Advertise With Us
Shishur Sevay

তিলোত্তমার বুকে এক বিদেশিনীর নিঃশব্দ লড়াই

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে…, অডিও সিস্টেমে গানটা শুরু হতেই হাতের ডান্ডিয়ায় উঠল ঝংকার। মুহুর্তে বদলে গেল পরিবেশ। আপাত নির্বিকার মুখগুলো উচ্ছলতায় ভরে উঠল। কেউ নিজের পায়ে গানের সুরে তাল ঠুকতে শুরু করল। কেউবা শারীরিক অক্ষমতার কারণে অন্যের ভরসায় শুরু করল নাচ। উচ্ছল একঝাঁক পায়রার মত ডানা মেলল তাদের শিশুমনের নিষ্পাপ উচ্ছ্বাস। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামবে নামবে করছে। দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুরের হলুদ রঙের দোতলা বাড়িটায় তখন এক অন্যই আমেজ। নাচের শিক্ষক নজর রাখছেন সবারদিকে। ঘরের এক কোণায় শিশুদের এই খুশিতে নীরবে সামিল এক বিদেশিনী। ডক্টর মিচেল হ্যারিসন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার শিশুদের নিয়ে তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জন্ম নিয়েছিল এনজিও চাইল্ড লাইফ প্রিসার্ভ শিশুর সেবায়। খাতায় কলমে এনজিও বটে, তবে দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায় এটা আসলে একটা একান্নবর্তী পরিবার। সেখানে গৃহকর্ত্রীর স্নেহাস্পর্শে লালিত হচ্ছে ১৪টি কিশোরী। হতে পারে এসব কিশোরীরা আর পাঁচটা স্বাভাবিক মেয়ের মত নয়। হতে পারে প্রাত্যহিক দিনযাপনে তাদের অন্যের ওপর ভরসা করতে হয়। তবু এ পৃথিবীর ওপর তাদেরও অধিকার অন্যদের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। সেই অধিকারকে সুনিশ্চিত করে, তাদের আরও ভাল করে বাঁচার পাঠ দিচ্ছেন মিচেল। তাঁর এই লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। কেউ স্পিচ থেরাপিস্ট তো কেউ ফিজিও। কারও খুশি ওদের ভালমন্দ রান্না করে খাওয়ানো। তো কেউ সামলাচ্ছেন এই কর্মযজ্ঞের হিসেব নিকেশ। তবে কাজ যাইহোক তাঁদের মূল লক্ষ্য সমাজের চোখে আপাত ব্রাত্য শিশুগুলোকে মাতৃস্নেহে বড় করে তোলা। কিন্তু এ কর্মযজ্ঞের শুরুতে একরকম একাই লড়তে হয়েছে এই মার্কিন নারীকে। শুরুতে কম ঝাপটা সামলাতে হয়নি তাঁকে। পাশে দাঁড়ানো দূরে থাক, বিদেশিনী হওয়ার কারণে নানাভাবে সন্দেহের শিকার হতে হয়েছে। পাড়াতেও আড়চোখেই দেখা হত তাঁকে। কৌতূহল ছিল বাড়িতে কী হয় তা নিয়েও। এমনকি পাড়ার রাজনৈতিক নেতাদের দাদাগিরির ঝাপটাও এই বিদেশ বিভূঁইয়ে একাই সামলেছেন দৃঢ়চেতা মিচেল। ক্রমে যদিও অবস্থায় বদল আসে। সকলে বুঝতে পারেন অন্য কোনও কারণ নয়, কিছু শিশুকে সুস্থ করে তুলতে, তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতেই সাগর পার থেকে এসে শহরের বুকে নিঃশব্দে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই বিদেশিনী। পরবর্তীকালে সাহায্যেরও হাত বাড়িয়ে দেয় স্থানীয় ক্লাব। তবে মিচেলের আক্ষেপ শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কাছে টেনে নেওয়া, তাদের জন্য ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা সময় বার করে এগিয়ে আসা বা আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় সমাজ এখনও প্রস্তুত নয়। তাঁর মতে, এধরণের কর্মযজ্ঞে এগিয়ে আসার মত সচেতনতারও অভাব রয়েছে ভারতীয় সমাজে। রয়েছে এদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতাও। এখনও পার্কে আর পাঁচটা বাচ্চার সঙ্গে এদের খেলতে নিয়ে গেলে বিরক্ত হন অভিভাবকরা। কিন্তু এ পৃথিবীর বুকে ওরাও চায় খেলতে। ঘাসের ওপর লাফাতে, দোলনায় দুলতে, অনাবিল আনন্দে ভীষণ খুশিতে মেতে উঠতে। কিন্তু এই ছোট ছোট শিশুদের স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে একই মাঠে খেলতে নিয়ে গিয়ে বারবার উপেক্ষিত হতে হয়েছে মিচেলকে। বিভিন্ন কুসংস্কারের শিকার হতে হয়েছে। এখন তাই কিছুটা ক্ষোভের বশেই বাচ্চাদের দূরে সরিয়ে নিয়েছেন মিচেল। শুধু সমাজ নয়, সরকারও এসব শিশুদের জন্য সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা নিয়ে উদাসীন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।‌ তাঁর মতে, সরকার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে এসব শিশুদের জীবন আরও সুন্দর করে তোলা সম্ভব। প্রযুক্তি নির্ভর চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আরও বেশি করে কেনা সম্ভব হবে। শুরুতে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করেই শিশুদের দেখভাল শুরু করেন মিচেল। সেভাবেই দীর্ঘদিন পথ চলতে হয়। কিন্তু কোনও কিছুই তাঁকে নিরস্ত করতে পারেনি। বর্তমানে অবশ্য কিছু সহৃদয় মানুষ আর্থিক সাহায্য দিতে এগিয়ে এসেছেন। এঁদের মধ্যে অনাবাসী ভারতীয়ের সংখ্যাই বেশি। সকালে, বিকেলে খেলার ছলে কিছুটা পড়াশোনা। সঙ্গে ফিজিওথেরাপি। বাড়ির দোতলায় রয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ সমৃদ্ধ সাজানো ক্লাসরুম। তিনতলার ছাদেও তাই। তবে ছাদটা চারপাশ দিয়ে কাঁচে ঘেরা। কাঁচের ওপার থেকে সূর্যের আলো আছড়ে পড়ে ক্লাসরুমে। আশপাশের গাছগাছালি ইট, কাঠ, পাথরের জঙ্গলেও যেন এক টুকরো সবুজের শান্তি। ক্লাসে রয়েছে অডিও ভিজুয়ালের মাধ্যমে পড়ানোর ব্যবস্থা। ঘড়ি ধরে সেখানে ক্লাস হয়। তবে ছলটা থাকে খেলার। এভাবেই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আর মহৎ উদ্দেশ্যকে ব্রত করে পথ চলে চলেছেন মিচেল হ্যারিসন। আলিপুরের এক মধ্যবিত্ত গলির, তস্য গলির মধ্যে এই মহৎ উদ্দেশ্যের খবর খুব কম লোকই রাখেন। কিন্তু লড়াইটা জারি থাকে। যাকে কুর্নিশ না করে উপায় নেই।

(ছবি – সৌজন্যে – চাইল্ড লাইফ প্রিসার্ভ শিশুর সেবায়)

Advertise With Us

About Rajarshi Chakraborty

স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর। ফ্রিলান্সার হিসাবে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। তবে লেখালিখির নেশাটা স্কুল জীবন থেকেই। স্কটিশ চার্চ স্কুলে পড়তে দেওয়াল পত্রিকা দিয়ে লেখা শুরু। কলেজ জীবন থেকেই বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হতে থা‌কে। সাংবাদিক হিসাবে প্রথম চাকরি মিঠুন চক্রবর্তীর ‘সিগনাস’-এ। এখানে টিভি নিউজ ‘আজকের খবর’ ও দৈনিক সংবাদপত্র ‘খবরের কাগজ’-এ চুটিয়ে সাংবাদিকতা। এ সময়েই সাংবাদিকতা জগতে পরিচিতি। এরপর ‘বাংলা এখন’ চ্যানেলে কাজ। পরে কলকাতার সারা জাগানো ‘কলকাতা টিভি’-তে সাংবাদিক হিসাবে যোগদান। গল্প, কবিতা থেকে প্রবন্ধ, সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর লেখায় বরাবরই সাবলীল। বাংলাদেশের খেলার পত্রিকা, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রকাশিত বাংলা ম্যাগাজিন ‘উৎসব’ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত কিশোর ভারতী ও সাফল্য পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা নজর কেড়েছে।

Check Also

Greece

গ্রীস, তুরস্কে প্রবল কম্পন, মৃত ২, আহত ৫০০

২ দিন আগেই থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছিল রাশিয়া। এদিন কাঁপল ইউরোপের অন্য ২ দেশ গ্রীস ও তুরস্ক। স্থানীয় সময় রাত দেড়টা নাগাদ হওয়া এই কম্পনের মাত্রা ছিল ৬.৬।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *