Vivekananda Chakraborty

বিবেকানন্দের রবীন্দ্রনাথ

বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, মেদিনীপুর টাউন স্কুলের প্রধানশিক্ষক। বিবেকান্দবাবু একটি অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে ভাবনা গ্রন্থমালা লিখছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ও ইতিহাস ভাবনা নিয়ে দুটি বই ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। প্রতি বছর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত দুটি করে বই প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। আর আগামী ২৪ বছরে বাকি ৪৮টি বই লিখে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে মাস্টারমশাইয়ের। বিবেকানন্দবাবু বললেন, বিশ্ব সাহিত্যের সারভাগ রয়েছে রবীন্দ্রনাথে। রবীন্দ্রানুরাগী মানুষটি চান এভাবেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন ইহলোক ত্যাগ করতে। তবে যতদিন বাঁচবেন ততদিন রবীন্দ্রনাথকে বুকে আগলেই বাঁচবেন।

কিন্তু কেন রবিঠাকুর? কেননা বিবেকানন্দবাবু অগাধ লেখাপড়া করেছেন দুনিয়ার সাহিত্য সম্পর্কে। ইংরাজি সাহিত্যে পিএইচডি করা হয়ে গিয়েছে। এখন ১৯৪০ সালের পরবর্তী সময় থেকে সমকাল পর্যন্ত ইংরাজি ভাষায় প্রকাশিত ভারতীয় সাহিত্যের উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে গবেষণার কাজ করছেন। নিজে ছিলেন ইংরাজির ছাত্র। বললেন, কিটস-বায়রন-শেলি নিয়ে অনেক ঘেঁটেছেন একসময়ে। যদিও তাঁর বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথেই মুক্তি। শুধু তাঁর গান বা কবিতা নয়, সমগ্র রবীন্দ্রনাথের ভিতর তিনি খুঁজে পেয়েছি জীবনের মানে।

মেদিনীপুর শহরে এখন বসবাস বিবেকানন্দবাবুর। জন্মভিটে ওড়িশা সীমান্তের লাগোয়া একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। সেখানে প্রাথমিক স্কুলের পাঠ সাঙ্গ করে বেগুনিয়া স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন স্থানীয় স্কুল থেকে। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্যে গ্রাম থেকে পাড়ি দেন কলকাতায়। বাবা ছিলেন ফার্মাসিস্ট। বাবা চেয়েছিলেন আমি রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেন বিবেকানন্দবাবু। কলকাতার কলেজে রসায়ন নিয়ে ভর্তিও হয়েছিলেন। কিন্তু ‌সাহিত্যের প্রতি অনুরাগটা একটু বেশিই ছিল। বিশেষত কবিতা। সেই ভালবাসার টানে বাবার অমতে বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরাজি নিয়ে পড়তে শুরু তিনি।

২৩ বছর বয়সেই শিক্ষকতার চাকরিতে যোগ দান। সেইসময়ে পারিবারের আর্থিক অবস্থা পড়ে গিয়েছিল। ভাইবোনদের মানুষ করতে একসময়ে গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতার চাকরির আয়ে ভাইবোনদের বড় করতে হয়েছে। তবে এখন আর তাঁর পুরানো গ্রামের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক নেই। নেই গ্রামতুতো সম্পর্কগুলিও। ভাঙন ধরেছে সবখানেই। ২০১৬ সালে জাতীয় শিক্ষক হিসাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। বিবেকানন্দবাবুর গর্ব যে রাষ্ট্রপতি তাঁকে নামে চেনেন।

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিবেকানন্দবাবুর আগ্রহ ছেলেবেলা থেকেই। কবির গানের কথাই তাঁকে কবিগুরুর প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। বয়স আর একটু বাড়তেই তন্নতন্ন করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পঠনপাঠনের শুরু। রবীন্দ্রচর্চার শুরু থেকেই রবি ঠাকুরের যাবতীয় লেখালেখি তাঁকে দারুণ আকৃষ্ট করতে শুরু করে। সে কারণেই মোট ৫০টি গ্রন্থে রবীন্দ্রভাবনার বিচিত্র দিক নিয়ে লিখছেন তিনি। এর ভিতর রয়েছে রবীন্দ্রনাথের চোখে নারী, কবির প্ল্যানচেট চর্চা কিংবা প্রেম নিয়েও পৃথক খণ্ড। কী লিখছেন তা জানতে চাওয়ায় বললেন, আসলে রবিভক্তের সংখ্যা তো অজস্র। রবি ঠাকুরের লেখালেখি নিয়ে গবেষকও আছেন অনেকেই। তাঁদের কাজ হেলাফেলা করা যাবে না। স্কুলের একটু উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রী থেকে যে কোনও কৌতূহলী পাঠককে রবি ঠাকুরের সঙ্গে পরিচয় করানোই আমার জীবনের ব্রত। আসলে রবীন্দ্রভাবনা‌য় ভাবিত হলে মানুষের সিন্ধুদর্শন হতে পারে। পাঠক-পাঠিকাকে ওই অমৃতের স্বাদই দিতে চাই। সাড়া পাচ্ছি ভালোই।

ইতিমধ্যে ‘প্রতিভাস’ থেকে রবি ঠাকুরের স্বদেশ ও ইতিহাস ভাবনা বিষয়ে প্রকাশিত ‌বি‌বেকানন্দ চক্রবর্তীর লেখা দুটি বই পাঠককুলের হাতে তুলে নেওয়ায় খুশি তিনি। বিবেকানন্দবাবুর উপলব্ধি তিনি যা চান তার সবটা একমাত্র রবীন্দ্রনাথই দিতে পারেন। তাঁর দাবি,  রবীন্দ্রনাথ বেড়ে ওঠার সময় অসাধারণ সব সুযোগ পেয়েছিলেন। ঠাকুর পরিবারে না জন্মগ্রহণ করলে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিতভাবে বহুমুখী হতে পারতেন না। ওঁর পিছনে ঠাকুর পরিবারের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির বিরাট ভূমিকা রয়েছেন। তাছাড়া, তিনি আজন্মকাল ব্যথা-বেদনা-বিচ্ছেদ সয়েছেন। তাও প্রকাশ করেছেন নিজস্ব ভাষায়। শান্তি ও প্রেম দুই-ই রবি ঠাকুরের পদপ্রান্তে খুঁজে পান প্রৌঢ় এই মাস্টারমশাই।

একসময়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতায় পড়তে এসেছিলেন। গ্রামে তাঁদের পরিবারটি ব্রাহ্মণ পরিবার। মোটামুটি সম্পন্ন অবস্থা ছিল একসময়ে। ঠার্কুদা ছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিত। ছোটবেলাতেই ঠার্কুদার কাছে সংস্কৃত চর্চায় হাতেখড়ি। মনে আছে, মুখে মুখে সংস্কৃতে শ্লোক শেখাতেন ঠাকুর্দা। সংস্কৃত সাহিত্যের ভাণ্ডারের হদিসও পেয়েছিলেন ওঁর কাছেই। কলকাতায় এসে বিজ্ঞান ছেড়ে ইংরাজি পড়তে শুরু করেন। বর্তমানে ডিএসসি করছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সারাদিনই কাজের চাপ। স্কুলের প্রশাসন সামলানো, ছাত্র পড়ানো থেকে শুরু করে নিজের বই প্রসঙ্গে গবেষণার কাজেও অনেকটা সময় ব্যয় হয়।

আগে নিজে কবিতাও লিখতেন। কবিতা ছিল প্ৰথম প্রেম। কবিতার বইও রয়েছে। বিবেকানন্দবাবু বলেন, কবিতা লেখার মত সময় আর পান না। মৌলিক লেখালেখি করার জন্যে যে সময় প্রয়োজন, তা বের করা একরকম অসম্ভবই। রবীন্দ্রনাথকে লিখতে গিয়ে বইগুলি কেবলমাত্র তথ্য ভারাক্রান্ত যেন না হয়ে উঠে সে ব্যাপারে বিবেকানন্দবাবু অত্যন্ত সতর্কভাবে কাজ করছেন। যেভাবে তিনি লিখছেন, তাতে রবীন্দ্রসাহিত্য যাঁরা সময়াভাবে পড়ে উঠতে পারেননি, সেই সমস্ত পাঠক-পাঠিকাও রবিঠাকুরের চিন্তার জগতে অতি সহজে প্রবেশ করতে পারবেন। তাছাড়া, কবি যে কাজে হাত লাগিয়েছিলেন সবেতেই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ  নিজেই প্রচুর রবীন্দ্র নিন্দুক দেখেছেন। তবে তিনি যে মানুষ হিসাবে অসাধারণ তার প্রমাণ দিতে গেলে বলতে হয়, নিন্দুকদের কবি জবাব দিয়েছিলেন তাঁর লেখনী, তুলি, গানবাজনার মাধ্যমে।

মাস্টারমশাই মানুষটির চর্চার আর একটি বিষয়বস্তু হল উত্তর-আধুনিকতা। ভারতীয়দের লেখা ইংরাজি সাহিত্যে এখন এর সন্ধান করছেন নতুন গবেষণায়। যদিও এই সময়ের বাংলা সাহিত্য নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই বিবেকানন্দবাবুর। কয়েকজন নবীন লেখক-লেখিকার লেখা পড়েছেন এইমাত্র। বাংলা মৌলিক লেখালেখির শ্রী কেন ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তা নিয়েও অনুযোগ জানালেন। তাঁর কথায়, সাম্প্রতিক সাহিত্য‌ থেকে ভাবনাচিন্তার উপকরণ মেলে না। বাজারের চাপ সাহিত্যের গায়ে লাগলে এমন তো হতেই পারে!

বলাবাহুল্য, সাহিত্য অগভীর হয়ে পড়ার কারণ বাজারের দখল নেওয়ার প্রবণতা। এই প্রবণতাই লেখক বা লেখিকার পক্ষে রাহু। বাজারে একবার ছুটতে শুরু করলে ছুট চালাতেই হবে। বলাবাহুল্য, এতে শিল্পীর শিল্পের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এই এখন যস্মিন দেশে যদাচার! বিবেকানন্দবাবু বললেন, এযুগে প্রযুক্তি ছাড়া যোগাযোগ রক্ষা করা যায় না। মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্টারনেট এখন সবার হাতে। কিন্তু শুধুমাত্র প্রযুক্তিমনস্ক হয়ে কোনও লাভ নেই। বরং এর থেকে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছেদের ঘটনা এখন অজস্র। তাই এই সমাজটাকে নিয়ে নবীন লেখকদের চিন্তা করাটা খুব দরকার। রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর একাধিক উপন্যাসের চরিত্রদের দিয়ে এ দেশের সমাজ সংস্কারের কথা বলিয়েছেন। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে কবিগুরুর নায়কেরা স্বদেশভূমি গড়তে চেয়েছেন। আসলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বদেশকে সুন্দর হিসাবে দেখতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের কামনায় তাই কোনও ভারিক্কি চাল নেই।

তবে গ্রাম পাল্টাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ যে আত্মীয়সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, নিতান্ত আদর্শের জন্যে আদর্শ তা ছিল না। নিজের বিশ্বাসকে বাস্তবায়িত করতে কবি যে কর্মোদ্যোগগুলি উদ্ভাবন করেছিলেন তা অতুলনীয়। কিন্তু তখন সময়টা বন্ধ্যা ছিল না। তাহলে এখন? মাস্টারমশাইয়ের কথায়, রবীন্দ্রনাথকে আমি আমার মতো ভাবিয়ে চলেছি। অতএব আমি যতদিন বাঁচব এই কাজটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্যেই বেঁচে থাকব।

About Arnab Dutta

স্কুলের গণ্ডি পার করেই ফ্রিলান্সার হিসাবে লেখালেখি শুরু আনন্দমেলা, জনমন জনমত, সানন্দা পত্রিকা, আকাশবাণীতে। ১৯৯৩ সালে প্রথম চাকরি মিত্র প্রকাশনীতে। স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে দৈনিক কাগজের চাকরিতে হাতেখড়ি ওভারল্যান্ডে। এরপর আনন্দবাজার, আজকাল, সকালবেলা-সহ কয়েকটি বাংলা কাগজের নিউজ ডেস্কে চাকরি। কলকাতার কয়েকটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলেও কাজ করার অভিজ্ঞতা। প্রথম লেখা ছোটগল্পটি ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় আনন্দমেলায়। ইতিমধ্যে প্রায় তিন ডজন বাংলা ছোটগল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আপাতত লেখাকেই পেশা করেছেন লেখক-সাংবাদিক অর্ণব দত্ত।

Check Also

Gopal Debnath

ফটোগ্রাফি অ্যাকাডেমি গড়ার স্বপ্ন দেখেন গোপাল দেবনাথ

ব্যবসামনস্কতা থেকে দুটি সংস্থা তৈরি করেছেন গোপালবাবু। দেবনাথ ডিজিটাল ও স্টুডিও দেবনাথ নামে ওই দুই সংস্থাই চলছে রমরমিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *