বমেধ যজ্ঞ করে তিনি সর্ববেদ ও সর্বদেব স্বরূপ পরমাত্মা শ্রীহরির আরাধনা করেন। ইন্দ্র তাঁর যজ্ঞে উৎসর্গ করা একটি ঘোড়া চুরি করেন। সুমতির ( সগরের সুমতি ও কেশিনী নামে দুই রানী ছিলেন।) পুত্রেরা নিজেদের বলের গর্ব করতেন, তাই পিতার আজ্ঞায় ঘোড়া খুঁজতে গিয়ে তাঁরা পৃথিবীর চারদিক খুঁড়তে আরম্ভ করলেন। অবশেষে উত্তর-পূর্বদিকে কপিল মুনির কাছে সেই ঘোড়াটা দেখতে পেয়ে ষাট হাজার সগরপুত্র বলতে লাগলেন, এই লোকটাই ঘোড়াচোর, এখন চোখ বুজে বসে আছে। এই পাপিষ্ঠকে মেরে ফেল। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁরা মুনির দিকে ছুটে যেতেই তিনি চোখ মেলে তাকালেন। প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রের মায়ায় তাঁদের বুদ্ধিলোপ পেয়েছিল, তাই মহাত্মা কপিলের প্রতি এমন অন্যায় আচরণের জন্যই তাঁদের নিজেদের দেহের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন। রাজপুত্ররা কপিলের রোষানলে দগ্ধ হয়েছিলেন, এ কথা ঠিক নয়। পার্থিব ধূলিহীন নির্মল আকাশের মতই যাঁর আত্মা জগৎ-পবিত্রকারী, সেই শুদ্ধসত্ত্ব মুনির মধ্যে কেমন করে ক্রোধের তামসভাব প্রকাশ পাবে?…

সগররাজার ঔরসে কেশিনীর গর্ভে যে পুত্রের জন্মহয় তাঁর নাম অসমঞ্জস। তাঁর পুত্র অংশুমান।

এবার সগর রাজা অংশুমানকে ঘোড়ার খোঁজে পাঠালেন। তাঁর পিতৃব্যগণ যে পথ খুঁড়েছিলেন অংশুমান সেই পথে যেতে ছাইয়ের গাদার কাছে ঘোড়াটাকে দেখতে পেলেন। সেখানে কপিল মুনিরূপী ভগবান বিষ্ণুও বসেছিলেন। তাঁকে দেখে অংশুমান মুনিকে প্রণাম করে কৃতাঞ্জলিপুটে একাগ্রচিত্তে তাঁর স্তব করতে লাগলেন…

শুকদেব বললেন, মহারাজ, অংশুমান এভাবে স্তবগান করলে কপিলমুনি কৃপা করে তাঁকে বললেন, বৎস, তোমার পিতামহের যজ্ঞীয় অশ্বটি নিয়ে যাও। তোমার ভস্মীভূত পিতৃপুরুষগণ একমাত্র গঙ্গাজলেই উদ্ধার পাবেন, আর কিছুতে হবে না। এরপর অংশুমান কপিলমুনিকে প্রদক্ষিণ করে নতমস্তকে তাঁকে প্রণাম করলেন এবং ঘোড়া নিয়ে প্রস্থান করলেন।…

শুকদেব বললেন, রাজা অংশুমান গঙ্গাকে নিয়ে আসার কামনা করে বহুকাল তপস্যা করেও কৃতকার্য হতে পারেননি। কিছুকাল পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর পুত্র দিলীপও গঙ্গা আনার চেষ্টায় বিফল হন এবং তাঁরও মৃত্যু ঘটে। ভগীরথ তাঁর পুত্র। তিনি গঙ্গার জন্যে কঠোর তপস্যা করেন। গঙ্গাদেবী তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে দেখা দিয়ে বললেন, বৎস আমি তোমাকে বর দেব। সে কথা শুনে ভগীরথ নতমস্তকে তাঁর মনের ইচ্ছা দেবীকে নিবেদন করলেন। গঙ্গাদেবী বললেন, মহারাজ, আমি যখন পৃথিবীতে নামব, তখন কে আমার বেগ ধারণ করবে? তা না হলে আমি যে পৃথিবী ভেদ করে একেবারে পাতালে চলে যাব। তাছাড়া আমার পৃথিবীতে যাওয়ার ইচ্ছা নেই, কারণ পৃথিবীর সব মানুষ আমার জলেই পাপ ধোবে। কিন্তু সে পাপ আমি কোথায় ফেলব? মহারাজ, তার কী উপায়? সে কথা ভেবে দেখ।

ভগীরথ বললেন, দেবী পৃথিবীতে ব্রহ্মনিষ্ঠ শান্তাত্মা, লোকপাবন সাধুরা আপনার জলে স্নান করবার সময় আপনার পাপ দূর হয়ে যাবে। কারণ সর্ব পাপনাশক শ্রীহরি তাঁদের মধ্যেই আছেন। কাপড় যেমন সুতোর মধ্যে ওতপ্রোত থাকে, তেমনি এই বিশ্ব যাঁর মধ্যে পরিব্যাপ্ত, সকল প্রাণীর আত্মা সেই রুদ্র আপনার বেগ ধারণ করবেন।

রাজা ভগীরথ গঙ্গাকে এ কথা বলে শিবকে তুষ্ট করার জন্যে তপস্যা করতে লাগলেন। ভগবান শঙ্কর অল্প সময়েই তাঁর প্রতি তুষ্ট হলেন। সর্বলোক হিতৈষী শিব রাজার মনস্কামনা পূরণের জন্য প্রতিজ্ঞা করে বললেন, তাই হবে। তারপর তিনি শ্রীহরির চরণস্পর্শে পবিত্র গঙ্গাকে নিজের মাথায় ধারণ করেন।

রাজর্ষি ভগীরথ পিতৃপুরুষদের ভস্মীভূত দেহ যেখানে পড়েছিল ভুবনপাবনী গঙ্গাকে তিনি সেখানে নিয়ে গেলেন। ভগীরথ দ্রুতগামী রথে চড়ে আগে যেতে লাগলেন আর গঙ্গাদেবী তাঁকে অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশ পবিত্র করতে করতে অবশেষে ভস্মীভূত সগরপুত্রদের তাঁর জলে ভিজিয়ে দিলেন। সগরপুত্রগণ… স্পর্শে ভস্মীভূত দেহ নিয়েই তাঁরা স্বর্গে গেলেন। সগর রাজার ছেলেরা পুড়ে ছাই গিয়েছিলেন, তবু গঙ্গার স্পর্শ পাওয়া মাত্র তাঁরা ভস্ম দেহ নিয়েই স্বর্গে যান, আর যাঁরা ব্রতনিষ্ঠ হয়ে শ্রদ্ধায় গঙ্গাদেবীর সেবা করেন, তাঁদের কথা আর কী বলব।”…..

রাজা দিলীপের ছেলে ভগীরথ কৃতকার্য হন। তিনিই গঙ্গাকে সাগরে আনেন পথ দেখিয়ে। তিন পুরুষের চেষ্টায় সফলতা লাভ। আমার বৃদ্ধ মাষ্টার মশাইয়ের কাছে শুনেছি, ভারতে ইংরেজ শাসনকালে তদানীন্তন পূর্ত বিভাগের একজন ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ারের মতে, গঙ্গা প্রযুক্তি বিদ্যার এক অভূতপূর্ব সাফল্য। জলের উৎস কখনও শুকোবে না, হিমালয় থেকে সাগর পর্যন্ত চিরদিন অফুরন্ত জলপ্রবাহ বজায় থাকবে, এমন এক উৎসমুখ বের করে দুস্তর দুর্গম গিরির পাথর কেটে হাজার হাজার মাইল খাল কেটে নিয়ে এসে সাগরে মেশানো–সে এক অলৌকিক কারিগরি।

প্রবাদ আছে, জল না পেয়ে মরলে মানুষ প্রেত হয়। সগর রাজার ষাট হাজার ছেলে প্রেত হয়েছিল। গঙ্গার স্পর্শে তাঁদের মুক্তি হল। সগর রাজার ছেলেরা এখানে রূপক। আসলে সেকালে প্রজারাই ছিল রাজার সন্তান। ষাট হাজার ছেলে মানেই সগরের অসংখ্য প্রজা। হাজার হাজার মানুষ জলের অভাবে মারা যাওয়ায় চিরন্তন জলধারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গঙ্গার প্রবাহ না থাকলে উত্তরপ্রদেশ, বিহার বাংলা হয়ে যেত মরুভূমি।

তিন পুরুষের তপস্যার পর গঙ্গা মর্ত্যে এলেন। পুরাণের এই কাহিনীকে আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বলা যায়, ৭৫ থেকে ৯০ বছর সময় লেগেছিল এই বিরাট খাল কেটে আনতে। ইতিহাসে এক পুরুষ সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরা হয়। মানুষের কাটা খাল বেয়ে তখন ওই জলধারা নিজের গতিতেই পথ করে নিয়েছে। ভগীরথ আগে আগে পথ দেখিয়ে এনেছেন গঙ্গাকে। এই কাহিনীর মূলেও আছে নির্দেশিত খালের বাইরে যাতে জলধারা না যায়।

মোটের উপর পৌরানিক গঙ্গার অস্তিত্বে বিশ্বাস, সাহেব ইঞ্জিনিয়ারের কথায় আস্থা স্থাপন করি বা না করি, গঙ্গা যে এক অতি আশ্চর্য নদী তা স্বীকার করতে হবে সকলকেই। তাই তো গঙ্গা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ভক্তিপ্লুত ও কৃতজ্ঞচিত্তে প্রশস্তি গেয়ে চলেছেন গঙ্গার। প্রাণ প্রদায়িনী দেবীরূপে পবিত্র গঙ্গা পূজাও পেয়ে আসছেন আজও।

সেই জন্যই তো তীর্থ মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে ঋষিশ্রেষ্ঠ পুলস্ত্য গঙ্গাদ্বারে বলেছিলেন কুরুশ্রেষ্ঠ ভীষ্মকে–

‘মহারাজ! যেখানে গঙ্গা আছেন, সেইটাই দেশ, সেইটাই তপোবন, এবং গঙ্গাতীরস্থ সেই ক্ষেত্রটাকেই সিদ্ধক্ষেত্র বলিয়া জানিবে।’(মহাভারত, বনপর্ব্ব, সপ্ততিতমোহধ্যায়ঃ, পৃষ্ঠা ৭৯৮-৮০০)

গঙ্গাসাগর তীর্থের প্রশস্তি সংকীর্তনে মুখর হয়েছিলেন স্বয়ং দের্বষি নারদ। দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয় একবার মাত্র গঙ্গাসাগর স্নানে।(মহাভারত, বনপর্ব্ব,৭০/৪)

মহাভারতে উল্লিখিত হয়েছে, নারায়ণগত প্রাণ নারদের কন্ঠে গঙ্গাসাগর স্নানের প্রশস্তি শুনে রাজা যুধিষ্ঠির গঙ্গাসাগর স্নানে এসেছিলেন তিন পান্ডবসহ দ্রৌপদীকে সঙ্গে নিয়ে।

মহর্ষি পুলস্ত্যের উপদেশে পবিত্র এই তীর্থ দর্শন করেন স্বয়ং ভীষ্ম।

দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আচার্য শঙ্করের ‘পতিতোদ্ধারিণী জাহ্নবী গঙ্গে’ এসে মিলিত হয়েছে সাগরে। তবে এই সাগরমেলা প্রথম শুরু কবে থেকে, তা কেউ জানে না। রামায়ণীযুগে অয্যোধ্যার ইক্ষ্বাকুবংশের রাজারাই গঙ্গাসাগর তীর্থর প্রথম প্রবর্তক।

পুরাণের কালে ভগীরথ গঙ্গাকে এনেছিলেন সাগরে। সগর রাজার ষাট হাজার ছেলের মুক্তিলাভ হয়েছিল গঙ্গারই করুণাধারায়। সাগরের জন্য নয়, চির গরবিনী গঙ্গার গৌরবেই সাগর গৌরবান্বিত।

আনুমানিক ১২৮০ বছর আগে বা সমসাময়িক সময়ের কথা। মাত্র বারো বছর বয়সে দুর্গম তীর্থ বদরিকাশ্রমের উদ্দেশে যাত্রা করে প্রয়াগ, হরিদ্বার হয়ে গঙ্গোত্রীতে বাসের পর যখন উত্তরকাশীতে আচার্য শঙ্কর আসে তখন ষোলো বছর বয়সে পদার্পণ করেছিলেন তিনি। গঙ্গোত্রীতে বাসকালীন আচার্যের গঙ্গার প্রশস্তিতে সুললিত ছন্দের ঝংকার আর ভক্তিরসাত্মক ব্যঞ্জনা বয়ে আনে এক অতীন্দ্রিয়লোকের বাণী। শঙ্করেরই কণ্ঠে সহস্র বছর আগে ধ্বনিত হয়েছে–

“পতিতোদ্ধারিণী জাহ্নবী গঙ্গে
খন্ডিত গিরিবর মন্ডিত ভঙ্গে।
ভীষ্ম জননি খলু মুনিবর কণ্যে
পতিতোদ্ধারিণী ত্রিভুবন ধন্যে।”…

সেইজন্যই তো গঙ্গা এবং সাগরের একাত্মতায় প্রতি বছর, বছরের পর বছর ধরে গঙ্গাসাগরসঙ্গমে ধর্মমেলার পুণ্যক্ষেত্রে মধুর সৌহার্দ্য-বন্ধন হয় বৈরাগ্যময় জীবনের পথ ধরে আসা সাধুদের সঙ্গে গৃহীর- ভক্তের সঙ্গে ভগবানের।



About News Desk

Check Also

Kolkata News

সকালে জেলায় জেলায়, বেলা বাড়তে শহর ভিজল অঝোর ধারায়

প্রাক বর্ষার বৃষ্টি কী তবে শুরু হয়ে গেল? এই প্রশ্ন এখন সকলের মুখে মুখে। গত বৃহস্পতিবার থেকেই শহরের আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.